এল পাইসের বিশ্লেষণ: স্বৈরশাসককে উৎখাতের চেয়ে নেতৃত্বহীন একটি দেশ শাসন করাটাই কঠিন
২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে যেটুকু সন্দেহের অবকাশ ছিল কারো কারো মনে সেটা তখনই দূর হয়ে যায়, যখন বাগদাদে লুটপাটকারীরা রাজধানীর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর থেকে হাজার হাজার বছরের পুরোনো নিদর্শন লুট করে নিয়ে যাচ্ছিল, আর একই সময়ে মার্কিন সেনারা দেশটির তেল মন্ত্রণালয় ঘিরে শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছিল—যেটি ছিল একমাত্র সরকারি ভবন, যেখানে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং যেখান থেকে একটি কাগজও বাইরে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে, যুক্তরাজ্যের সামরিক সহায়তা ও স্পেনের নৈতিক সমর্থনে পরিচালিত এই অবৈধ ও বিপর্যয়কর আগ্রাসন প্রমাণ করেছিল, একজন স্বৈরশাসককে উৎখাত করা যতটা সহজ, নেতৃত্বহীন একটি দেশ শাসন করা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।
কারাকাসে হামলার পর মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের হাতে নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার ঘটনাসহ যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ এবং ইরাক আগ্রাসনের মধ্যে পার্থক্য অনেক। তবে মনে হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সেই বিপর্যয় থেকে হোয়াইট হাউস কিছু শিক্ষা নিয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকের ভাইসরয় পল ব্রেমার—যিনি সামরিক পোশাকে বাগদাদের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন এবং যে দেশটি তিনি বুঝতেন না, সেটি গড়ে তোলার ভান করতেন—তার প্রথম সিদ্ধান্তই ছিল ইরাকি সেনাবাহিনী ও সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টি বিলুপ্ত করা। সাদ্দামের আমলে সংখ্যালঘু সুন্নিদের হাতেই ছিল দেশের শাসনব্যবস্থা, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা ছিল নানান নিপীড়ন, বৈষম্যের শিকার। এই অবস্থায়, পল ব্রেমারের এসব সিদ্ধান্তে সাবেক শাসক সুন্নি সংখ্যালঘু ও নিপীড়িত শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে গভীরভাবে বিভক্ত একটি দেশ দ্রুতই চরম নৈরাজ্যে নিমজ্জিত হয় এবং একসঙ্গে গৃহযুদ্ধ, আগ্রাসী সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াই, সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে প্রাণ হারায় লাখ লাখ মানুষ।
সাবেক স্বৈরশাসকের অনুগত অধিকাংশ সেনা বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে অচিরেই প্রতিরোধ সংগ্রামে যোগ দেয়। ফলে এই আগ্রাসনটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের সেনাদের জন্য এক জীবন্ত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। সাদ্দামের পতনের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে 'কোথাও কেউ দায়িত্বে নেই'—এই অনুভূতিটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাগদাদের স্থায়ী যানজটে, যা পুরো শহরকে অচল করে দিয়েছিল; এমনকি ট্রাফিক সিগন্যালও কাজ করছিল না। এই নৈরাজ্য থেকেই জন্ম নেয় ইসলামিক স্টেট, এবং শুরু হয় এমন এক অস্থিতিশীলতা, যা আজও শেষ হয়নি। ইরাক একটি অত্যন্ত জটিল রাষ্ট্র—ভেনেজুয়েলার মতোই জটিল, যেখানে ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস করে এবং যার আয়তন স্পেনের দ্বিগুণ।
ডেলসি রদ্রিগেজের মাধ্যমে শ্যাভেজবাদকে ক্ষমতায় রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত—যিনি বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণসহ ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ধরে রেখেছেন—নিশ্চিতভাবেই বাগদাদে পাওয়া একটি শিক্ষা, যা বুশ প্রশাসনের সেই যুদ্ধবাজদের ভুল থেকে এসেছে; যদিও আজকের যুদ্ধবাজদের তুলনায় যাদের এখন গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসী বলেই মনে হয়।
নিকোলাস মাদুরোর কারচুপির নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী এদমুন্দো গনসালেস ও মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে বিশ্বাসঘাতকতার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার যুক্তি সেই একই, যা ইরাকে তেল মন্ত্রণালয়কে রক্ষা করার সময় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর লুট হতে দেওয়ার পেছনে কাজ করেছিল। প্রত্নতত্ত্বের এক অনন্য ক্লাসিক গ্রন্থ হলো স্যামুয়েল-নোয়া ক্রেমারের 'হিস্টোরি বিগিনস এট সুমের'—আর সেই ইতিহাসের একটি অংশ হারিয়ে গিয়েছিল সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে। গণহত্যাকারী স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর যে মুক্তির অনুভূতি জন্ম নিয়েছিল, তা দ্রুতই মিলিয়ে যায়—লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর যেমন হয়েছিল।
বোমা ফেলে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা শুধু আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনই নয়, এটি সব সময়ই একটি ভয়াবহ ধারণা। ইরাক আগ্রাসনের প্রাক্কালে সংযমের প্রতীক হয়ে ওঠা সাবেক ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক দ্য ভিলপাঁ রোববার টুইটারে লিখেছেন, "সরকারগুলো যতই ঘৃণ্য হোক না কেন, ইতিহাস দেখায় যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন কখনোই গণতন্ত্র বা শান্তি বয়ে আনে না; বরং আনে বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধ ও স্বৈরতন্ত্র। ইরাক বা লিবিয়ার দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়।"
ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন উনিশ শতকে—যখন কোনো আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ছিল না, আর শক্তিধর দেশগুলো মনে করত, যা ইচ্ছা দখল করার অধিকার তাদের আছে। সেই বিপর্যয়কর আগ্রাসন থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে একমাত্র শিক্ষা নিয়েছে, তা মূলত বাস্তববাদী। ২০০৩ সালের ইরাক বিশ্বকে দিয়েছে একজন স্বৈরশাসকবিহীন বাস্তবতা, কিন্তু রেখে গেছে আরও বিপজ্জনক একটি পৃথিবী। ভেনেজুয়েলাতেও এখন একই রকম কিছু ঘটছে: এবার স্বৈরশাসক নেই, কিন্তু তার শাসনব্যবস্থা রয়ে গেছে।
