ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের শাসক পরিবর্তনের উদ্যোগ: ইরাকের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি?
নতুন বছরের শুরুতেই ফিরে এল আবারও সেই চেনা দৃশ্যপট। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সেনা পাঠিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া। এবং তাঁকে সস্ত্রীক অপহরণও করা হলো। এই আগ্রাসনকে 'ন্যায্যতা' দিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরিচিত ভাষ্যও ফিরে এসেছে—গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নিপীড়িত জনগণকে মুক্ত করা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা এক স্বৈরশাসককে উৎখাত করা। এই সুর আমরা আগেও শুনেছি—ইরাকে, লিবিয়ায় এবং আরও বহু হস্তক্ষেপে, যেখানে দ্রুত বিজয় ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফল হয়েছে বিশৃঙ্খলা, দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব এবং কৌশলগত বিপর্যয়।
ভেনেজুয়েলা অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতির প্রায় সব ভুলের সামষ্টিক প্রতীক যেন। এটি নব্য-রক্ষণশীল মতাদর্শের বিপজ্জনক ধারাবাহিকতাকে প্রতিফলিত করে—যে মতাদর্শ দুই দশকের বিপর্যয়কর ব্যর্থতা থেকেও শিক্ষা নিতেও রাজি নয়। ইরাক ও আফগানিস্তানে বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনের দ্বিদলীয় পররাষ্ট্রনীতির ঐকমত্যের কাঠামো—যাকে 'দ্য ব্লব' বলা হয়—জটিল রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হিসেবে সামরিক হস্তক্ষেপের নেশা ছাড়তে পারেনি।
সহজ যুদ্ধের বিভ্রম
এই হস্তক্ষেপের সমর্থকেরা ইরাক যুদ্ধের আগে ব্যবহৃত একই কৌশল আবার সামনে এনেছেন। মাদুরো একজন স্বৈরশাসক—এটি সত্য। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক ধস, মানবিক সংকট এবং লাখ লাখ ভেনেজুয়েলাবাসীর দেশত্যাগ ঘটেছে—এটিও সত্য। তাই বলা হচ্ছে, ভেনেজুয়েলার জনগণ মার্কিন সেনাদের মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানাবে। বামপন্থী শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের অভিযান হবে দ্রুত ও নিখুঁত। যার ফলে অচিরেই একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু এটি কৌশলের মোড়কে মোড়ানো এক কল্পকাহিনি। ভেনেজুয়েলা কোনো ছোট ক্যারিবীয় দ্বীপ নয়, যেখানে কয়েক শ' নৌসেনা নামিয়ে বিকেলের মধ্যেই রাজধানী দখল করা যায়। এটি প্রায় ৩ কোটি মানুষের দেশ—দুর্গম ভূপ্রকৃতি, রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ইতিহাস এবং হুগো শ্যাভেজের যুগে গড়ে ওঠা গভীর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক নেটওয়ার্ক নিয়ে। মাদুরোকে সরালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটবে—এই ধারণা সংঘাত-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের জানা সব কিছুকেই অস্বীকার করে।
মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দি হলেও তাঁর পর ভেনেজুয়েলা কে শাসন করবে? দেশটিতে বিরোধী শিবির বিভক্ত, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সীমিত এবং দেশের বড় অংশের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্ব দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে, ভেনেজুয়েলার লাখো মানুষ—বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে, যারা শ্যাভেজ যুগের সামাজিক কর্মসূচির সুবিধাভোগী—ব্যক্তিগতভাবে মাদুরোর প্রতি হতাশ হলেও বলিভারীয় আদর্শের প্রতি এখনো কিছুটা আনুগত্য রাখে। ফলে এটি এমন কোনো দেশ নয়, যা মার্কিনীদের হাতে 'মুক্তি'র অপেক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে আছে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই হস্তক্ষেপ একটি বিশাল কৌশলগত ভুল, যা পুরো লাতিন আমেরিকাজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে। যুক্তরাষ্ট্র এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিকে প্রভাবিত করা প্রতিটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বয়ানকে কার্যত নিজ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই বৈধতা দিয়েছে। ওয়াশিংটন নিজ হাতে পুরো অঞ্চলের বামপন্থী আন্দোলনগুলোর জন্য এক বিশাল প্রচারজয় তুলে দিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের থাবাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে রেখে গড়ে উঠবে রাজনৈতিক প্রতিরোধের নতুন জোয়ার।
এই অঞ্চলের অর্থাৎ লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এ ঘটনার প্রতিক্রিয়াই ধরুন। মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়ার সরকারগুলো—ব্যক্তি মাদুরো সম্পর্কে যাই ভাবুক না কেন—মার্কিন সামরিক অভিযানের নিন্দা জানাতে নিজ দেশেই প্রবল অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়বে। কারাকাসে মার্কিন সেনাদের ছবি গোটা অঞ্চলের গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে, সঙ্গে যোগ হবে গুয়াতেমালা, চিলি ও পানামা থেকে শুরু করে অতীতের মার্কিন হস্তক্ষেপের স্মৃতি। ফলে শাসকগোষ্ঠী উৎখাতের আরেক অভিযানে লাতিন আমেরিকার সরকারগুলো অর্থবহ সমর্থন দেবে—এমন ধারণা নিছক কল্পনা।
কিউবা, নিকারাগুয়া এবং মাদুরো শাসনের অবশিষ্ট সমর্থন নেটওয়ার্ক এই হস্তক্ষেপকে নিজেদের কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান বৈধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক পরীক্ষা নিজ ওজনেই ভেঙে পড়ছিল; এই অভিযান সেই প্রক্রিয়াকে উল্টো করে দিয়ে শাসনব্যবস্থাটিকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এক শহীদে পরিণত করল।
চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা
এই হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতও শক্তিশালী করবে। চীন ও রাশিয়া উভয়ই ভেনেজুয়েলায় আর্থিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বড় বিনিয়োগ করেছে। বেইজিংয়ের কাছে ভেনেজুয়েলার বিপুল ঋণ রয়েছে এবং দেশটিতে তাদের জ্বালানি স্বার্থ জড়িত। অন্যদিকে মস্কোও পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ভেনেজুয়েলাকে একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে তাদের মডেলের দেউলিয়াত্বের প্রমাণ হিসেবে দাঁড়াতে দেওয়ার বদলে, পশ্চিমারা এখন বেইজিং ও মস্কোকে আরও গভীরভাবে জড়িত হওয়ার অজুহাত দিল। তারা এটিকে মার্কিন আগ্রাসন হিসেবে তুলে ধরে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার যৌক্তিকতা দেখাতে পারবে। যেকোনো প্রতিরোধ আন্দোলনে রাশিয়া-চীনের বাস্তবিক সহায়তা বাড়বে, ফলে ভেনেজুয়েলা পরিণত হবে এক প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে। মার্কিনীরা সম্ভবত নিজেদেরই জন্যই তৈরি করছে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের মতো এক চোরাবালির ফাঁদ—পার্থক্য শুধু, এবার মার্কিনীরা নিজেরাই সেই সোভিয়েত, আর ঘটনাস্থল তাদের নিজস্ব গোলার্ধ।
যে মূল্য চুকাতে হবে, তা নিয়ে কেউ কথাই বলতে চায় না
এখন আসা যাক, এহেন হস্তক্ষেপের প্রকৃত মূল্য যা দিতে হবে—সে কথায়। মাদুরোর অবর্তমানে শাসকগোষ্ঠী উৎখাতে প্রাথমিক সামরিক অভিযান তুলনামূলক দ্রুত সফল হতে পারে—ভেনেজুয়েলার প্রচলিত বাহিনী মার্কিন সামরিক শক্তির সঙ্গে পাল্লাও দিতে পারবে না। কিন্তু তারপর কী?
ভেনেজুয়েলা দখলে রাখা, অবকাঠামো নিরাপদ করা, দেশটিকে মিলিশিয়া যুদ্ধের দিকে গড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক শাসনের ছায়ামাত্র গড়ে তুলতে লাগবে বছরের পর বছর এবং শত শত বিলিয়ন ডলার। মার্কিন সেনাদের ভেনেজুয়েলার শহরে-বন্দরে টহল দিতে হবে, তেল স্থাপনা রক্ষা করতে হবে, সরবরাহ লাইন নিরাপদ রাখতে হবে এবং বিদ্রোহী হামলার মোকাবিলা করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে দুই দশকের যুদ্ধের পর মার্কিন জনগণের আরেকটি অনির্দিষ্টকালের সামরিক অভিযানে আগ্রহ নেই। কংগ্রেস খরচ নিয়ে আপত্তি তুলবে। আর যখন জনসমর্থন অনিবার্যভাবে ক্ষয় হবে এবং ওয়াশিংটন চলে যাওয়ার পথ খুঁজবে, তখন পেছনে পড়ে থাকবে এক অস্থিতিশীল দেশ, পুরো অঞ্চলে শক্তিশালী হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলন এবং মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আরেকটি কালো দাগ।
যা করা উচিত ছিল
একটি বিকল্প পথ ছিল—কৌশলগত ধৈর্য ও বহুপাক্ষিক চাপের সমন্বয়। মাদুরোর শাসন এই চাপের মধ্যে নিজস্ব দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অপব্যবস্থাপনার ভারে ভেঙে পড়ছিল। লাখো মানুষ দেশ ছাড়ছিল। সেনাবাহিনীর আনুগত্য ক্রমেই আদর্শিকের চেয়ে লেনদেননির্ভর হয়ে উঠছিল। আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়াড় প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছিল।
তাই সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে কাজ করা, শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের মানবিক সহায়তার সুযোগ খোলা রাখা, দেশটির প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে সমর্থন করা এবং অভ্যন্তরীণ গতিশীলতাকে নিজের পথে এগোতে দেওয়া। এর জন্য ধৈর্য প্রয়োজন—যে গুণটি ওয়াশিংটন যেন হারিয়ে ফেলেছে—কিন্তু এতেই সামরিক দখলদারিত্বের ফাঁদ এড়ানো যেত।
দুঃখজনক সত্য হলো, এই হস্তক্ষেপ সম্ভবত ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর ঠিক উল্টো ফল দেবে। গণতান্ত্রিক ভেনেজুয়েলার বদলে আমরা দেখতে পারি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং ব্যয়বহুল এক সামরিক সম্পৃক্ততা, যা বিপুল সম্পদ ক্ষয় করবে—কিন্তু তেমন কিছু অর্জন করবে না।
নাটকীয় উত্তেজনায় টানটান এই চলচ্চিত্র আমরা আগেও দেখেছি। শেষটা কখনো বদলায় না, কিন্তু ওয়াশিংটন বারবার একই থিয়েটারের টিকিট কাটে। ভেনেজুয়েলা অভিযান স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার রাজনৈতিক সমস্যার সামরিক সমাধানে আসক্তির আরেকটি অধ্যায়—একটি আসক্তি, যা প্রতিরক্ষা শিল্প ও পররাষ্ট্রনীতির এলিটদের স্বার্থ রক্ষা করে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে মার্কিন জাতীয় স্বার্থ তাতে ব্যর্থ হয়। প্রশ্ন হলো, মার্কিনীরা কি অবশেষে শিক্ষা নেবে, নাকি অনন্তকাল ধরে এই ব্যর্থতাগুলোই পুনরাবৃত্তি করে যাবে? বর্তমান গতিপথ দেখলে উত্তরটি দুঃখজনকভাবে স্পষ্ট।
লেখক: লিওন হাদার একজন পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ও স্যান্ডস্টর্ম: পলিসি ফেইলিওর ইন দ্য মিডল ইস্ট গ্রন্থের লেখক। এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত তার মূল নিবন্ধ থেকে পরিমার্জিত ও সংক্ষেপিত আকারে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের পাঠকের জন্য এটি অনূদিত হলো।
নিবন্ধের মতামত ও বিশ্লেষণ লেখকের নিজস্ব...
