‘এক সন্তান’ নীতি তুলে নেওয়ার ১০ বছর; সরকারি প্রণোদনা পেয়েও একাধিক সন্তান নিচ্ছেন না চীনারা
অবসর সময়ে বসে কাগজের টুকরোয় খরচের নানা হিসাব-নিকাশ করছেন বেইজিংয়ের ৩০ বছর বয়সী তরুণ ওয়েলকিন লেই। এখন তার চিন্তার মূলে দ্বিতীয় সন্তান নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়টি।
দ্বিতীয় সন্তান নেবেন কি না, তা নিয়ে স্ত্রীসহ বড় দোটানায় আছেন ওয়েলকিন। মূল প্রশ্নটি সামর্থ্যের। বর্তমানে তাদের তিন বছর বয়সী ছেলের দেখাশোনার জন্য বাইরে থেকে লোক রাখতে হয়। ওয়েলকিন ও তার স্ত্রী—দুজনেই নিজ নিজ মা-বাবার একমাত্র সন্তান। ফলে ভবিষ্যতে নিজেদের সন্তানের লালন-পালন আর বয়স্ক চার মা-বাবার দেখভাল—সব মিলিয়ে সময় আর খরচের ভারসাম্য রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই টানাপোড়েন শুধু ওয়েলকিন দম্পতির নয়, বরং এটি বর্তমানে চীনের অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ সংকট। কয়েক দশক ধরে কড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে দেশটির জনতাত্ত্বিক কাঠামোতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এখন সেই ভারসাম্য ফেরাতে তরুণদের বেশি করে সন্তান নিতে উৎসাহিত করা চীন সরকারের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেই মনে করেন, পরিবারগুলোর জন্য সরকারের আরও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, 'আমরা যদি এখন মানুষকে আরও সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে চাই, তবে আগে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে পরিমাণ কড়াকড়ি করা হয়েছিল, এখন জনসংখ্যা বাড়াতেও ঠিক তেমন বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব ও আন্তরিকতা নিয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।'
গত ১ জানুয়ারি চীনের সেই বিতর্কিত 'এক সন্তান' নীতি বাতিলের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। জন্মহার কমে যাওয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থমকে যাওয়ার আশঙ্কায় চীন সরকার ওই নীতি থেকে সরে এসেছিল।
তবে ঐতিহাসিক সেই পরিবর্তনের পরও খুব একটা কাজ হয়নি। সন্তান নিতে দম্পতিদের উৎসাহিত করতে একের পর এক নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে তার প্রভাব খুব একটা পড়ছে না।
২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর চীনের মোট জনসংখ্যা কমেছে। গত বছর জন্মহার সামান্য বাড়লেও তা মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে বেশি ছিল না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জন্মহার বাড়ার এই প্রবণতা স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
বর্তমানে চীনের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সাল নাগাদ দেশটির অর্ধেক জনসংখ্যাই প্রবীণ হয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি কেবল চীনের অর্থনীতির জন্যই হুমকিস্বরূপ নয়, বরং সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমান হওয়ার যে লক্ষ্য বেইজিংয়ের রয়েছে, তার পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং 'জনসংখ্যাতাত্ত্বিক নিরাপত্তা'র ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। 'উন্নত মানের জনসংখ্যা গঠন'কে তিনি এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিয়ে ও জন্মহার বাড়াতে আগামী দিনগুলোতে চীন সরকার আরও নতুন নীতি ও বড় ধরনের প্রণোদনা ঘোষণা করতে পারে।
তবে চীনের সাধারণ মানুষের মতে, জন্মহার বাড়াতে চাইলে শুধু নীতি পরিবর্তন করলেই হবে না; সমাধান করতে হবে কিছু মৌলিক সমস্যার। এর মধ্যে রয়েছে তরুণদের বেকারত্ব, সন্তান লালন-পালনের আকাশচুম্বী খরচ এবং সন্তান পালনের ক্ষেত্রে নারীদের ওপর বাড়তি চাপের মতো বিষয়গুলো।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েক দশকের 'এক সন্তান' নীতির নেতিবাচক প্রভাব। এই নীতির কারণে চীনে নারী-পুরুষের সংখ্যার অনুপাতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। গড়ে উঠেছে এমন এক প্রজন্ম, যাদের কোনো ভাই-বোন নেই। এখন চীনের দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে বৃদ্ধ মা-বাবার সেবার পুরো দায়িত্ব এই 'একাকী' সন্তানদের কাঁধেই বর্তাচ্ছে।
একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থিতিশীল চাকরি করার পরও ওয়েলকিন লেই কেন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত, তার কারণও এটিই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'আমি ভবিষ্যতের জন্য যতই সঞ্চয় করি না কেন, শেষ বয়সে আমার মা-বাবার দেখাশোনার জন্য অন্য কারও সন্তানের শ্রম আমাকে টাকা দিয়ে কিনতে হবে। সমাজ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে আমি সেই খরচ সামলাতে পারব কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।'
পুরোনো নীতির তিক্ত স্মৃতি
কয়েক দশক ধরে চীন সরকার অত্যন্ত কঠোর ও নির্মমভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে। সাধারণ মানুষের ওপর কড়া নজরদারি, প্রচার-প্রচারণা ও ভারী জরিমানার পাশাপাশি জোরপূর্বক গর্ভপাত কিংবা বন্ধ্যাকরণের মতো ঘটনাও ঘটেছে তখন।
মূলত ১৯৮০ সালে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এই 'এক সন্তান' নীতি চালু করা হয়েছিল।
এখন বেইজিংয়ের ভয় অন্য জায়গায়। তাদের আশঙ্কা, দেশটি 'ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো' হয়ে যাবে। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোও একই ধরনের সংকটে ভুগছে, তবে চীনের তুলনায় তাদের অর্থনীতি অনেক বেশি উন্নত ও শক্তিশালী। ফলে চীনের জন্য এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
পুরো বিষয়টি এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। চীন সরকার এখন বিয়ে এবং সন্তান জন্ম দেওয়াকে জাতির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে প্রচার করছে। এই নতুন নীতির কঠোর বার্তা দিতে গত ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে কনডমসহ সব ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ওপর ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আরোপ করা হয়েছে।
জন্মহার বাড়াতে চীনের স্থানীয় প্রশাসনগুলো ইদানীং নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কর ছাড়, বাড়ি কেনা বা ভাড়ায় আর্থিক সহায়তা, নগদ অর্থ প্রদান এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ।
তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও সামনে এসেছে। অনেক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় সরকারি কর্মীরা তাঁদের ফোন করে জানতে চাইছেন তারা কবে সন্তান নেবেন। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে সরকার কি তবে আবারও আগের মতো জবরদস্তিমূলক কোনো নীতি চাপিয়ে দিতে যাচ্ছে?
জনসংখ্যা বাড়াতে এখন সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছে চীনের কেন্দ্রীয় সরকারও। গত এক বছরে তিন বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে এমন পরিবারগুলোর জন্য বছরে ৩ হাজার ৬০০ ইউয়ান (প্রায় ৫০০ ডলার) নগদ বোনাস ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সরকারি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ তৈরির মতো বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
'বাচ্চা নেওয়ার সাহস কোথায়?'
চীন সরকার ঘোষণা করেছে, ২০২৬ সালের মধ্যে হাসপাতালে সন্তান জন্মদানের যাবতীয় খরচ তারা বহন করবে। এ ছাড়া শিশু যত্ন বা চাইল্ডকেয়ার সেবাগুলোকে আরও সুসংগঠিত করতে গত মাসে একটি খসড়া আইনও প্রকাশ করা হয়েছে।
কিন্তু অনেক অভিভাবকই মনে করেন, সন্তান পালনের যে প্রকৃত খরচ, সেই তুলনায় সরকারের এই সুবিধাগুলো 'সমুদ্রে বারিবিন্দুর' মতোই। ২০২৪ সালে বেইজিংয়ের 'ইউওয়া পপুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউট'-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান লালন-পালনের খরচের দিক থেকে চীন বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল দেশ।
সাংহাইয়ের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী মি ইয়া (ছদ্মনাম) তার ৯ বছরের ছেলেকে বড় করছেন। তিনি বলেন, 'বড় শহরগুলোতে বাচ্চা লালন-পালনের খরচ এত বেশি যে সরকারের এই সামান্য ভর্তুকি কোনো কাজেই আসে না। এসব সুবিধা দেখে অন্তত কারও মনে বাচ্চা নেওয়ার ইচ্ছা জাগবে না।'
মি ইয়া আরও মনে করেন, দীর্ঘদিনের 'এক সন্তান' নীতি একটি পুরো প্রজন্মের মানসিকতা বদলে দিয়েছে। তিনি বলেন, 'মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে যে একটি সন্তান নিয়েও সুখে থাকা সম্ভব এবং এটিই এখন একটি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও পারিবারিক কাঠামো হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
চীনের অনেক তরুণের কাছে সরকার ঘোষিত এসব সুবিধার কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষ করে করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে তাঁরা যখন নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতেই হিমশিম খাচ্ছেন, তখন নতুন সন্তান নেওয়ার কথা ভাবা তাদের কাছে বিলাসিতা।
আগে রোজগার, পরে সন্তান
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একদিকে অর্থনীতির ধীরগতি, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে রেকর্ড সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক এখন মানসম্মত চাকরির সন্ধানে ঘুরছেন।
নিজের ভবিষ্যৎই যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে নতুন প্রজন্মের আগমন তাঁদের কাছে বড় এক ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেরই প্রশ্ন— 'নিজেরাই যেখানে চলতে পারছি না, সেখানে বাচ্চা নেওয়ার সাহস পাব কোথায়?'
পূর্ব চীনের আনহুই প্রদেশের রাজধানী হেফেইতে বসবাসরত ২৭ বছর বয়সী প্রকৌশলী জউও একই কথা বলছিলেন। তিনি বিয়ে করে সংসার পাততে চান। কিন্তু চাকরি করেও বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে মাস শেষে তাঁকে হাত পাততে হয় মা-বাবার কাছে।
জউ (ছদ্মনাম) তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, 'অর্থনীতির এখন খুব করুণ দশা। মানুষের তো আগে টাকা রোজগার করা দরকার। পকেটে টাকা না থাকলে সন্তান মানুষ করার সাহস কেউ পাবে কীভাবে? সরকারের উচিত আগে অর্থনীতির এই সংকট দূর করা।'
জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটিতে বিয়ের হার কমে যাওয়া। তবে চীনের অনেক তরুণী একে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তাঁরা এখন বিয়ের চেয়ে নিজের ক্যারিয়ারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। চীনের চরম প্রতিযোগিতামূলক সমাজব্যবস্থায় সংসার সামলানো, সন্তানদের পড়াশোনা দেখাশোনা করা আর সেই সঙ্গে অফিসের কাজ—সব একা সামলানোর যে চিরাচরিত চাপ নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা নিতে এখন আর অনেকেই রাজি নন।
'আমরাই শেষ প্রজন্ম'
ভবিষ্যৎ নিয়ে এই চরম অনীহা আর সন্তান নিতে অনাগ্রহ এখন চীনের অনেক তরুণের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৪ বছর বয়সী স্নাতকোত্তরের এক শিক্ষার্থী লিউ (ছদ্মনাম) সরাসরিই বললেন, 'আমি শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য নিজের জীবন কাটাতে চাই না—আমি নিজের মতো করে বাঁচতে চাই।'
বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা এই পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছে। সেই সময় সাংহাইয়ে পুলিশের সঙ্গে এক বাসিন্দার তর্কের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে ওই ব্যক্তি বলেছিলেন—'আমরাই শেষ প্রজন্ম।' এই কথাটি এখন চীনের তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ঘুরছে।
চীনের এই জনসংখ্যা সংকটের মূলে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। কয়েক দশকের 'এক সন্তান' নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তো আছেই, সেই সঙ্গে শিক্ষার প্রসার, বিয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ন এবং সন্তান পালনের আকাশচুম্বী খরচ—সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যা বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশেও দেখা যাচ্ছে।
জনসংখ্যার এই দ্রুত কমে যাওয়া বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলোর জন্যও বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে পণ্যের চাহিদা বাড়ানো, বিশাল ঋণের বোঝা কমানো এবং বিশ্বজুড়ে পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের দাপট বজায় রাখা—সবকিছুই এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মানুষের অভাব কি ঘোচাবে রোবট?
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়ানজং হুয়াং মনে করেন, চীনে কর্মক্ষম জনশক্তি ও ভোক্তা কমে যাওয়ার প্রভাব হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। সেই সঙ্গে বিশাল এক প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সেবার খরচ সামলানোও হবে বেইজিংয়ের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
হুয়াংয়ের মতে, জন্মহার বাড়ানোর জন্য এ পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপগুলো আদতে 'নামমাত্র' বা 'লোকদেখানো'। সন্তান লালন-পালনের উচ্চ ব্যয় এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে এসব উদ্যোগ কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখছে না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বেইজিং ইতিমধ্যে তাদের পেনশন ব্যবস্থায় সংস্কার এনেছে এবং অবসরের বয়স ধীরে ধীরে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের অধীনে চীন এখন বিকল্প এক সমাধানের পথে হাঁটছে—আর তা হলো কলকারখানায় মানুষের জায়গায় রোবট বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
এসব পদক্ষেপ হয়তো জনসংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থনৈতিক ধাক্কা কিছুটা সামাল দিতে সাহায্য করবে। তবে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কিংবা বছরে কোটি কোটি শিশু জন্মের সেই পুরোনো দিনগুলো ফিরিয়ে আনা কি আদৌ সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। তাদের মতে, সরকারি উদ্যোগে হয়তো পতনের গতি কিছুটা কমবে, কিন্তু পরিস্থিতি আগের জায়গায় ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম।
'বড্ড দেরি হয়ে গেছে'
চীনের এই জনসংখ্যা সংকট নিয়ে সাংহাই ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিশুইহু অ্যাডভান্সড ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের ডিন ইয়াও ইয়াং বলেন, 'আমরা যদি ২০ বছর আগে এই 'এক সন্তান' নীতি পরিবর্তন করতাম, তবে পরিস্থিতি হয়তো এত খারাপ হতো না। এখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে।'
তার মতে, ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তায় জন্মহারে হয়তো কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই পতন থামানো অসম্ভব। তিনি সরাসরিই বললেন, 'জন্মহার কমে যাওয়ার এই প্রবণতা এখন আর বদলানো যাবে না।'
যারা কয়েক দশক ধরে এই কঠোর নীতির মধ্যে বড় হয়েছেন, তাদের এখনকার উপলব্ধিগুলো বেশ ভিন্ন। বেইজিংয়ের বাসিন্দা ৫৭ বছর বয়সী সং মিন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি। তিনি বলেন, 'আমাদের সময়ে দ্বিতীয় সন্তানের কথা কেউ চিন্তাই করতে পারত না।'
এক সন্তানের জননী সং মিন এখন মনে করেন, সেই সময় যদি তার স্বাধীনতা থাকত, তবে তিনি হয়তো আজ ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'এক সন্তান নীতি তখন আমাদের চিন্তাভাবনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয় আমার যদি দুই বা তার বেশি সন্তান থাকত, তবে খুব ভালো হতো।'
