ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব হাতে নেওয়া কে এই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ?
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আকস্মিকভাবে আটক হওয়ার পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তির মধ্যে দেশটিতে স্বল্প সময়ের জন্য একটি ক্ষমতার শূন্যতা দেখা দেয়।
শনিবার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক আকস্মিক ঘোষণায় জানান, ৫৬ বছর বয়সী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে উপেক্ষা করেন, যিনি গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
ডানপন্থী নেত্রী মাচাদো ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, বিশেষ করে অক্টোবর মাসে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর—যে পুরস্কারটি ট্রাম্প নিজেও পেতে চেয়েছিলেন এবং মাচাদো সেটি তাকেই উৎসর্গ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলার নেতা হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন বা 'শ্রদ্ধা' মাচাদোর নেই।
ট্রাম্প জানান, রদ্রিগেজ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তিনি 'ভেনেজুয়েলাকে আবারও মহান করতে আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নিতে মূলত ইচ্ছুক'। ট্রাম্প আরও বলেন, 'আমি মনে করি তিনি বেশ দয়ালু ছিলেন। আমরা এমন কাউকে ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব নিতে দিতে পারি না, যার মনে ভেনেজুয়েলার মানুষের মঙ্গল কামনার বিষয়টি নেই।'
তবে হামলা ও মাদুরোকে আতকের পরপরই রদ্রিগেজের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি মার্কিন সামরিক পদক্ষেপকে 'বর্বর আগ্রাসন' হিসেবে অভিহিত করেন এবং মাদুরোর অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সামরিক কমান্ডার ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, 'এই দেশে একজনই প্রেসিডেন্ট আছেন এবং তার নাম নিকোলাস মাদুরো।'
বিপ্লবী শিকড়
কারাকাসের স্থানীয় বাসিন্দা ডেলসি রদ্রিগেজের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১৮ মে। তিনি বামপন্থী বিদ্রোহী যোদ্ধা জর্জ আন্তোনিও রদ্রিগেজের কন্যা। তার বাবা ১৯৭০-এর দশকে সোশ্যালিস্ট লিগ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি নিহত হন—যা সে সময়ের তরুণ নিকোলাস মাদুরোসহ বহু সক্রিয় কর্মীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
রদ্রিগেজের ভাই জর্জ রদ্রিগেজ বর্তমানে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হিসেবে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।
ডেলসি রদ্রিগেজ একজন আইনজীবী এবং ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত এক দশকে তিনি দ্রুত রাজনৈতিক উচ্চতায় পৌঁছান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিশ্বমঞ্চে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সমাজতান্ত্রিক 'বিপ্লব' এবং তার উত্তরসূরি 'চাভিস্তা' আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন।
তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যোগাযোগ ও তথ্যমন্ত্রী, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০১৭ সালে মাদুরোর ক্ষমতা সুসংহতকারী প্রোকনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থনৈতিক দক্ষতা
রদ্রিগেজকে অনেক সময় নব্বইয়ের দশকে হুগো শ্যাভেজের সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের তুলনায় তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী বা মধ্যপন্থী হিসেবে দেখা হয়।
ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বের পাশাপাশি অর্থ ও তেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের ফলে তিনি ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। দেশটির স্থবির হয়ে পড়া বেসরকারি খাতের ওপরও তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। অতি-মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিনি প্রথাগত অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগ করেন।
২০২৪ সালের আগস্টে মাদুরো তাকে তেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন, যাতে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করা যায়।
কারাকাসভিত্তিক সাংবাদিক স্লিথার ফার্নান্দেজ আল জাজিরাকে বলেন, 'সরকারের ভেতরে তার এই উচ্চ প্রোফাইলই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনার বিষয়টিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।'
রদ্রিগেজ মার্কিন তেল শিল্প এবং ওয়াল স্ট্রিটঘনিষ্ঠ রিপাবলিকানদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তারা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সরকার পরিবর্তনের ধারণায় অনাগ্রহী ছিলেন।
তার পূর্ববর্তী আলোচনাসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন ব্ল্যাকওয়াটার নিরাপত্তা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স এবং সম্প্রতি রিচার্ড গ্রেনেল। গ্রেনেল ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসেবে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে মাদুরোর সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছিলেন।
'টাইগার'
মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচিত হলেও, মাদুরো রদ্রিগেজকে তার সমাজতান্ত্রিক সরকারের একনিষ্ঠ রক্ষক হিসেবে 'টাইগার' বলে ডাকতেন।
২০১৮ সালের জুনে তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করার সময় মাদুরো তাকে 'একজন সাহসী, অভিজ্ঞ, শহীদের কন্যা, বিপ্লবী এবং হাজারো যুদ্ধে পরীক্ষিত এক তরুণী' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
শনিবার মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর রদ্রিগেজ মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের জীবিত থাকার প্রমাণ দাবি করেন এবং মার্কিন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানান।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ভিটিভি-তে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, 'আমরা মহান জন্মভূমির জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই, কারণ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা যে কারো সঙ্গেই করা হতে পারে। জনগণের ইচ্ছা দমন করতে শক্তির এই বর্বরোচিত ব্যবহার যেকোনো দেশের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করা হতে পারে।'
শনিবার রাতের দিকে ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক শাখা রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়।
আদালত রুল জারি করে জানায়, 'প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং জাতির সামগ্রিক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য' রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার বোলিভারিয়ান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন।
ফার্নান্দেজের মতে, আপাতত কিছু নির্দিষ্ট সাংবিধানিক নিশ্চয়তা সীমিত করা হতে পারে, যার ফলে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে রদ্রিগেজের ক্ষমতা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকতে পারে।
