ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি করবে ভেনেজুয়েলা
কারাকাস ও ওয়াশিংটন ২০০ কোটি ডলার মূল্যের ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। এই চুক্তির ফলে চীনে যাওয়া তেলের সরবরাহের একটি অংশ অন্যদিকে ঘুরে যাবে এবং ভেনেজুয়েলাকে আরও বড় পরিসরে তেল উৎপাদন কমানোর চাপ এড়াতে সহায়তা করবে।
এই চুক্তিকে শক্ত ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার সরকার ট্রাম্পের সেই দাবির প্রতি সাড়া দিয়েছে। অবশ্য ট্রাম্প আগেই মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ উন্মুক্ত করতে বলেছিলেন, অন্যথায় আরও সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্র ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে 'পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার' দিক।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ট্রাম্পের আরোপিত রপ্তানি অবরোধের কারণে ভেনেজুয়েলার লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল বর্তমানে ট্যাঙ্কার এবং স্টোরেজ ট্যাঙ্কগুলোতে লোড করা অবস্থায় পড়ে আছে যা তারা পাঠাতে পারছে না।
এই অবরোধ ছিল ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের অংশ, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে চলতি সপ্তাহান্তে মার্কিন বাহিনী তাকে আটক করে। ভেনেজুয়েলার শীর্ষ কর্মকর্তারা মাদুরোকে আটকের ঘটনাকে 'অপহরণ' বলে অভিহিত করেছেন এবং দেশটির বিপুল তেল সম্পদ দখলের চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।
ভেনেজুয়েলা তাদের ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ব্যারেল 'নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন তেল' যুক্তরাষ্ট্রের কাছে 'হস্তান্তর' করবে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
তিনি আরও বলেন, এই তেল বাজার মূল্যে বিক্রি করা হবে। সেই অর্থ তিনি নিজে নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং এটি ভেনেজুয়েলা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এই চুক্তিটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তেল সরাসরি জাহাজ থেকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
আটকে পড়া অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করার জন্য শুরুতে সেই কার্গো বা তেলের চালানগুলোর দিক পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে, যেগুলো মূলত চীনের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। মঙ্গলবার রয়টার্সকে এমনটিই জানিয়েছেন দুটি সূত্র। গত এক দশকে—বিশেষ করে ২০২০ সালে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তেল বাণিজ্যে জড়িত কোম্পানিগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর—চীনই ছিল ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
তেল শিল্পের একটি সূত্র জানিয়েছে, 'ট্রাম্প চান এটি খুব দ্রুত ঘটুক, যাতে তিনি বলতে পারেন যে এটি একটি বিরাট জয়।
এ বিষয়ে ভেনেজুয়েলা সরকারের কর্মকর্তা এবং দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে শেভরন
ট্রাম্পের ঘোষণার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের দাম ১.৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে; কারণ এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার তেল প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে শেভরন, যারা মার্কিন কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমোদনে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-এর প্রধান যৌথ উদ্যোগের অংশীদার।
শেভরন প্রতিদিন প্রায় এক লাখ থেকে দেড় লাখ ব্যারেল ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করছে। অবরোধ চলাকালীন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি থেকে কোনো বাধা ছাড়াই অপরিশোধিত তেল লোড ও পরিবহন করতে সক্ষম একমাত্র কোম্পানি ছিল শেভরন।
এই তেল সরবরাহ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ভেনেজুয়েলা ব্যবহার করতে পারবে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে; তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে এবং মার্কিন ডলারে লেনদেন পরিচালনা করতে পারছে না।
ভেনেজুয়েলা তাদের প্রধান তেল 'মেরে' ভেনেজুয়েলার বন্দরগুলোতে ব্রেন্ট তেলের চেয়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ২২ ডলার কমে বিক্রি করছে; যার ফলে এই চুক্তির মূল্য ১৯০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
সোমবার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়া রদ্রিগেজ নিজেও ২০১৮ সালে গণতন্ত্র ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।
মার্কিন ক্রেতাদের অংশগ্রহণে সম্ভাব্য নিলাম নিয়ে আলোচনা
ভেনেজুয়েলা এবং মার্কিন কর্মকর্তারা এই সপ্তাহে তেলের সম্ভাব্য বিক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। রয়টার্সকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে আগ্রহী মার্কিন ক্রেতাদের জন্য চালানের নিলাম ব্যবস্থা এবং পিডিভিএসএ-র ব্যবসায়িক অংশীদারদের মার্কিন লাইসেন্স দেওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় সরবরাহ চুক্তিতে রূপ নিতে পারে।
এই লাইসেন্সগুলো অতীতে পিডিভিএসএ-র যৌথ উদ্যোগের অংশীদার এবং গ্রাহকদের— যার মধ্যে শেভরন, ভারতের রিলায়েন্স, চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এবং ইউরোপের এনি ও রেপসল অন্তর্ভুক্ত— ভেনেজুয়েলার তেল পরিশোধন বা তৃতীয় পক্ষের কাছে পুনরায় বিক্রির সুযোগ করে দিয়েছিল।
দুটি পৃথক সূত্রের তথ্যমতে, এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে কয়েকটি এই সপ্তাহে আবারও ভেনেজুয়েলার তেলের চালান গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
একটি সূত্রের মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতে ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহার করা যায় কি না, সে বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে ট্রাম্প এই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেননি।
অনেকের জন্য তেল সরবরাহ বৃদ্ধি একটি 'দারুণ খবর'
মার্কিন স্বরাষ্ট্র সচিব ডগ বার্গাম মঙ্গলবার বলেন, মার্কিন উপসাগরীয় অঞ্চলে ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়া কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম এবং ভেনেজুয়েলার জন্য 'দারুণ খবর' হবে।
তেল রপ্তানি নিয়ে দুই সরকারের মধ্যে চলমান আলোচনা সম্পর্কে ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, 'ভেনেজুয়েলার কাছে এখন পুঁজি আসার এবং তাদের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও তার সুবিধা নেওয়ার একটি সুযোগ রয়েছে। মার্কিন প্রযুক্তি এবং মার্কিন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলাকে বদলে দেওয়া সম্ভব।'
যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের রিফাইনারিগুলো ভেনেজুয়েলার ভারী মানের অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে সক্ষম এবং ওয়াশিংটন জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগে তারা প্রতিদিন প্রায় ৫ লক্ষ ব্যারেল তেল আমদানি করত।
নিষেধাজ্ঞার কারণে পিডিভিএসএ ইতোমধ্যে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, কারণ তাদের কাছে তেল সংরক্ষণের জায়গা ফুরিয়ে আসছে। একটি সূত্রের মতে, দ্রুত তেল রপ্তানির পথ তৈরি না হলে তাদের উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে হবে।
তেল ব্যবসায়ীরা মঙ্গলবার এই চুক্তির আলোচনার খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার আরও তেল সরবরাহের সম্ভাবনায় মঙ্গলবার মার্কিন উপসাগরীয় অঞ্চলে কিছু ভারী তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৫০ সেন্ট কমে গেছে।
