‘অনেকেই জানেন না, এক দিনে পার্সেল পৌঁছাতে কী ধকল যায়’: চীনে দ্রুত ডেলিভারির আড়ালের মানুষদের জীবন
ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটিতেও গত হয়ে যাওয়া কঠিন দিনগুলোর ছাপ। গায়ে সোয়েটশার্ট, মাথা পুরো ন্যাড়া। চীনের রাজধানী বেইজিং চষে বেড়ানো হাজারো ডেলিভারি ম্যানদের মধ্যে একজন তিনি।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, হু আনিয়ান নিজেও ছিলেন এই অনিশ্চিত জীবনের যাত্রী। সামনে হ্যামবার্গার আর বিয়ারে চুমুক দিতে দিতেই শোনালেন নিজের গল্প। 'অনেকেই জানেন না, কীভাবে একটি অর্ডার মাত্র এক দিনের মধ্যে তাদের বাড়িতে পৌঁছে যায়।'
চীনে এখন হোম ডেলিভারির রমরমা অবস্থা। যখন-তখন মানুষ এটা-সেটা অর্ডার করছেন। ই-কমার্সে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার এখন এশিয়ার এই বিশাল দেশটি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশটিতে বছরে একজন মানুষ গড়ে ১২৫টি পার্সেল হাতে পান। অর্থাৎ প্রতি তিন দিনে একটি করে অর্ডার।
বাজার ধরতে কোম্পানিগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা তীব্র। আর মানুষের দ্বারে দ্বারে এই পণ্য পৌঁছে দিতে কাজ করছে মোটরবাইক আর ইলেকট্রিক স্কুটার চালকদের বিশাল এক বাহিনী। বাইকের পেছনে ধাতব বাক্স বসিয়ে তারা অবিরাম ছুটে চলেন। বাড়ির সামনে স্কুটার থামিয়ে পার্সেলটি দরজায় পৌঁছে দেন, কড়া নাড়েন, প্রয়োজনে গ্রাহককে ফোনও করেন।
হাড়ভাঙা খাটুনি, অথচ এই কর্মীদের বেতন নামমাত্র। তাদের বেশির ভাগই গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন জীবিকার সন্ধানে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে বেছে নিয়েছেন ছোট কোনো বাসা।
অ্যাপভিত্তিক গাড়িচালক ও ডেলিভারি ম্যানদের মতো পেশাকে বলা হচ্ছে 'নতুন ধরনের কর্মসংস্থান'। চীনে বর্তমানে এমন কর্মীর সংখ্যা ৮ কোটি ৪০ লাখ।
৪৬ বছর বয়সী হু আনিয়ানও ছিলেন এই দলেরই একজন। কাজ করতেন একটি লজিস্টিক কোম্পানিতে। কখনো ডেলিভারি ম্যান হিসেবে, কখনো রাতের শিফটে। নিজের সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি লিখেছেন 'আই ডেলিভার প্যাকেজেস ইন বেইজিং' (২০২৩)। আত্মজীবনীমূলক এই বইটি চীনে বেশ সাড়া ফেলে। গত অক্টোবরে এটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।
বইটিতে উঠে এসেছে চীনের নতুন এই শ্রমজীবী শ্রেণির জীবনসংগ্রামের চিত্র। লজিস্টিক কোম্পানিতে রাতের শিফটে প্যাকেট বাছাইয়ের কাজ করতেন আনিয়ান। সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, 'কাজটা আমি মোটামুটি উপভোগই করতাম। কারও সঙ্গে কথা বলার বালাই ছিল না, মাথা খাটানোরও দরকার হতো না। শুধু শার্টের হাতা গুটিয়ে কাজে লেগে পড়তাম।'
কাজের চাপ কতটা তীব্র ছিল, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে আনিয়ান লেখেন, 'এত ঘাম হতো যে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনই পড়ত না।' দিনে ১২ ঘণ্টা খাটুনি, রাতের খাবারের জন্য বিরতি মিলত মাত্র আধা ঘণ্টা। সব মিলিয়ে মাসে আয় হতো ৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫ হাজার ইউয়ান (সাড়ে ৭৩ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকার মতো)। তবে কাজে কোনো ভুল হলে বা জরিমানা গুনতে হলে সেই অঙ্ক আরও কমে যেত।
এরপর আনিয়ান শুরু করেন ডেলিভারি ম্যানের কাজ। সেখানে প্রতিদিন সকালে এরিয়া ম্যানেজারের হুংকার দিয়ে দিন শুরু হতো। ম্যানেজার চিৎকার করে বলতেন, 'এমনটা ভাবার কোনও প্রয়োজন নেই যে, তোমরা না থাকলে আমাদের চলবে না। এই কাজ যে কেউ করতে পারে!'
এই চাকরিতেও দিনে ১১ ঘণ্টা খাটতেন আনিয়ান। শিফটের সময় এক ফোঁটা পানিও খেতেন না, যাতে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন না পড়ে। কারণ, রাস্তায় টয়লেট খুঁজে বের করা যেমন ঝামেলার, তেমনি তাতে নষ্ট হয় মহামূল্যবান সময়। প্রতিটি সেকেন্ড সেখানে দামী।
প্রতি মিনিটের দাম আধা ইউয়ান
শহরে টিকে থাকতে হলে সময় আর টাকাই ছিল হু আনিয়ানর ধ্যানজ্ঞান। বইয়ের এক জায়গায় তিনি সময়ের দাম কষেছেন—প্রতি মিনিটে আধা ইউয়ান (প্রায় ৮ টাকা)। তার হিসাবে, কোম্পানি যদি প্রতিটি ডেলিভারির জন্য দুই ইউয়ান দেয়, তাহলে কাজটা পোষাতে হলে প্রতি চার মিনিটে একটি করে প্যাকেট ডেলিভারি করতে হবে।
আনিয়ান লিখেছেন, 'ধীরে ধীরে সবকিছুকে কেবল টাকার হিসাবে দেখার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।' তার হিসাবে, একবার বাথরুমে যাওয়ার খরচ এক ইউয়ান। আর খাওয়ার খরচ ১০ ইউয়ান, খাবারের দাম তো আছেই। তিনি বলেন, 'এই হিসাবের চক্করে অনেক বেলাই না খেয়ে থেকেছি।'
স্পেনের সংবাদমাধ্যম এল পাইসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় মাত্র তিন কামড়ে হ্যামবার্গারটা শেষ করে ফেলেন তিনি। প্লেটে পড়ে থাকা হ্যামবার্গারের শেষ অংশের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করেন তাঁর প্রিয় লেখকদের নাম—ফ্লোবেয়ার, কাফকা থেকে শুরু করে ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস পর্যন্ত। শিগগিরই তাঁর একটি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশিত হবে, এখন একটি উপন্যাস লিখছেন।
লেখাই এখন তাঁর পেশা। বেইজিংয়ের কোলাহল ছেড়ে তিনি এখন চেংদুতে চলে গেছেন, যে শহরটা পরিচিত তার ধীরগতির শান্ত পরিবেশের জন্য। হু আনিয়ানর চেহারায় এখন আর কোনো তাড়া নেই। ধীরেসুস্থে বলেন, 'আমি ধীরে লিখি।'
আনিয়ানের মতে, তার বইয়ের সাফল্যের কারণ হলো, এটি এমন এক জগৎকে সবার সামনে তুলে ধরেছে, যা চোখের আড়ালে থাকলেও তার সুফল সবাই ভোগ করে। তিনি জানান, 'প্রথম দিকের পাঠকেরা বইটি পড়ে ধাক্কা খেয়েছেন, আবেগপ্রবণ হয়েছেন।' অনেকে আবার বইটির মধ্যে নিজেদেরই ছায়া খুঁজে পেয়েছেন, কারণ তাঁরাও নিজেদের চারপাশের পরিবেশ নিয়ে 'বিভ্রান্ত বা হতাশ'।
এই লেখকের মতে, আধুনিক সমাজের অতি উন্নয়নের ফলে নানা ধরনের পেশা তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে একটা স্পষ্ট বিভাজনও তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, 'মানুষ এখন জানেই না, অন্যেরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করে।'
