কোনো দেশই ‘বিশ্ব বিচারক’ হতে পারে না: মাদুরোকে আটকের পর চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেছে চীন। বেইজিংয়ের শীর্ষ কূটনীতিক যুক্তরাষ্ট্রকে 'বিশ্বের বিচারক'-এর মতো আচরণের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। এই পদক্ষেপের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে জাতিসংঘে ওয়াশিংটনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত চীন।
বেইজিং সাধারণত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া যেকোনো সামরিক কর্মকাণ্ডের নিয়মিত সমালোচনা করে দেশটি।
চীনের অন্যতম 'সব সময়ের কৌশলগত অংশীদার' বা বিপদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত দেশের নেতাকে গভীর রাতে রাজধানী থেকে তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। এই ঘটনা বেইজিংয়ের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। চীন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, ওয়াশিংটনের মতো সামরিক পথে না হেঁটেও বৈশ্বিক সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
বেইজিংয়ে রবিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, 'আমরা কখনোই বিশ্বাস করি না যে কোনো দেশ বিশ্বের পুলিশ হিসেবে কাজ করতে পারে। আমরা এটাও মেনে নিই না যে কোনো জাতি নিজেকে বিশ্বের বিচারক হিসেবে দাবি করবে।' তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করে ভেনেজুয়েলার 'হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনার' দিকে ইঙ্গিত করেন।
চীনের শীর্ষ এই কূটনীতিক আরও বলেন, 'আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা পুরোপুরি রক্ষা করা উচিত।' শনিবার ৬৩ বছর বয়সী মাদুরোর চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা ছবি বিশ্বকে হতবাক করে দেওয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম মন্তব্য।
মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে সোমবার নিউইয়র্কের আদালতে মাদুরোকে হাজির করার কথা রয়েছে। এর ঠিক কয়েক ব্লক দূরেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসবে। কলম্বিয়ার অনুরোধে এবং চীন ও রাশিয়ার সমর্থনে এই বৈঠক হচ্ছে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাদুরোকে আটকের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছেন, এই ঘটনা 'বিপজ্জনক নজির' স্থাপন করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীন ওয়াশিংটনের এই কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
চায়না-গ্লোবাল সাউথ প্রজেক্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এরিক ওল্যান্ডার বলেন, 'এই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলাকে দেওয়ার মতো খুব বেশি বস্তুগত সহায়তা চীনের হাতে নেই। তবে কূটনৈতিকভাবে বা কথার লড়াইয়ে বেইজিং খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জাতিসংঘে এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে তারা নেতৃত্ব দেবে।'
তিনি আরও বলেন, 'জিম্বাবুয়ে এবং ইরানের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, পশ্চিমারা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও চীন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে।'
চীনের জন্য বড় ধাক্কা
ট্রাম্প কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও সামরিক অভিযানের হুমকি দিয়েছেন। পাশাপাশি মন্তব্য করেছেন যে কিউবার কমিউনিস্ট শাসন 'পতনের দ্বারপ্রান্তে'। এমন পরিস্থিতিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের 'গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ'-এ সই করা লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এখন ভাবছে, বিপদ এলে এই চুক্তি তাদের কতটা রক্ষা করতে পারবে।
শি জিনপিং সোমবার সব দেশকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজুয়েলার নাম উল্লেখ না করেই তিনি বলেন, পরাশক্তিগুলোর উচিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
গত ২০ বছরে বেইজিং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে তাইওয়ানের বদলে চীনের দিকে ফেরাতে বেশ সফল হয়েছে। কোস্টারিকা, পানামা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, নিকারাগুয়া এবং হন্ডুরাস—সবাই ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ চীনের কৌশলগত অংশীদারত্বের কথায় সাড়া দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলা ১৯৭৪ সালেই চীনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে ১৯৯৮ সালে সমাজতান্ত্রিক সাবেক সেনা কর্মকর্তা হুগো চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। তিনি লাতিন আমেরিকায় বেইজিংয়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হন। ওয়াশিংটন থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শাসন মডেলের প্রশংসা করতেন, যদিও নিজের দেশে গণতন্ত্রের মান নিম্নমুখী ছিল।
২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো নেতা হলে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। এমনকি ২০১৬ সালে মাদুরো তার ছেলেকে চীনের শীর্ষস্থানীয় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিও করিয়েছিলেন।
বিনিময়ে চীন ভেনেজুয়েলার তেল শোধনাগার ও অবকাঠামোতে দেদার অর্থ ঢেলেছে। ২০১৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যখন নিষেধাজ্ঞা কঠোর করছিল, তখন চীনই ছিল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির 'লাইফলাইন'। চীনা কাস্টমসের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে চীন ভেনেজুয়েলা থেকে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনেছে। এর অর্ধেকই ছিল তেল।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় বিষয়ক চীনের বিশেষ প্রতিনিধি কিউ জিয়াওকি মাদুরোর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকের বিষয়ে অবগত চীনা সরকারের এক কর্মকর্তা বলেন, 'এটি চীনের জন্য বড় এক ধাক্কা। আমরা ভেনেজুয়েলার কাছে একজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে পরিচিত হতে চেয়েছিলাম।'
