‘সুপারগার্ল’: যে সিনেমার ব্যর্থতার মাশুল নারী সুপারহিরোদের গুনতে হয়েছে দীর্ঘ কয়েক দশক
জেমস গানের 'সুপারম্যান' (২০২৫) সিনেমায় তাঁকে দেখা গেছে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। কিন্তু ওইটুকু সময়েই দর্শকের মনে দাগ কেটেছেন সুপারগার্ল। এর একটা বড় কারণ অবশ্য তাঁর পোষা কুকুর 'ক্রিপ্টো'। ডিসি কমিকসের আদলে তৈরি এই কুকুরটি সিনেমার অন্যতম আকর্ষণ।
সুপারম্যানের কাজিন তিনি, আসল নাম কারা জোর-এল। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছে, ডিসি এবার কোন পথে হাঁটতে যাচ্ছে। এক কিশোরী সুপারহিরো—যে কিনা বেশ 'বিদ্রোহী' ও বেপরোয়া। ঠিক যেন বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের পছন্দসই চরিত্র। সদ্য মুক্তি পাওয়া ট্রেইলারেও মিলল সেই ঝাঁজ।
ব্লন্ডির বিখ্যাত গান 'কল মি'র তালে দেখা যায় ট্রেইলারের দৃশ্য। সুপারম্যানের ছবি ছাপা এক খবরের কাগজে প্রস্রাব করছে কুকুর ক্রিপ্টো। ওদিকে হ্যাংওভার কাটিয়ে ঘুম ভাঙছে কারার। এরপরই শুরু হয় ধুন্ধুমার অ্যাকশন আর স্পেশাল ইফেক্টের কারিশমা।
এবারের সুপারগার্ল হিসেবে পর্দায় আসছেন মিলি অ্যালকক। 'হাউস অব দ্য ড্রাগন' সিরিজে কিশোরী র্যানিরা টারগারিয়েন চরিত্রে অভিনয় করে যিনি আগেই নজর কেড়েছেন। তবে এবার জেমস গান পরিচালনার দায়িত্বে নেই। ক্যামেরার পেছনে আছেন ক্রেইগ গিলেস্পি, যিনি এর আগে 'আই, টনিয়া' ও 'ক্রুয়েলা'র মতো আলোচিত সিনেমা বানিয়েছেন।
সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ২৬ জুন সিনেমাটি মুক্তি পাবে। অটো বাইন্ডার ও আল প্লাস্টিনোর সৃষ্টি করা এই চরিত্রটি প্রথম বড় পর্দায় এসেছিল ৪২ বছর আগে। যদিও সেই সিনেমাটি ব্যবসায়িকভাবে চরম ব্যর্থ, যা নারী সুপারহিরোদের সিনেমার ভবিষ্যৎ একরকম অন্ধকারেই ঠেলে দিয়েছিল।
মিলি অ্যালককের আগে অনেকের কাছেই সুপারগার্ল মানে ছিলেন টিভি সিরিজের অভিনেত্রী মেলিসা বেনয়েস্ট। তবে পুরোনো ভক্তদের মনে থাকার কথা, আশির দশকের শুরুতে যখন সুপারম্যান ফ্র্যাঞ্চাইজি পড়তির দিকে, তখন এই সুপারগার্লকে দিয়েই নতুন হাওয়া লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
'সুপারম্যান ৩' বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ার পর প্রযোজকরা ভেবেছিলেন, এবার হয়তো ফ্র্যাঞ্চাইজিটি বাঁচাবে 'সুপারগার্ল'। সুপারম্যানের একঘেয়ে গল্পে নতুন প্রাণ দেওয়া আর নারী দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টানাই ছিল মূল লক্ষ্য। প্রযোজক ইলিয়া সালকাইন্ডের ভাষায়, 'নারী দর্শকদের ধরার বিষয়টি তো ছিলই, পাশাপাশি আমরা গতানুগতিক সুপারম্যান ছবির বদলে নতুন কিছু করতে চেয়েছিলাম।'
শুরুতে পরিকল্পনা ছিল 'সুপারম্যান' সিরিজের তৃতীয় কিস্তিতেই এই নতুন সুপারহিরোইনকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। পরে সিদ্ধান্ত বদলায়। ঠিক হয়, সুপারগার্লকে নিয়ে আলাদা ছবি হবে, আর সেখানে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেবেন খোদ সুপারম্যান (ক্রিস্টোফার রিভ)। কিন্তু রিভ রাজি হলেন না। মূলত পারিশ্রমিক নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় তিনি সরে দাঁড়ান। অগত্যা চিত্রনাট্য বদলাতে হলো। সুপারম্যানের বদলে ছবিতে রাখা হলো তাঁর বন্ধু জিমি ওলসেন এবং লয়েসের বোন লুসি লেইনকে।
ছবিটি মহাকাব্যিক দারুণ কোনো অ্যাডভেঞ্চার হতে পারত, কিন্তু শেষমেশ এটি দাঁড়াল বেশ সাধারণ ও গতানুগতিক এক গল্পে। ক্রিপ্টোনিয়ানদের শহর আরগো সিটি থেকে 'ওমেগাহেড্রন' নামের এক শক্তিশালী বস্তু খুঁজতে পৃথিবীতে আসে কারা জোর-এল। সেই জাদুকরী বস্তু তখন সেলিনা নামের এক জাদুকরের হাতে। পৃথিবীতে এসে কারা হয়ে ওঠে সুপারগার্ল, আর পরিচয় লুকাতে লিন্ডা লি নাম নিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়। ঠিক যেন সুপারম্যানেরই নারী সংস্করণ।
ছবির গল্প যেমন সুপারম্যানের ছকে বাঁধা, তৈরির কায়দাও ছিল এক। সালকাইন্ডরা চেয়েছিলেন নামী তারকার বদলে নতুন কাউকে নিতে। ব্রুক শিল্ডসের নাম প্রস্তাব করা হলেও দ্রুতই তা বাতিল হয়। অডিশনে ভিড় করেছিলেন ডেমি মুর ও মেলানি গ্রিফিথের মতো সে সময়ের উঠতি তারকারা। তবে শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয় ড্রামা স্কুলের শিক্ষার্থী হেলেন স্লেটারকে, পর্দায় যার উপস্থিতি ছিল নগণ্য।
ছবিতে পিটার ও'টুল আর ফেই ডানাওয়ের মতো বড় তারকারা ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁরা কেউই নিজেদের সেরাটা দিতে পারেননি। উল্টো বাজে অভিনয়ের জন্য পুরস্কারের মনোনয়ন জুটেছিল তাঁদের। পিটার ও'টুলের মদ্যপানের সমস্যা ছিল প্রকট, যদিও হেলেন স্লেটারের কাছে তিনি ছিলেন বেশ অমায়িক।
তবে সেটে ফেই ডানাওয়ের আচরণ ছিল একেবারেই উল্টো। 'নেটওয়ার্ক' খ্যাত এই অভিনেত্রী আগের এক সিনেমায় সমালোচিত হয়ে এই ছবির মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে মরিয়া ছিলেন। কিন্তু পরিচালক জেনট শোয়ার্ক তাঁকে আটকে রাখতেন। ডানাওয়ে পরে বলেছিলেন, 'আমি পরিচালকের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলাম। আমি কিছু করতে চাইলেই তিনি বাধা দিতেন।' সহশিল্পী ব্রেন্ডা ভ্যাকারোর মতে, ডানাওয়ে দুর্দান্ত অভিনেত্রী হলেও মানুষ হিসেবে ছিলেন রীতিমতো 'আতঙ্কজাগানিয়া'।
শুটিংয়ের সময় অভিনেত্রী ফেই ডানাওয়েকে সবাই বেশ 'কঠিন' ও বদমেজাজি ভাবতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হেলেন স্লেটারের (সুপারগার্ল) সেই ভুল ভেঙেছে। বয়স বাড়ার পর তিনি বিষয়টি দেখেছেন অন্য চোখে। তাঁর মতে, অভিনেত্রীদের ওপর পুরুষদের চেয়ে বেশি সমালোচনা হয়। হেলেন বলেন, 'এখন বুঝতে পারি, ইন্ডাস্ট্রিতে নারীরা কতটা অসহায়। পুরুষদের মতো সমান সুযোগ আমরা পাই না। নিজের কাজের মান বা অধিকার নিয়ে কথা বললেই নারীদের গায়ে 'কঠিন' তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়।'
সিনেমার চিত্রনাট্যেও বড় ধরনের কাঁচি চালাতে হয়েছিল। কারণ আর কিছুই নয়—বাজেট সংকট। চিত্রনাট্যকার ডেভিড ওডেল শুরুতে যে গল্প লিখেছিলেন, তা ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু প্রযোজক ইলিয়া সালকাইন্ডের মতে, সেই গল্প পর্দায় আনতে লাগত অন্তত ২০ কোটি ডলার। ওডেলের গল্পে ভিলেন সেলিনা পুরো পৃথিবী দখল করে নিয়েছিল, যার জন্য প্রচুর স্পেশাল ইফেক্টের দরকার ছিল। খরচ কমাতে গিয়ে গল্পের অনেক ভালো অংশ বাদ দিতে হয়। সালকাইন্ড পরে আফসোস করে বলেছিলেন, 'আমরা অনেক ভালো কিছু হারিয়েছি, কারণ ওটা বানানোর সামর্থ্য আমাদের ছিল না।'
বাজেট কমানোর ফলে গল্পের বিশালতাও কমে গেল। বিশ্বজয়ের বদলে ভিলেনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল আমেরিকার ছোট্ট একটি শহর দখল করা। আর সুপারহিরোইনকে মহাজাগতিক ভিলেনের বদলে লড়তে হলো সামান্য এক এক্সকাভেটর বা মাটি কাটার যন্ত্রের সঙ্গে!
সিনেমার প্লট মাঝে মাঝে সুপারহিরো সিনেমার বদলে সাধারণ 'ক্যাটফাইট'-এর মতো মনে হয়েছে। যেখানে দুই নারী মারামারি করছেন এক পুরুষের মন পাওয়ার জন্য। গল্পের একপর্যায়ে 'ভালোবাসার ওষুধের' ভুল ব্যবহারে ভিলেন সেলিনা ও সুপারগার্ল—দুজনেই এক মালির প্রেমে পড়ে যান। অথচ দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল টানটান উত্তেজনার এক সুপারহিরো অ্যাকশন। তা না হয়ে উল্টো দেখা গেল, সুপারগার্লের মধ্যে তথাকথিত পুরুষালি বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে, আর প্রেমের জাদুতে আচ্ছন্ন হয়ে নায়ক হয়ে গেছেন 'নারীসুলভ' দুর্বলতা ও অতিরিক্ত আবেগের প্রতিমূর্তি।
চিত্রনাট্যে বারবার ঘষামাজা আর সুপারম্যান খ্যাত ক্রিস্টোফার রিভের না থাকা—সব মিলিয়ে শুরু থেকেই নড়বড়ে ছিল 'সুপারগার্ল' সিনেমার ভাগ্য। প্রাথমিক প্রদর্শনীর ফলাফল এতটাই হতাশাজনক ছিল যে, সিনেমার দৈর্ঘ্য আধা ঘণ্টা কমিয়ে ফেলা হয়। এমনকি ওয়ার্নার ব্রাদার্স ছবিটিকে এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিল যে, তারা এর স্বত্ব বিক্রি করে দেয় ট্রাই-পিকচার্সের কাছে।
বড় বাজেটের এই সিনেমাটি গ্রীষ্মকালেই মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের ডামাডোলে দর্শক হারানোর ভয়ে মুক্তির তারিখ পিছিয়ে নেওয়া হয় বড়দিনে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহে বক্স অফিসে এটি শীর্ষে থাকলেও, তা ছিল নিতান্তই কাকতালীয়। পরের সপ্তাহেই মুখ থুবড়ে পড়ে ছবিটি।
সে সময় হেলেন স্লেটারের অভিনয় সমালোচকদের মন জয় করতে পারেনি। প্রযোজক সালকাইন্ডও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, হেলেনের বদলে ব্রুক শিল্ডসকে নিলে হয়তো ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হতেন। তবে সময়ের সঙ্গে পাশার দান উল্টে যায়। ভিডিও ক্যাসেট আর টেলিভিশনে প্রচারের সুবাদে ছবিটি পরে দর্শকপ্রিয়তা পায়, তৈরি হয় নতুন ভক্তগোষ্ঠী। দর্শকের এই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে ভোলেননি স্লেটারও। অনেক তারকা যেখানে নিজের ফ্লপ ছবির কথা বেমালুম ভুলে যেতে চান, সেখানে স্লেটার ফিরে এসেছেন ডিসি ইউনিভার্সে। অভিনয় করেছেন 'স্মলভিল'-এ সুপারম্যানের মা এবং টিভি সিরিজ 'সুপারগার্ল'-এ পালক মায়ের চরিত্রে।
এই ছবিটি দীর্ঘ সময়ের জন্য নারী সুপারহিরোদের সিনেমার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল, এমনকি স্লেটারের ক্যারিয়ারের গতিও কমিয়ে দিয়েছিল। তবু তাঁর মনে কোনো খেদ নেই, আছে কেবল ভালো লাগা। স্লেটার বলেন, 'তখন আমার বয়স ১৮, হাইস্কুল শেষ করে অভিনয়ে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য এক বছর সময় নিয়েছিলাম। তখনই পেলাম এই বিশাল সুযোগ। নিউইয়র্কে মায়ের সঙ্গে সাধারণ জীবন কাটানো এক কিশোরীর জন্য এটা ছিল স্বপ্নের মতো। আমি কৃতজ্ঞ, কারণ সুপারগার্ল আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে।'
