সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছেন ট্রাম্প, ইরান বলছে যোগাযোগের চ্যানেল খোলা আছে
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবলেও— ইরান আজ সোমবার জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের যোগাযোগের পথ খোলা রাখা হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে এই বিক্ষোভকে।
এর আগে গতকাল রোববার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারে এবং তিনি (ইরানের) বিরোধী পক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। একইসঙ্গে তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়ান, এমনকি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জবাবে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী ও ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্যের মৃত্যুর বিষয়টি তারা যাচাই করেছে এবং ১০ হাজার ৬০০–এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, তারা স্বাধীনভাবে এসব তথ্য যাচাই করতে পারেনি। বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় ইরান থেকে তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
তবে রয়টার্সের যাচাইকৃত একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রোববার তেহরানের কাহরিজাক ফরেনসিক সেন্টারে সারিবদ্ধ কালো মরদেহের ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকে।
ইরান সরকার এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মৃত্যুসংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে রক্তপাতের জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং তাদের ভাষায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত 'সন্ত্রাসীদের' দায়ী করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো মূলত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'যোগাযোগের চ্যানেল' খোলা আছে: আরাঘচি
ইরানের নেতারা এমন এক সময় দেশজুড়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন, যখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে জনগণের ক্ষোভ রূপ নিয়েছে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতনের দাবিতে। একইসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের প্রভাবও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে ইরানের বিক্ষোভকারীদের কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই।
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেয়ি বলেন, "আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত (স্টিভ উইটকফ)-এর মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেল খোলা রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে বার্তা আদান–প্রদানও করা হয়।"
তিনি বলেন, ঐতিহ্যগত মধ্যস্থতাকারী সুইজারল্যান্ডের মাধ্যমেও যোগাযোগ অব্যাহত আছে।
"তারা (যুক্তরাষ্ট্র) কিছু বিষয় উত্থাপন করেছে, কিছু ধারণা এসেছে এবং সামগ্রিকভাবে (...) ইরান এমন একটি দেশ, যে কখনো আলোচনার টেবিল ছেড়ে যায়নি।" তবে তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা "বিরোধী বার্তা" তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি দেখায় এবং তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে আরাঘচি পুনরায় বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, তবে সংলাপের পথও খোলা রয়েছে।
আজ তেহরানের ইনকিলাব চত্বরে বিশাল সমাবেশে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, ইরান চারটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করছে—"অর্থনৈতিক যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ এবং এখন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।"
এদিন আরাঘচি বলেন, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে মোট ৫৩টি মসজিদ ও ১৮০টি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বিদেশি এজেন্টরা রয়েছে এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, "কোনো ইরানি মসজিদে হামলা করবে না।"
তেহরানের আবুজার মসজিদের ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মুখোশ পরা কিছু ব্যক্তি ধর্মীয় বই-পুস্তক মেঝেতে ছুড়ে ফেলছে এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করছে। রয়টার্স ফুটেজটির সময় ও স্থান যাচাই করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ৯ জানুয়ারি ওই মসজিদে আগুন দেওয়া হয়।
'আমরা বৈঠকে বসতে পারি'—ট্রাম্প
রোববার ট্রাম্প বলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করেছে। জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে পরিবহনকারী উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "ইরান আলোচনা করতে চায়, হ্যাঁ। আমরা তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারি। একটি বৈঠকের আয়োজন হচ্ছে, তবে বৈঠকের আগে যা ঘটছে তার কারণে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। কিন্তু, বৈঠকের আয়োজন হচ্ছে। ইরানের কর্মকর্তারা ফোন করেছে, তারা আলোচনা করতে চায়।"
আগামীকাল মঙ্গলবার ইরান বিষয়ে বিকল্পগুলো নিয়ে শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা ছিল ট্রাম্পের, এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান। প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, বিকল্পগুলোর মধ্যে ইরানে সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্র ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা এবং সরকারবিরোধী শক্তিকে অনলাইনে সহায়তা দেওয়ার মতো বিষয়গুলো রয়েছে।
সামরিক স্থাপনায় হামলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড ও নিরাপত্তা বাহিনীর বেশকিছু ঘাঁটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত, ফলে ট্রাম্পের নির্দেশে কোনো হামলা হলে বড় ধরনের বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।
এমতাবস্থায় ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার কালিবাফ ওয়াশিংটনকে "ভুল হিসাব" না করার সতর্কবার্তা দেন।
তিনি বলেন, "স্পষ্ট করে বলছি: ইরানে হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে।" কালিবাফ ইরানের অভিজাত বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক কমান্ডার।
তবে তেহরান এখনো গত বছরের যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠছে এবং ৭ অক্টোবর ২০২৩–এ ইসরায়েলের ওপর হামলার পর থেকে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ মিত্রদের ওপর আঘাতে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। জুনের যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদেরও হত্যা করে।
পরিস্থিতি 'পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে': আরাঘচি
বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় দেশটিতে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে; পরে তা ৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রূপ নেয়।
এছাড়া তেল–গ্যাস, নির্মাণ ও টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা থাকা শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রতিও ইরানিদের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে বলে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো দাবি করছে।
এই অবস্থায় আজ সোমবার আরাঘচি বলেন, সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ–সংশ্লিষ্ট সহিংসতা বাড়লেও পরিস্থিতি এখন "পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে"। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্পের সতর্কবার্তা তথাকথিত সন্ত্রাসীদের উসকে দিয়েছে—যাতে তারা বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ ডেকে আনতে পারে।
তিনি জানান, নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু করা হবে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিন্দায় আজ দেশজুড়ে সমাবেশের ডাক দিয়েছে ইরানের সরকার।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সোমবার সরাসরি সম্প্রচারিত ফুটেজে শাহরুদে নিহত নিরাপত্তা সদস্যদের জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে অংশ নিতে দেখা যায়। এছাড়া কেরমান, জাহেদান ও বীরজান্দসহ বিভিন্ন শহরে সরকারের সমর্থনে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। "সাম্প্রতিক সন্ত্রাসবাদী ঘটনাগুলোর প্রতিবাদে" হিসেবে এসব বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
ইরানের আধা–সরকারি স্টুডেন্টস নিউজ নেটওয়ার্ক (এসএনএন) জানিয়েছে, ইসফাহান প্রদেশে আজ ও আগামীকাল ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের জানাজা হবে।
