সার রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দিল চীন, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাজারে আরও সংকটের আশঙ্কা
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর, অভ্যন্তরীণ বাজার সুরক্ষিত রাখতে সার রপ্তানিতে রাশ টানছে বেইজিং। এর ফলে বিশ্বজোড়া সারের বাজারে নতুন করে সংকট তৈরি হতে পারে। এমনিতেই আমেরিকা, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় চীনের নতুন পদক্ষেপে চাপ আরও বাড়ল।
চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সার রপ্তানিকারক। গত বছর দেশটি ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সার রপ্তানি করেছে। কৃষকদের জন্য নিজেদের বাজারে সারের দাম কম রাখতে আগেও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পথে হেঁটেছে বেইজিং।
যুদ্ধের জেরে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ। সমুদ্রপথে সার সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হয় এই রুট দিয়ে। সূত্রমতে, মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে নাইট্রোজেন-পটাশিয়াম মিশ্রিত সার ও নির্দিষ্ট কিছু ফসফেট সার রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বেইজিং।
যদিও এই নিষেধাজ্ঞার কথা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রথম এই খবর প্রকাশ্যে আনে সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ।
ইউরিয়া রপ্তানিতে আগে থেকেই কোটাসহ একাধিক বিধিনিষেধ রয়েছে চীনের। পৃথক পাঁচ সূত্রের দাবি, নতুন এই পদক্ষেপের ফলে এখন কেবল অ্যামোনিয়াম সালফেটের মতো হাতেগোনা কয়েকটি সারই রপ্তানি করা যাবে। রয়টার্সের প্রাক্কলন অনুসারে, গত বছর চীন যে পরিমাণ সার রপ্তানি করেছিল, তার অর্ধেক থেকে তিন-চতুর্থাংশই (প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন) এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।
সিনিয়র পণ্য বিশ্লেষক ম্যাথিউ বিগিন বলেন, 'এই প্রবণতা নতুন নয়। বিশ্ববাজারে জোগান কমলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে চীন বরাবরই নিজেদের রপ্তানি কমিয়ে দেয়।'
গত সপ্তাহেই পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল বেইজিং। যুদ্ধের কারণে যেসব পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, চীন সরকার এভাবেই সেই পণ্যগুলোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ঘাটতি বাড়ছে এবং জিনিসের দাম চড়ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম ইতিমধ্যেই প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও ইউরিয়ার আগাম চুক্তির দর গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
চীনের ওপর নির্ভরশীলতা
ফসলের বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য সার অত্যন্ত জরুরি। সারের দাম বাড়লে কৃষকরা এর ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন, অথবা যেসব ফসলে সারের প্রয়োজন কম, সেই ধরনের চাষের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের তথ্যমতে, গত বছর ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড তাদের মোট আমদানিকৃত সারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চীন থেকেই কিনেছিল। মালয়েশিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ছিল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের মোট আমদানিকৃত সারের প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছিল চীন থেকে।
চীনের কাস্টমসের তথ্য বলছে, এই রপ্তানির প্রায় অর্ধেক থেকে ৮০ শতাংশই এখন বিধিনিষেধের কবলে পড়তে চলেছে।
নয়াদিল্লি-ভিত্তিক একটি সার কোম্পানির একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, 'ক্রেতারা আশা করেছিল চইন এই ঘাটতি মেটাতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত জোগানে আরও টান ফেলবে।'
গত বছর ভারত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৪০ শতাংশেরও বেশি ইউরিয়া (নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সার) ও ডিএপি আমদানি করেছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউরিয়া রপ্তানির জন্য চীনের কাছে কোটা বরাদ্দ করার অনুরোধ জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
রপ্তানি শুরু কবে?
বুধবার ফিলিপাইন বলেছিল, সার রপ্তানিতে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ হবে না বলে চিন তাদের আশ্বস্ত করেছে।
এক দিন পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। চীনের শুল্ক দপ্তর, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিক ভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
বুধবার সাংহাইয়ে একটি সার সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রয়টার্সের প্রতিনিধিরা। সেখানে পাঁচজন বিক্রয়কর্মী জানান, অগস্টের আগে এই নিষেধাজ্ঞা ওঠার কোনো সম্ভাবনা তারা দেখছেন না। সাধারণত জুন থেকে আগস্ট মাসেই চীনে সারের রপ্তানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
বসন্তের চাষাবাদের পর সরকার কী নির্দেশ দেয়, আপাতত সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন উৎপাদনকারীরা। গত ডিসেম্বরেই চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সার সংগঠন আগস্ট পর্যন্ত ফসফেট সার রপ্তানি স্থগিত রাখার জন্য উৎপাদকদের নির্দেশ দিয়েছিল।
