ইরানের পর ইসরায়েলের পরবর্তী নিশানায় কি তুরস্ক?
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে তুরস্কের অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা আরও দৃঢ় হয়েছে।
আঙ্কারা এই ঘটনাকে কেবল সীমিত আকারের হামলা-পাল্টা হামলা বা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাতের আরেকটি অধ্যায় হিসেবে দেখছে না। তাদের মতে, এটি একটি বড় আঞ্চলিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত, যা পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত সব দেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
তুরস্কের দৃষ্টিতে ইরানের ওপর হামলা অঞ্চলকে শান্ত করার উপায় নয়; বরং এটি অস্থিতিশীলতা আরও বাড়াবে। এ কারণেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও প্রেসিডেন্টের দপ্তরের প্রতিনিধিরা ধারাবাহিকভাবে বিবৃতি দিয়ে হামলার নিন্দা, উদ্বেগ এবং বড় যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এরদোয়ান একটি বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানান এবং কূটনৈতিক সমাধান ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান, যাতে পুরো অঞ্চল বড় সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে।
একই দিনে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং বেসামরিক মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা এমন কর্মকাণ্ডে আঙ্কারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে এমন উসকানির নিন্দা করে তুরস্কের কূটনীতি। সেইসঙ্গে তারা এই হামলা দ্রুত বন্ধ করার আহ্বান জানায় এবং আবারও জোর দিয়ে বলে যে আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান কেবল শান্তিপূর্ণ উপায়ে সম্ভব।
তুরস্ক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতেও প্রস্তুত বলে জানায়। একই দিনে প্রেসিডেন্ট দপ্তরের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান বুরহানেত্তিন দুরান বলেন, এই পরিস্থিতি শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকেই নয়, বরং আরও বিস্তৃত অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। তাই দ্রুত সংলাপ ও আলোচনার প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা জরুরি। এসব প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াতেই আঙ্কারার অবস্থানের মূল যুক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক উত্তেজনা কেবল ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা অবশ্যই পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।
দুই দিন পরে ২ মার্চ, এরদোয়ান তার অবস্থান আরও শক্ত করেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরদোয়ান ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, তুরস্ক ইরানি জনগণের প্রতি সহমর্মিতা জানায়। এটি আর কেবল কূটনৈতিক ভাষা ছিল না; বরং একটি দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং কূটনীতির সুযোগ ফিরিয়ে আনতে আঙ্কারা সব স্তরে যোগাযোগ বাড়াবে।
এরদোয়ান বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেন, তুরস্ক তার সীমান্তে যুদ্ধ, গণহত্যা, উত্তেজনা ও ব্যাপক সহিংসতা দেখতে চায় না; প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে এর পরিণতি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুতর হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে এরদোয়ান বলেন, এমন পরিস্থিতিতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বোঝা কেউই বহন করতে পারবে না। তাই এই আগুন আরও বড় হওয়ার আগেই নিভিয়ে ফেলতে হবে। এটি এরদোয়ানের রাজনৈতিক ভাষায় খুবই পরিচিত একটি ধারণা—তিনি শুধু নৈতিকতা বা আইনের কথা বলেননি; বরং বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকেও বলেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলার কারখানা হয়ে উঠবে।
পরের দিন ৩ মার্চ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিশ্চিত করেন যে যুদ্ধ শেষ করা এবং আবার আলোচনায় ফিরে যাওয়ার জন্য আঙ্কারা সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে তুরস্ক সব পক্ষের সঙ্গে সতর্কভাবে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে এবং ইরান ও পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
ফিদান সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত জ্বালানি সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর কোনো প্রভাব পড়লে সংকট দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে। কারণ, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের বৃহৎ একটি অংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়ে থাকে।
এই মন্তব্য তুরস্কের অবস্থান বোঝার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আঙ্কারা যুদ্ধকে শুধু সামরিক মানচিত্রের দৃষ্টিতে দেখে না; তারা পরিবহন পথ, জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য রুট এবং দেশের ভেতরের সামাজিক প্রভাবের দিক থেকেও দেখে।
তুরস্ক একটি বড় আমদানি নির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় হরমুজ প্রণালির কাছে যুদ্ধ মানে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য ওঠানামা নয়; বরং দাম বাড়া, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং দেশের ভেতরে নতুন অস্থিরতার ঝুঁকি।
ভূরাজনীতি ও দেশের ভেতরের স্থিতিশীলতার এই সম্পর্ক তুরস্কের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস আমদানি করে, যার মধ্যে ১৪.৩ বিলিয়ন ঘনমিটার এলএনজি আকারে আসে।
রয়টার্স আরও জানায়, তুরস্কের কর্তৃপক্ষ নিজেরাই স্বীকার করেছে যে জ্বালানি খরচ দেশের অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা এবং অনেক ভোক্তা ভর্তুকিযুক্ত দামের ওপর নির্ভরশীল।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারা জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নত করা এবং নতুন চুক্তি করার চেষ্টা করছে, তবুও কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে। অর্থাৎ, আঞ্চলিক জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় কোনো ধাক্কা লাগলে তা তুরস্কের জন্য সরাসরি ব্যয়বহুল আমদানি, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজেটের ওপর চাপ, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার অবনতির ঝুঁকিতে পরিণত হয়। তাই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিয়ে তুরস্কের সতর্কবার্তা মূলত নিজেদের জাতীয় স্বার্থের হিসাব থেকেই আসে।
তবে আঙ্কারার অবস্থানকে শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা ভুল হবে। তুরস্ক মনে করে, সামরিকভাবে ইরানকে ধ্বংস করলে শান্তি আসবে না। বরং এতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভেঙে যাবে এবং নতুন করে যুদ্ধ, প্রক্সি সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার শৃঙ্খল শুরু হবে, যা ইরাক ও সিরিয়া থেকে শুরু করে ককেশাস এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। এটিই আঙ্কারার প্রধান কৌশলগত উদ্বেগ।
তুরস্কের কর্তৃপক্ষ ইরানের নীতি সম্পর্কে কোনো ভুল ধারণা পোষণ করে না। সিরিয়া, ইরাক, দক্ষিণ ককেশাস এবং পরিবহন করিডর নিয়ে তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। তবুও তুরস্কের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আঙ্কারা ইরানকে কোনো আদর্শিক মিত্র হিসেবে সমর্থন করছে না। বরং তারা ইরানকে জোর করে ভেঙে দেওয়ার বিরুদ্ধে। কারণ, তারা মনে করে এতে পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থাই আরও ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়বে।
এরদোয়ান ও ফিদান মূলত বলতে চাইছেন—অস্থির, উত্তেজনাপূর্ণ ও সংঘাতপূর্ণ ভারসাম্য থাকলেও সেটি পুরো ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধ্বংসের চেয়ে ভালো; কারণ সেই ধ্বংসের পর পুরো অঞ্চল স্থায়ী অস্থিরতায় ঢুকে যেতে পারে।
গত দুই সপ্তাহে এই যুক্তি আরও ভয়াবহ রূপ পেয়েছে। ১২ মার্চ হাকান ফিদান বলেছিলেন, আঙ্কারা ইরানে গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়া বা জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন বাড়ানোর যেকোনো পরিকল্পনার কঠোর বিরোধী।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব শেষ হওয়া দরকার এবং তা থামানোর জন্য তুরস্ক সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এই বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন একটি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন, যেটিকে আঙ্কারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়—শুধু ইরানের দুর্বল হওয়া নয়, বরং দেশটির ভেতরেই ভাঙন শুরু হওয়া। তুরস্কের জন্য ইরানে গৃহযুদ্ধ মানে শুধু শক্তির ভারসাম্য বদলানো নয়; বরং তাদের সীমান্তের একেবারে কাছে বিশাল অস্থিরতার অঞ্চল তৈরি হওয়া, যার প্রভাব অবশ্যম্ভাবীভাবে ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে।
এই আশঙ্কাগুলো কেবল কল্পনাভিত্তিক নয়। ৯ ও ১০ মার্চ তুরস্ক সরাসরি এই বিস্তৃত যুদ্ধের প্রভাবের মুখোমুখি হয়।
রয়টার্সের মতে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। পরে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি প্রতিহত করে। এরপর আঙ্কারা তেহরানকে জানায়, এ ধরনের আকাশসীমা লঙ্ঘন গ্রহণযোগ্য নয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে হাকান ফিদান স্পষ্ট করে বলেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তুরস্ক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে—এই ঘটনাই দেখায় যে আঙ্কারার জন্য এই যুদ্ধ আর বাইরের কোনো ঘটনা নয়। এটি বাস্তবিক অর্থেই তুরস্কের সীমান্তের কাছে চলে এসেছে এবং তুরস্কের সার্বভৌমত্বকে স্পর্শ করছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ওপর হামলার নিন্দা করা তুরস্কের জন্য কোনো আদর্শিক অবস্থান নয়; বরং এটি আত্মরক্ষার এক ধরনের পদক্ষেপ। তুরস্ক মূলত সেই মুহূর্তটি ঠেকাতে চায়, যখন অন্যের যুদ্ধ তাদের নিজেদের সংকটে পরিণত হবে।
সেই সময় তুরস্কের প্রেসিডেন্টও ঠিক এই বিষয়টিই জোর দিয়ে তুলে ধরেন। ১১ মার্চ এরদোয়ান বলেন, পুরো অঞ্চল আগুনে জড়িয়ে পড়ার আগেই ইরানের যুদ্ধ থামাতে হবে। মূলত এটি ছিল তার আগের অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা।
পরবর্তী দুই দিনে তুরস্কের সরকারি বার্তাগুলো থেকেও বোঝা যায় যে আঙ্কারা তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে এবং প্রকাশ্যে বলছে যে ইরান সংকট যেন আর ছড়িয়ে না পড়ে তা ঠেকানো জরুরি। প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ দপ্তরের ওয়েবসাইটেও বলা হয়, তুরস্ক ইরানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সহিংসতার বিস্তার ঠেকাতে সক্রিয় কূটনীতি চালাচ্ছে এবং এই অগ্নিঘূর্ণি থেকে দেশকে দূরে রাখা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
এই ভাষাগুলো নিজেই অনেক কিছু প্রকাশ করে। আঙ্কারার দৃষ্টিতে এটি আর কেবল প্রতিবেশি দেশের সংকট নয়; বরং এমন এক আগুনের ঘূর্ণাবর্ত, যা আশপাশের সবাইকে টেনে নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের নীতির গভীর উদ্দেশ্য আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তুরস্ক খুব ভালো করেই মনে রেখেছে, শক্তি প্রয়োগ করে মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে সাজানোর আগের প্রচেষ্টাগুলোর পরিণতি কী হয়েছিল। ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ার উদাহরণ—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়া, বিপুল শরণার্থী প্রবাহ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান, চোরাচালানের ধূসর অঞ্চল তৈরি হওয়া, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং পর্যটন, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত—এসব তুরস্কের জন্য কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা।
এই কারণেই আঙ্কারার দৃষ্টিতে ইরানের ওপর হামলা একই পথে আরেকটি পদক্ষেপ, তবে অনেক বড় মাত্রায়। যদি সিরিয়ার ভাঙনই বহু বছর ধরে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করে থাকে, তাহলে ইরানের মতো বড় ভূখণ্ড, জনসংখ্যা ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি দেশের অস্থিরতা তার চেয়েও অনেক বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তুরস্কের কর্মকর্তারা যখন বিস্তৃত যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং দ্রুত আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান, তখন তারা মূলত এই বিষয়টিই বোঝাতে চান।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আঙ্কারা মনে করে ইসরায়েলের পদক্ষেপ শুধু তাৎক্ষণিক হুমকির জবাব নয়; বরং পুরো অঞ্চলকে জোর করে নতুনভাবে গঠন করার একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এবং তুর্কি কূটনীতির ভাষায়—উসকানি, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার চেষ্টা—এই মূল্যায়ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
তুরস্ক যে ঘটনাগুলোকে সহিংসতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে করা উসকানি হিসেবে দেখছে, তা থেকেই বোঝা যায় যে আঙ্কারা ইসরায়েলের নীতিকে কেবল প্রতিরক্ষামূলক বলে মনে করে না। বরং আঙ্কারায় উদ্বেগ রয়েছে যে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানের পর পরবর্তী ধাপে চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে অঞ্চলের অন্যান্য শক্তিকেন্দ্রগুলোর ওপর এবং যেকোনো শক্তির বিরুদ্ধে, যারা ইসরায়েলের সামরিক-রাজনৈতিক বিস্তারে বাধা দেয়।
তুরস্ক ঠিক সেই ধরনের শক্তিগুলোর মধ্যেই পড়ে। তাদের নিজস্ব সামরিক, কূটনৈতিক এবং ভূ-অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে, যা ইসরায়েলের পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তাই তুরস্কের কৌশলগত চিন্তায় ইরানের পরাজয়কে এই সংঘাতের শেষ হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটিকে দেখা হয় এমন এক সম্ভাব্য শুরু হিসেবে, যার পর স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে—যাদের মধ্যে তুরস্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
এই ধারণা সব সময় সরকারি ভাষায় স্পষ্টভাবে বলা হয় না, কিন্তু বিশ্লেষণমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে এটি স্পষ্টভাবে উপস্থিত এবং ধীরে ধীরে তুরস্কের আচরণ ও নীতিকে আরও বেশি প্রভাবিত করছে।
এই বিপদের ব্যাপারে আঙ্কারার সচেতনতা শুধু তাদের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব থেকে নয়; ইসরায়েল থেকে আসা কিছু বক্তব্য থেকেও এটি শক্তি পেয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির পটভূমিতে ইসরায়েলের রাজনীতিবিদরা ধীরে ধীরে তুরস্কের দিকেও মনোযোগ দিচ্ছিলেন, যেন এটি পরবর্তী আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত সে সময় বলেছিলেন, ইসরায়েল তুরস্ককে উপেক্ষা করতে পারে না। তিনি তুরস্ককে একটি নতুন হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, তেহরান থেকে আসা বিপদের পাশাপাশি আঙ্কারার শত্রুতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এর ফলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিসরে এমন একটি ধারণা ক্রমশ জোরালো হতে থাকে যে ইরানের পরবর্তী বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুরস্ককে দেখা হচ্ছে।
মার্চের শুরুর দিকে এই অবস্থান আরও খোলাখুলিভাবে প্রকাশ পায়, যখন তুরস্ক ও আঞ্চলিক কিছু প্রকাশনা সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেতের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায় যে ইরানের পর ইসরায়েল চুপ করে বসে থাকবে না এবং এরপর কী হবে তা অনেকটাই তুরস্কের নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
এই কারণেই আঙ্কারা বর্তমান যুদ্ধকে শুধু ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে তুরস্ককে লক্ষ্য করে পরবর্তী চাপের প্রস্তুতি হিসেবেও দেখে। তুরস্কের নেতৃত্বের কাছে বিষয়টি খুব সরল। ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তায় ইরানের পরাজয় এই সংঘাতের শেষ নয়। বরং এটি আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য নতুন এক প্রতিযোগিতার ধাপকে আরও কাছে নিয়ে আসবে, যেখানে তুরস্কই পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে।
এই কারণেই তুরস্ক একসঙ্গে কয়েকটি পদক্ষেপ নিচ্ছে। তারা ইরানের ওপর হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করছে। তারা আঞ্চলিক এমনকি বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করছে। তারা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর হুমকির বিষয়টিও তুলে ধরছে। একই সঙ্গে তারা মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
এর পাশাপাশি তুরস্ক নিজের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিও জোরদার করছে, কারণ তারা ইতিমধ্যেই বুঝতে পারছে যে সংঘাত চলতে থাকলে তুরস্কের ভূখণ্ড, অর্থনীতি এবং কৌশলগত স্বার্থ সরাসরি চাপে পড়বে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্কের নীতি কোনো বিরোধপূর্ণ নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে বাস্তববাদী। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-আমেরিকার সামরিক অভিযানের নিন্দা করা এবং একই সঙ্গে এই যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া বা যুদ্ধকে নিজের ভূখণ্ডে ঢুকতে না দেওয়ার দৃঢ়তা—এই দুই বিষয় তুরস্কের নীতিতে একসঙ্গেই বিদ্যমান।
আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে, তুরস্কের অবস্থান পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবস্থার সংকটকেই প্রতিফলিত করে। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে, তবে এতদিন কিছু সীমা বা বাধা ছিল, যা এই অস্থিরতাগুলোকে একসঙ্গে মিলিত হয়ে সর্বগ্রাসী আগুনে পরিণত হতে দেয়নি। আঙ্কারার মতে, ইরানের ওপর হামলা ঠিক সেই বাধাগুলোকেই ভেঙে দিচ্ছে।
এর ফলে একসঙ্গে অনেকগুলো সংকট একত্রিত হয়ে যাচ্ছে—ইরান, সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, জ্বালানি, পরিবহন এবং অভিবাসনসংক্রান্ত সংকট। তুরস্ক বুঝতে পারছে যে সংঘাত আরও বাড়লে তখন সামরিক ও অর্থনৈতিক ফ্রন্টকে আলাদা করে দেখা আর সম্ভব হবে না। যুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ, মুদ্রার দুর্বলতা, নিরাপত্তা খরচ বৃদ্ধি, রপ্তানি ও পর্যটনে আঘাত এবং শেষ পর্যন্ত অঞ্চলের দেশগুলোর ভেতরে সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তুরস্কের নেতৃত্ব খুব ভালো করেই জানে, বাইরের ধাক্কা ও ভেতরের চাপ একসঙ্গে এলে তা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সেই বক্তব্য—কেউই অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই বোঝা বহন করতে পারবে না—শুধু কথার কথা মনে হয় না; বরং এটি পুরো তুর্কি অবস্থানের সংক্ষিপ্ত প্রকাশের মতো শোনায়।
এই অবস্থান বাস্তবতার শীতল বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে। তুরস্ক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে অন্য কারও সমস্যা হিসেবে দেখার সামর্থ রাখে না। অস্থিতিশীল অঞ্চলের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং প্রতিবেশি দেশগুলোর যুদ্ধের প্রভাব নিজেরা বহু বার ভোগ করেছে। আঙ্কারার কাছে ইরান সংকট যেন ভবিষ্যতের অস্থিরতার একটি প্রায় গাণিতিক সূত্র—যদি সময়মতো এটি থামানো না যায়।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে তুরস্কের কর্মকর্তারা বিভিন্ন ভাষায় বারবার একই কথা বলে আসছেন—এই হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, কূটনীতিকে সুযোগ দিতে হবে, অঞ্চলকে আগুনের বৃত্তে টেনে নেওয়া যাবে না এবং শক্তির রাজনীতির নতুন ঢেউ সবকিছু ভাসিয়ে নেওয়ার আগে অন্তত যে সামান্য স্থিতি এখনো আছে তা রক্ষা করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতি তুরস্কের নিন্দা মূলত তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমটি হলো আইনি ভিত্তি। আঙ্কারা এই হামলাগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করে।
দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক। তুরস্ক মনে করে, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক সহিংসতার চক্রকে আরও দ্রুত বাড়িয়ে দেয় এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথকে নষ্ট করে দেয়।
তৃতীয়টি কৌশলগত ও সামাজিক-অর্থনৈতিক। তুরস্কের নেতৃত্ব বোঝে যে আঞ্চলিক যুদ্ধের আঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি রাষ্ট্রগুলোর দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলবে।
এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের বাজেট এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত হানবে—আর তুরস্কের জন্য এর পরিণতি বিশেষভাবে গুরুতর হতে পারে। এই তিনটি কারণের মিলিত জায়গা থেকেই তুরস্কের বর্তমান কঠোর অবস্থান তৈরি হয়েছে। এটি কোনো সহানুভূতির প্রকাশ নয়, আবার হঠাৎ কোনো আদর্শিক অবস্থানও নয়। বরং এটি এমন একটি রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির প্রকাশ, যে তার নিজের বাড়ির দিকে একটি বড় আগুন এগিয়ে আসতে দেখছে।
আজ আঙ্কারা বিশ্বকে একটি খুবই সরল কিন্তু গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনবে না। বরং এটি বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ভেঙে পড়া, নতুন যুদ্ধরেখা, নতুন অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং ক্রমাগত বাড়তে থাকা সংঘাতের নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে।
আর যখন ইরান একটি বড় নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে দুর্বল বা অদৃশ্য হয়ে যাবে, তখন অঞ্চলের নতুন করে শক্তির পুনর্বণ্টনের পরবর্তী ধাপ অনিবার্যভাবে তুরস্কের আরও কাছাকাছি চলে আসবে—প্রথমে তার স্বার্থের দিকে, পরে তার অবস্থানের দিকে এবং সবচেয়ে খারাপ ক্ষেত্রে তার নিরাপত্তার দিকেও।
তুরস্কের কর্মকর্তারা এখনো এই বিষয়টি মূলত কূটনীতি, আইন এবং সতর্কবার্তার ভাষায় তুলে ধরছেন। কিন্তু তাদের অবস্থানের কৌশলগত অর্থ খুবই স্পষ্ট। ইরানের ওপর হামলার নিন্দা করে আঙ্কারা শুধু প্রতিবেশি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করছে না; বরং নিজের ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধকেও ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, মিডল ইস্ট স্টাডিজ সেন্টার ও ভিজিটিং লেকচারার, এইচএসই ইউনিভার্সিটি (মস্কো)
