ক্যামেরার মতো ‘অটোফোকাস’, চোখের ইশারায় বদলাবে লেন্স; বাজারে আসছে নতুন প্রযুক্তির ‘স্মার্ট চশমা’
দেখতে একেবারে সাধারণ চশমার মতো, কিন্তু কাজ করে ক্যামেরার অটোফোকাসের মতো। চোখের ইশারা বুঝেই লেন্সের পাওয়ার বা ফোকাস ঠিক করে নেয়। ফিনল্যান্ডের চশমা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আইএক্সআই এমনই এক 'স্মার্ট চশমা' বাজারে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, ব্যবহারকারী কখন কোন দিকে তাকাচ্ছেন এবং কী দেখার চেষ্টা করছেন, চশমাটি তা নিজেই বুঝে নেবে এবং সেই অনুযায়ী তাৎক্ষণিক লেন্স অ্যাডজাস্ট বা সমন্বয় করবে।
এই স্মার্ট চশমায় ব্যবহার করা হয়েছে 'আই-ট্র্যাকিং সেন্সর' (চোখের নড়াচড়া শনাক্ত করার প্রযুক্তি) এবং বিশেষ ধরণের লিকুইড ক্রিস্টাল লেন্স। সেন্সর যখনই চোখের অবস্থান শনাক্ত করে, তখনই লিকুইড ক্রিস্টালের মাধ্যমে লেন্সের পাওয়ার চোখের পলকে বদলে যায়।
মূলত যারা দূরের এবং কাছের—উভয় জিনিস দেখতে সমস্যায় ভোগেন, তাদের কথা মাথায় রেখেই এটি তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত বাইফোকাল বা ভেরিফোকাল লেন্সের চেয়ে এটি অনেক বেশি সুবিধাজনক হবে বলে দাবি কোম্পানিটির।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বাইফোকাল লেন্স আবিষ্কার করেন বলে ধারণা করা হয়। এই লেন্সে দুটি ভাগ থাকে—ওপরের অংশ দিয়ে দূরের এবং নিচের অংশ দিয়ে কাছের জিনিস দেখা হয়।
এরপর ১৯৬০-এর দশকে আসে ভেরিফোকাল লেন্স। এটি বাইফোকালের আধুনিক সংস্করণ। এতে লেন্সের মাঝখানে কোনো স্পষ্ট বিভাজন রেখা থাকে না, বরং পাওয়ার ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।
তবে বাইফোকাল বা ভেরিফোকাল—উভয় চশমাতেই স্বচ্ছভাবে দেখার জন্য ব্যবহারকারীকে লেন্সের একটি নির্দিষ্ট অংশ দিয়ে তাকাতে হয়। বিশেষ করে ভেরিফোকাল লেন্সে চোখের দুপাশে বা আড়চোখে দেখার ক্ষেত্রে কিছুটা বিকৃতি বা ঝাপসাভাব তৈরি হয়।
এ ছাড়া সাধারণ চশমার চেয়ে দামি হওয়া সত্ত্বেও এসব লেন্সে অভ্যস্ত হতে ব্যবহারকারীর বেশ সময় লাগে।
আইএক্সআই-এর দাবি, তাদের নতুন এই স্মার্ট চশমায় এসব ঝামেলা নেই। ব্যবহারকারী যেদিকে তাকাবেন, চশমা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোকাস ঠিক করে নেবে, ফলে দেখার অভিজ্ঞতা হবে আরও সাবলীল।
আইএক্সআই-এর প্রধান নির্বাহী নিকো ইডেন জানান, তাদের তৈরি চশমায় নির্দিষ্ট কোনো ফোকাস এরিয়া বা 'ফিক্সড ম্যাগনিফিকেশন' নেই। তিনি বলেন, 'বর্তমানে প্রচলিত ভেরিফোকাল লেন্সগুলোতে মূলত তিনটি ভিন্ন লেন্স (দূরের, মাঝের ও কাছের) একসঙ্গে মেশানো হয়।
এই ভিন্ন ভিন্ন লেন্সকে পুরোপুরি নিখুঁতভাবে মেলানো সম্ভব নয়। ফলে লেন্সের দুই পাশে বিকৃতি বা ঝাপসাভাব থাকে, যা কোনো কাজেই আসে না। আর ব্যবহারকারীকে সবসময় সচেতন থাকতে হয় যে তিনি লেন্সের কোন অংশ দিয়ে তাকাচ্ছেন।'
ইডেনের দাবি, আইএক্সআই-এর চশমায় পড়ার জন্য নির্দিষ্ট জায়গাটি (রিডিং এরিয়া) সাধারণ ভেরিফোকাল চশমার চেয়ে অনেক বড় হবে। চোখের পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এই রিডিং এরিয়াটি লেন্সের সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় বসানো হবে।
তবে এই চশমার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যখন পড়ার দরকার নেই, তখন ওই 'রিডিং এরিয়া' বা কাছের জিনিস দেখার অংশটি অদৃশ্য হয়ে যাবে। তখন পুরো লেন্সটিই দূরের জিনিস দেখার চশমা হিসেবে কাজ করবে।
ইডেন বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, 'দূরের জিনিস দেখার অভিজ্ঞতায় এটি এক আমূল পরিবর্তন আনবে। ভেরিফোকাল লেন্সে দূরের কিছু দেখতে হলে আপনাকে লেন্সের ওপরের অংশ দিয়ে তাকাতে হয়। কিন্তু আমাদের চশমায় আপনি পুরো লেন্স দিয়েই দূরের সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাবেন—ঠিক যেমনটা তরুণ বয়সে দেখতেন।'
চশমাটি কীভাবে বুঝবে আপনি কী দেখছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সেন্সরের কারসাজিতে। চশমার ফ্রেমে বসানো ফটোডায়োড (যা আলোকে বৈদ্যুতিক সিগন্যালে রূপান্তর করে) এবং এলইডি লাইট একসঙ্গে কাজ করে। এগুলো অদৃশ্য ইনফ্রারেড রশ্মি চোখে ফেলে এবং তার প্রতিফলন বিশ্লেষণ করে মুহূর্তেই বুঝে নেয় ব্যবহারকারী ঠিক কোন বস্তুর দিকে তাকিয়ে আছেন।
আইএক্সআই জানিয়েছে, দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী করেই চশমাটি তৈরি করা হয়েছে। তাপমাত্রা পরিবর্তন, আর্দ্রতা বা হাঁটাচলার সময়ও এটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে। তবে ঠিক কোন কোন পরিস্থিতিতে চশমাটি সেরা পারফরম্যান্স দেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি।
আইএক্সআই কোম্পানিতে বর্তমানে ৭৫ জন কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যেই তারা ৪ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে ইডেন জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই এই চশমা বাজারে আসবে।
তবে দাম খুব একটা সস্তা হবে না। সাধারণ চশমার চেয়ে এর দাম বেশি হবে এবং এটি মূলত প্রিমিয়াম বা উচ্চবিত্তের পণ্য হিসেবেই বাজারে ছাড়া হবে।
ইডেন স্বীকার করেছেন, নতুন এই প্রযুক্তির কিছু অসুবিধাও আছে। তিনি বলেন, 'এটি এমন আরেকটি পণ্য, যা আপনাকে নিয়মিত চার্জ দিতে হবে।'
চশমার ডাঁটিতে খুব কৌশলে লুকানো একটি ম্যাগনেটিক পোর্ট থাকবে, যার মাধ্যমে রাতে ঘুমানোর সময় এটি চার্জ দেওয়া যাবে। তবে ব্যাটারি বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও চশমাটি দেখতে মোটেও ভারী বা অদ্ভুত নয়। সাধারণ চশমার মতোই এর ওজন মাত্র ২২ গ্রাম।
দেখার ক্ষেত্রেও সামান্য সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। ইডেন জানান, লেন্সের ঠিক মাঝখানের অংশটি খুবই স্বচ্ছ, যা পড়ার জন্য যথেষ্ট। তবে লেন্সের কিনারের দিকে যেখানে লিকুইড ক্রিস্টাল শেষ হয়েছে, সেখানে দৃশ্য কিছুটা অস্পষ্ট বা বিকৃত মনে হতে পারে। অবশ্য তিনি দাবি করেছেন, বেশির ভাগ সময় ব্যবহারকারীরা এই সমস্যা টেরই পাবেন না।
গাড়ি চালানোর সময় এই চশমা কতটা নিরাপদ, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ইডেন। তবে নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা ভয়ের কারণ নেই। কোনো কারণে যদি চশমার ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা বা লিকুইড ক্রিস্টাল কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটি 'ফেইলসেফ মোড'-এ চলে যাবে। তখন এটি সাধারণ পাওয়ারের চশমার মতোই কাজ করবে এবং দূরের জিনিস দেখতে কোনো সমস্যা হবে না।
শুধু আইএক্সআই নয়, জাপানি কোম্পানি 'এলসিও'-ও লিকুইড ক্রিস্টাল ব্যবহার করে অটোফোকাস চশমা তৈরির কাজ করছে। এদিকে আরেক জাপানি প্রতিষ্ঠান 'ভিক্সিয়ন' এর মধ্যেই অটোফোকাস চশমা বাজারে এনেছে। তবে তাদের চশমা দেখতে সাধারণ চশমার মতো নয় এবং অটোফোকাস সুবিধা পেতে ব্যবহারকারীকে দুটি ছোট ছিদ্রের মধ্য দিয়ে তাকাতে হয়।
সে তুলনায় আইএক্সআই-এর চশমা দেখতে সাধারণ চশমার মতোই হবে বলে দাবি করা হচ্ছে, যদিও শুরুতে খুব বেশি ডিজাইনের ফ্রেম পাওয়া যাবে না। মাত্র দুই-তিনটি ডিজাইনের ফ্রেম বাজারে আসবে, তবে মুখের আকার অনুযায়ী বিভিন্ন মাপের ফ্রেম বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
