‘গুরুতর অসাদাচরণ ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে’ চীনে শীর্ষ দুই জেনারেলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু
গত দুই বছর ধরে চীনের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বে একের পর এক ছাঁটাই বা 'শুদ্ধি অভিযান' চলছে। তবে একজন জেনারেলকে সবাই এসবের ধরাছোঁয়ার বাইরে বলেই মনে করতেন—তিনি জেনারেল ঝাং ইউজিয়া।
প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু তিনি, একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ ইউনিফর্ম পরিহিত কর্মকর্তাও।
গেল ২৪ জানুয়ারি চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭৫ বছর বয়সী জেনারেল ঝাং এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সিএমসি) আরেক সদস্য জেনারেল লিউ জেনলির বিরুদ্ধে 'গুরুতর শৃঙ্খলা ও আইন লঙ্ঘনের' অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে। চীনে সাধারণত দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত হলে সরকারিভাবে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়, এবং এমন তদন্তের অর্থ হলো আটক এবং পরবর্তী সময়ে পদচ্যুতি।
শি জিন পিং নিজেও এই মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান। ২০১২ সালে শি ক্ষমতায় আসার পর থেকে তার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত দুই লাখের বেশি কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
জেনারেল ঝাং ছিলেন শি জিনপিংয়ের বিশ্বস্ত সহযোগী। সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) দুই ভাইস চেয়ারম্যানের একজন ছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে অন্য জেনারেলদের বিরুদ্ধে যে শুদ্ধি অভিযান চলেছে, তার নেপথ্য কারিগর ছিলেন ঝাং নিজেই। কিন্তু এবার তিনি নিজেই নাটকীয়ভাবে পতনের মুখে।
অন্যদিকে, ৬১ বছর বয়সী জেনারেল লিউ জেনলি সেনাবাহিনীর জয়েন্ট স্টাফ ডিপার্টমেন্টের প্রধান হিসেবে অপারেশন, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। তিনিও ভিয়েতনাম যুদ্ধের একজন অভিজ্ঞ সৈনিক এবং জেনারেল ঝাংয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ১৯৭৬ সালে মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর চীনের সামরিক নেতৃত্বে এমন বড় রদবদল আর দেখা যায়নি। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কার্যত তার পুরো সামরিক নেতৃত্বকে ছেঁটে ফেলেছেন। বর্তমানে ২০ লাখ সদস্যের বিশাল পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) নীতিনির্ধারণী সংস্থা সিএমসিতে এখন সক্রিয় সদস্য আছেন মাত্র দুজন—চেয়ারম্যান হিসেবে স্বয়ং শি জিনপিং এবং শৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ক প্রধান জেনারেল ঝাং শেংমিন।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শি জিনপিং চীনা সেনাবাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু দুর্নীতি এবং লড়াইয়ের প্রস্তুতির অভাব তার এই লক্ষ্য পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই নতুন দফার শুদ্ধি অভিযানে একে একে রকেট ফোর্স, সরঞ্জাম উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের মধ্যে তাইওয়ান দখলের সক্ষমতা অর্জনের জন্য যে সময়সীমা শি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, তা অর্জনে ব্যর্থতা এবং সামরিক কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতির কারণেই শীর্ষ এই কর্মকর্তাদের ওপর প্রেসিডেন্ট এত কঠোর হচ্ছেন।
তা ছাড়া ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত জেনারেল ঝাং অস্ত্র উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। সেই বিভাগটি দুর্নীতির জন্য বেশ কুখ্যাত। পুরোনো কোনো দুর্নীতির অভিযোগ বা প্রতিদ্বন্দ্বীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেও এই তদন্ত শুরু হতে পারে। রকেট ফোর্স থেকে শুরু হওয়া এই শুদ্ধি অভিযান এখন সেনার একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
দুর্নীতি বা ব্যর্থতা তো আছেই, তবে জেনারেল ঝাং ইউজিয়ার ওপর খাঁড়া নেমে আসার পেছনে ভিন্ন একটি কারণও দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তা হলো—জেনারেল ঝাংয়ের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ভয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সিআইএর সাবেক চীন-বিশ্লেষক ডেনিস ওয়াইল্ডারের মতে, ঘটনাটি 'শি চিন পিং ক্ষমতায় আসার পর চীনের রাজনীতির সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা'। চীনের সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পক্ষের রেষারেষি চলছিল। একটি পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল ঝাং, যাদের সঙ্গে চীনের বিপ্লবী নেতাদের পারিবারিক ঐতিহ্য জড়িত। অন্য পক্ষটি গড়ে উঠেছিল চীনের পূর্বাঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিয়ে, যেখানে শি চিন পিং একসময় চাকরি করতেন।
এই রেষারেষিতে জেনারেল ঝাংয়ের পক্ষটিই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এতে ঝাংয়ের হাতে একধরণের নজিরবিহীন ক্ষমতা চলে আসে, যা একপর্যায়ে শি জিন পিংয়ের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ওয়াইল্ডারের ভাষায়, 'জেনারেল ঝাং একজন শক্তপোক্ত ও জেদি মানুষ। তিনি শি জিন পিংয়ের মিত্র ছিলেন ঠিকই, কিন্তু কখনোই তার অনুগত ভৃত্য ছিলেন না।'
শি জিন পিং ও জেনারেল ঝাংয়ের পারিবারিক সম্পর্ক বহু পুরোনো। চীনের গৃহযুদ্ধে তাদের বাবারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন। এই সম্পর্কের জেরে শি জিন পিং ঝাংয়ের ওপর গভীর আস্থা রেখেছিলেন। ২০১৭ সালে তাকে কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য এবং সিএমসির ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। এমনকি ২০২২ সালে অবসরের বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পরও শি নিয়ম ভেঙে ৭২ বছর বয়সী ঝাংকেই জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান পদে রেখে দেন।
এখন যদি আনুষ্ঠানিকভাবে জেনারেল ঝাং বরখাস্ত হন, তবে শি জিন পিংয়ের হাতে অপসারিত হওয়া তিনিই হবেন সর্বোচ্চ পদের সেনা কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তিনি যদি পলিটব্যুরোর সদস্যপদ হারান, তবে ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ঘটনার পর এই প্রথম একই মেয়াদে দুজন পলিটব্যুরো সদস্য বরখাস্ত হওয়ার নজির গড়বেন।
তবে প্রশ্ন উঠছে, এই শূন্যস্থান তিনি পূরণ করবেন কাকে দিয়ে? ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর আগের নেতাদের নিয়োগ দেওয়া জেনারেলদের সরিয়ে তিনি নিজের পছন্দের ও অনুগত লোকদের বসিয়েছিলেন। এখন তিনি নিজের সেই পছন্দের লোকদেরই ছাঁটাই করছেন। বর্তমানে সেনাবাহিনীতে যারা টিকে আছেন, তারা হয় অনভিজ্ঞ, নয়তো বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত।
এর আগে গত অক্টোবরে কমিউনিস্ট পার্টি কমিশনের অন্য ভাইস চেয়ারম্যান হি উইডংকে বহিষ্কার করে। তার জায়গায় কমিশনের সদস্য ঝাং শেনগমিনকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়।
