ফিলিস্তিনিদের ধর্ষণের খবর ছাপানোয় নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি নেতানিয়াহুর
মার্কিন দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল সরকার। ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে বন্দী ফিলিস্তিনিদের ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই এই হুমকি দিয়েছে তারা।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের দীর্ঘদিনের কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন। ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী ও পুরুষ ভুক্তভোগীর সরাসরি বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবেদনটি প্রকাশের তিন দিন পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই মামলার ঘোষণা দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে বন্দী ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। পাশাপাশি বন্দীদের ওপর ইসরায়েলিদের পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতনের অনেক প্রমাণও সামনে আসছে। আল জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব প্রমাণ নথিবদ্ধ করেছে।
এর আগে ইসরায়েল নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনটিকে 'ব্লাড লায়াবেল' (ইহুদিদের বিরুদ্ধে রক্তপিপাসু হিসেবে অপপ্রচার) বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার তারা এক ধাপ এগিয়ে জানায়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার 'নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন'।
ইসরায়েলের দাবি, 'আধুনিক সংবাদমাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সবচেয়ে জঘন্য ও বিকৃত মিথ্যার একটি হলো এই প্রতিবেদন।'
নিজেদের অবস্থানে অনড় নিউ ইয়র্ক টাইমস
ইসরায়েলের হুমকির পরও নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং প্রতিবেদক নিকোলাস ক্রিস্টফ তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে পত্রিকাটির মুখপাত্র চার্লি স্ট্যাডটল্যান্ডার বলেন, '১৪ জন নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকারের সত্যতা আমরা যত দূর সম্ভব অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে যাচাই করেছি। এমনকি ভুক্তভোগীরা যাদের বিশ্বাস করে নিজেদের ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা বলেছিলেন—যেমন তাদের পরিবার ও আইনজীবী—তাদের মাধ্যমেও তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রতিটি তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ ফ্যাক্ট-চেক (সত্যতা যাচাই) করা হয়েছে। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের খবর, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর স্বাধীন গবেষণা, বিভিন্ন জরিপ এবং একটি ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সাক্ষ্যের সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ ও সত্যতা যাচাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছিল।'
বৃহস্পতিবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিউ ইয়র্ক টাইমসের মুখপাত্র ড্যানিয়েল্লে রোডস হা বলেন, 'এই হুমকি মূলত সেই পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ, যার লক্ষ্য হলো স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করা এবং নিজেদের বয়ানের বাইরে যাওয়া কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দেওয়া।'
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইসরায়েলের 'এ ধরনের আইনি দাবির কোনো ভিত্তি নেই।'
ইসরায়েল সরকারের এই পরিকল্পিত মামলার বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি। তবে কোনো দেশের সরকার চাইলেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে কি না, তা নিয়ে অনেক আইনি প্রশ্ন রয়েছে।
যদি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আদালতে এই মামলা করা হয়, তবে ইসরায়েলকে কঠিন আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়তে হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সংবাদমাধ্যমকে ব্যাপক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে যখন সরকারি কর্তৃপক্ষ তাদের চ্যালেঞ্জ করে।
গত বছর গাজায় অনাহার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পরও নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি 'যাচাই করছেন যে কোনো দেশ নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে কি না।'
বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহু এক্সে লেখেন, 'আমার নেতৃত্বে ইসরায়েল চুপ থাকবে না। আমরা মানুষের বিবেকের আদালতে এবং আইনি আদালতে এই মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়ব।'
দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ
অবশ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধেও দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকেরা বলছেন, পত্রিকাটি ফিলিস্তিনিদের করা অভিযোগের চেয়ে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
বিশেষ করে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, ইসরায়েলিদের ওপর কথিত নির্যাতনের খবরগুলো যখন 'নিউজ' বা সংবাদ বিভাগে ছাপা হয়, তখন ক্রিস্টফের এই প্রতিবেদনটি কেন 'ওপিনিয়ন' বা মতামত বিভাগে ছাপা হলো?
এর উদাহরণ হিসেবে ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা বলা হয়, যেখানে ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলিদের ওপর পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। তবে ওই প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জড়িত সাংবাদিকদের নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি পত্রিকার নিজস্ব নিউজরুমের ভেতর থেকেই আপত্তি উঠেছিল বলে জানা গেছে।
প্রকাশের কয়েক মাস পর সাংবাদিকতা বিভাগের ৫০ জন অধ্যাপক ওই প্রতিবেদনটি নিয়ে তদন্ত করার জন্য পত্রিকাটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমস তখনো তাদের ওই সংবাদের পক্ষে অনড় ছিল।
গত মঙ্গলবারও পত্রিকাটি তাদের সংবাদ (নিউজ) বিভাগে ইসরায়েলি সিভিল কমিশনের একটি প্রতিবেদনের খবর ছাপে, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে ৭ অক্টোবরের যৌন নির্যাতন ছিল 'সুসংগঠিত এবং পদ্ধতিগত'।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ
গত ডিসেম্বরে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক রিম আলসালেম এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই ওঠা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করতে একটি আন্তর্জাতিক স্বাধীন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশনকে তদন্তে সাহায্যের জন্য ইসরায়েলকে অনুরোধ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।
অন্যদিকে ক্রিস্টফের ওই প্রতিবেদনে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়। গত বছর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে ওই রিপোর্ট পেশ করেছিল কমিশনটি। সেখানে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামো এমন একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে যৌন সহিংসতা এখন একটি 'সাধারণ নিয়মে' (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) পরিণত হয়েছে এবং এটি 'ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের একটি প্রধান অংশ'।
প্রতিবেদনে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) একটি প্রতিবেদনের কথাও তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলের হাতে আটক ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে সামি আল-সাই (৪৬) নামের একজন ফিলিস্তিনি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকও রয়েছেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালে ইসরায়েলি কারাগারে আটক থাকার সময় রাবারের লাঠি ও গাজর দিয়ে তাকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল।
ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের (সেটলার) নির্যাতনেরও ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। এসব সেটলার প্রায়ই ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় কাজ করে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাতার জানান, তাকে বিবস্ত্র করে লাঠি দিয়ে খোঁচানো হয়েছিল এবং সেটলাররা তাকে ধর্ষণের কথা বলে হাসাহাসি করছিল। তিনি বলেন, 'ছয় মাস ধরে আমি এই বিষয়ে কারও সঙ্গে, এমনকি আমার পরিবারের সঙ্গেও কথা বলতে পারিনি।'
