শি জিনপিংয়ের চীনে যে কারণে অতি ক্ষমতাধর জেনারেলেরও শেষরক্ষা হলো না
২০২৪ সালের ঘটনা। বেইজিংয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেছিলেন জেনারেল ঝাং ইউজিয়া। তখন তার চোখেমুখে ছিল প্রবল আত্মবিশ্বাস। তাকে চীনের সর্বেসর্বা নেতা শি জিনপিংয়ের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং ক্ষমতাধর সহকারী হিসেবে মনে করা হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, জেনারেল ঝাং-কে দেখে মনেই হয়নি যে নেতাকে (শি জিনপিং) খুশি রাখা নিয়ে তিনি তটস্থ বা ভীত। তিনি একজন পুরোদস্তুর সামরিক ব্যক্তির মতোই সোজাসাপ্টা কথা বলেছিলেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল না যে কথা বলার সময় তাকে খুব একটা মেপে বা সতর্ক হয়ে কথা বলতে হচ্ছে।
কিন্তু জেনারেল ঝাংয়ের সেই 'অজেয়' ভাবমূর্তি এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার ধারণা গত সপ্তাহে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, আইন ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এই ক্ষমতাধর জেনারেলের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
গত তিন বছরে শি জিনপিং দুর্নীতি ও অবিশ্বস্ততার অভিযোগে অনেক জেনারেলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছেন। কিন্তু জেনারেল ঝাংয়ের পতন সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার ঘটনা। যারা শি জিনপিংকে খুব ভালো চেনেন বলে দাবি করতেন, তারাও এই ঘটনায় হতবাক।
সুলিভান একে 'রাজনৈতিক ভূমিকম্প'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, 'যার সঙ্গে শি জিনপিংয়ের এত দীর্ঘ ইতিহাস, তাকে এভাবে সরিয়ে দেওয়াটা সত্যিই বিস্ময়কর। এটি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।'
৭৫ বছর বয়সী জেনারেল ঝাংকে চাইলে সম্মানের সঙ্গে অবসরে পাঠানো যেত। কিন্তু শি জিনপিং তাকে জনসমক্ষে অপদস্থ করার পথই বেছে নিলেন। রোববারের 'লিবারেশন আর্মি ডেইলি'র সম্পাদকীয়তে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং শি জিনপিংয়ের প্রতি অবিশ্বস্ততার অভিযোগ রয়েছে।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, জেনারেল ঝাং এবং তার সঙ্গে পতন হওয়া আরেক কমান্ডার জেনারেল লিউ জেনলি সামরিক চেয়ারম্যানের (অর্থাৎ শি জিনপিংয়ের) কর্তৃত্বকে 'পায়ের তলায় পিষেছেন'। তারা সেনাবাহিনীর ওপর কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র নেতৃত্বকে 'মারাত্মকভাবে খাটো' করেছেন। তাদের কর্মকাণ্ড সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভিত্তি ও যুদ্ধের প্রস্তুতিতে 'বিশাল ক্ষতি' করেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'র্যান্ড'-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শানশান মে বলেন, 'লেখাটি পড়ে মনে হচ্ছে তারা সত্যিই শি জিনপিংকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। এটি ছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা। দুর্নীতির কথা বলা হলেও মূল অভিযোগটি রাজনৈতিক—শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইমানি করা।'
কেন শি জিনপিং শেষ পর্যন্ত নিজের সবচেয়ে কাছের জেনারেল ঝাংয়ের বিরুদ্ধে গেলেন, তা নিয়ে বেইজিং ও আন্তর্জাতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা। কেউ কেউ মনে করেন, অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা সরে যাওয়ার পর জেনারেল ঝাং হয়তো খুব বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন, যা শি জিনপিংয়ের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার কেউ ভাবছেন, দুর্নীতি এত গভীরে পৌঁছেছে যে নতুন প্রজন্মের কমান্ডারদের জন্য পথ পরিষ্কার করতে শি জিনপিংকে বড় ধরনের 'শুদ্ধি অভিযান' চালাতে হয়েছে।
এরই মধ্যে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। রোববার 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, জেনারেল ঝাংয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরমাণু গোপনীয়তা ফাঁসের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তের সময়ের কারণে জেনারেল ঝাংয়ের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোর দিকে সবার নজর পড়েছে। তবে জ্যাক সুলিভান জানান, ২০২৪ সালে পরমাণু ইস্যুতে তাদের আলোচনা ছিল একদম সাধারণ পর্যায়ের। সেখানে আরও ২০ জন চীনা সামরিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, জেনারেল ঝাং সংবেদনশীল বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য তাদের দেননি।
শি জিনপিং এবং জেনারেল ঝাং—দুজনেই 'প্রিন্সলিং' বা বিপ্লবীদের সন্তান। মাও সেতুংয়ের অধীনে তাদের বাবারা কাজ করেছিলেন। জেনারেল ঝাংয়ের বাবা এবং শি জিনপিংয়ের বাবা শি ঝংজুন উত্তর-পশ্চিম চীনে একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। শৈশবে তাদের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ না থাকলেও, পারিবারিক এই পটভূমি তাদের সম্পর্ক শক্ত করতে হয়তো সাহায্য করেছিল।
জেনারেল ঝাং ছিলেন একজন সমাদৃত যুদ্ধফেরত প্রবীণ সৈনিক। চীনে বর্তমানে খুব কম কমান্ডারেরই সত্যিকারের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে। শি জিনপিং তাকে অবসরের বয়সের পরেও পদে বহাল রেখেছিলেন এবং 'সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন'-এর ভাইস চেয়ারম্যান বানিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর দৈনন্দিন কাজে শি জিনপিংয়ের 'চোখ ও কান'।
এখন জেনারেল ঝাংয়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হলে তাকে সামরিক বিচার ব্যবস্থায় গোপন বিচারের মুখোমুখি হতে হতে পারে। আর তেমনটা হলে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং কারাদণ্ড প্রায় নিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকার সাবেক সম্পাদক দেং ইউওয়েন বলেন, 'জেনারেল ঝাংয়ের পতন বেইজিংয়ের ক্ষমতাধরদের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। কারণ তাদের নিরাপত্তার একটি বড় দেয়াল সরে গেল। খোদ শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও যখন জেনারেল ঝাংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারল না, তখন আর কেউই নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারবেন না।'
১৯৬৮ সালের শেষের দিকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন জেনারেল ঝাং। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে চীনের দীর্ঘ সীমান্ত যুদ্ধে তিনি সম্মুখসারির অফিসার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। সৈন্যদের বর্ণনায় তিনি ছিলেন সাহসী ও কৌশলী নেতা। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত যুদ্ধের ইতিহাসে দেখা যায়, তিনি এক জুনিয়র অফিসারকে বলেছিলেন, 'আগে আমাদের শত্রুর গলা টিপে ধরতে হবে যাতে সে পালাতে বা নড়তে না পারে, তারপর আমরা আঘাত করব।'
২০১২ সালে চীনের নেতা হওয়ার পর শি জিনপিং দ্রুত সেনাবাহিনী ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। তখন সেনাবাহিনী দুর্নীতিতে ভরা ছিল এবং পুরনো চিন্তাধারায় আটকে ছিল। জেনারেল ঝাং ছিলেন সেই গুটি কয়েক কমান্ডারের একজন, যাকে শি জিনপিং 'পিপলস লিবারেশন আর্মি' বা পিএলএ সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়।
সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক জেমস চার বলেন, '২০১৫ সালের শেষের দিকে শি জিনপিং সেনাবাহিনীর ওপর পুরোপুরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আগে জেনারেল ঝাংই ছিলেন তার সামরিক সংস্কার এজেন্ডার মূল চাবিকাঠি।'
২০১২ সালে জেনারেল ঝাং যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া চীনা সামরিক প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন। পেন্টাগনের তৎকালীন কর্মকর্তা ড্রু থম্পসন বলেন, জেনারেল ছিলেন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও কৌতূহলী।
সোমবার এক পোস্টে মিস্টার থম্পসন বলেন, 'তিনি কক্ষে ঢুকলে অন্য চীনা কর্মকর্তারা দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন।' তিনি আরও বলেন, 'অন্য অনেক সিনিয়র অফিসারের মতো বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলতে তিনি ভয় পেতেন না বা জড়তা দেখাতেন না।'
ওই বছরের শেষের দিকে তাকে চীনা সেনাবাহিনীর অস্ত্র বিভাগের প্রধান করা হয়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল ম্যাটিংলি বলেন, 'বিভাগটি ছিল দুর্নীতির আঁতুড়ঘর। দামী অস্ত্র তৈরি ও কেনাকাটার কারণে এটি ঘুষ ও কমিশন খাওয়ার উপযুক্ত জায়গা ছিল।'
এই বিভাগে কাজ করা অন্য অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা পরে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ধরা পড়েন। কিন্তু জেনারেল ঝাং দীর্ঘদিন তদন্তের বাইরে ছিলেন।
এখন জেনারেল ঝাংয়ের এই অপসারণ তাইওয়ান নিয়ে চীনের কৌশল এবং যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মিস্টার থম্পসন মনে করেন, জেনারেল ঝাং যুদ্ধ দেখেছেন এবং এর ভয়াবহতা জানেন।
জেনারেল ঝাং সম্পর্কে থম্পসন লিখেন, 'আমার মনে হয় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারতেন। তিনি শি জিনপিংকে বোঝাতে পারতেন যে তাইওয়ান দখলের অভিযানে ঝুঁকি ও খরচ কতটা হবে। ঝাং ইউজিয়া ছাড়া অন্য কেউ শি জিনপিংকে সামরিক পরামর্শ দিলে তার পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে আমি সত্যিই চিন্তিত।'
