বন্ধ হচ্ছে যুদ্ধ, প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, শুক্রবার সই হবে; খুলবে হরমুজ
মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি শান্তি রূপরেখায় তারা একমত হয়েছেন। এ রূপরেখার আওতায় ইরানের ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ উঠবে ও ফের খুলে যাবে হরমুজ প্রণালি। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ওই নৌপথ দিয়ে তেল সরবরাহ শুরু হওয়ার সম্ভাবনায় এ প্রাথমিক চুক্তির ঘোষণা আসার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভাগ্য নির্ধারণে আরও আলোচনা হবে।
রোববার ওয়াশিংটন স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যল্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন: 'ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন।' মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ঘোষণা করার পরপরই ট্রাম্পের এই পোস্ট করেন।
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারকে সই করবে দুই দেশ।
চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে শাহবাজ শরিফ জানান, চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো, 'লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযানের অবসান ঘটানো।'
পুরো আলোচনায় অন্যতম জটিল ইস্যু হয়ে ছিল লেবানন। গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প ও অন্যান্য দেশের যুদ্ধবিরতির আহ্বানকে তোয়াক্কা না করে লেবাননে লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল ইসরায়েল।
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা যুক্রাস্ত্র-ইরান আলোচনার অংশ নয়। শান্তি চুক্তির ঘোষণা আসার পর তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
হরমুজ খুলবে
ট্রাম্প বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি—যা ইরান গত কয়েক মাস ধরে কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে—শুক্রবার পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশও তিনি দিয়েছেন।
ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লেখেন, 'বিশ্বের জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করো। তেল বইতে দাও!'
চুক্তির খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দর কমতে শুরু করে। সোমবার লেনদেনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ৪ শতাংশ কমে যায়, আর ইউ.এস. ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দর পড়ে যায় ৪.৬ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া এশিয়ার শেয়ারবাজারেও উত্থান লক্ষ করা গেছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতাসহ আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত চুক্তির আলোচনা হবে।
এর আগে একাধিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছিল, পরের দফার ওই আলোচনাতেই নির্ধারিত হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলা চালানোর পর কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইরানি ও লেবানিজ। জবাবে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালায় ইরান। সেইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে জ্বালানির দাম। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে মার্কিন বাহিনী।
ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকান শিবিরের জন্য ইরান যুদ্ধ এখন রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠেছে। নভেম্বরেই মধ্যবর্তী নির্বাচন। জরিপে উঠে এসেছে, জ্বালানির চড়া দামে মার্কিনীরা ব্যাপক ক্ষুব্ধ। তবে ট্রাম্পের ওপর নিজের দলের ভেতর থেকেও চাপ রয়েছে। তাদের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
ইসরায়েলি হামলা
সমস্ত বাধা পেরিয়ে শেষমেশ চুক্তিটি সম্পন্ন হলো ঠিকই, তবে এর মাঝেই রবিবার লেবাননে আকস্মিক হামলা চালিয়ে বসেছিল ইসরায়েল। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ইরান ও ট্রাম্প উভয় পক্ষই তীব্র নিন্দা জানায়।
বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরায়েলের এই সাম্প্রতিক হামলা নিয়ে এক্সে ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ করা সমালোচনা করেন। ইসরায়েলের দাবি, এই হামলায় ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহলে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তবে গালিবাফ বলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন তাদের দেওয়া 'প্রতিশ্রুতি পূরণের ইচ্ছা ও ক্ষমতা—দুটিই হারিয়েছে।'
লেবাননে এ হামলার জন্য নেতানিয়াহুর ওপর চটে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী 'কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই'। বৈরুতে ইসরায়েলের হামলার পর চুক্তিটি প্রায় ভেস্তেই যেতে বসেছিল।
ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেছিলেন, 'হামলাটা সব ওলটপালট করে দিয়েছে। [চুক্তি] সই হতে কয়েক ঘণ্টা দেরি হয়ে গেল। এটা এখনই হওয়ার কথা ছিল। এখন কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।'
নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে ট্রাম্প বলেন, 'বিবির এই ফালতু হামলাটা চালানোর কী দরকার ছিল? আমি প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলাম। ওকে সেটা জানিয়েও দিয়েছি। লোকটার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই (হি হ্যাজ নো ফাকিং জাজমেন্ট)। সেটা ওকে সরাসরিই বলেছি।'
লেবাননে সামরিক অভিযানে লাগাম টানার মার্কিন দাবির মুখে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের শীর্ষ এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম এন১২ জানিয়েছে, রোববার এক ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে শান্তি চুক্তির অগ্রগতির খুঁটিনাটি জানিয়েছেন ট্রাম্প।
চুক্তির শর্তাবলি
চুক্তির খসড়া শর্ত নিয়ে রয়টার্সকে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ইরানের আটকে থাকা ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করতে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন। বিনিময়ে ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে—অর্থাৎ নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পরমাণু কেন্দ্র সম্প্রসারণ করা হবে না।
চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগে এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, এ চুক্তির চূড়ান্ত পরিণতি হবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সম্পূর্ণ বন্ধ করা। তাদের কাছে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ইরান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।
তবে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী তারা দেশের ভেতরেই এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম লঘু করার সুযোগ পাবেন।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই চুক্তিকে চূড়ান্ত রূপ দিতে রোববার সকালে তেহরানে গিয়েছিলেন কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা।
