কর্মীদের আসলে কত ঘণ্টা কাজ করা উচিত?
৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস—এই নিয়মটা এখনো টিকে আছে। তবে পুরোপুরি নয়। বিশ্বব্যাংক ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বের মানুষ গড়ে সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টা কাজ করেন। অবশ্য নারী-পুরুষ ভেদে, বয়স অনুযায়ী কিংবা দেশের অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে এই সময়টা কমবেশি হয়। সব কাজ তো আর আট ঘণ্টার ফ্রেমে বাঁধা যায় না। তবুও সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের নিয়মটাই এখনো অলিখিতভাবে চলছে।
মানুষ আসলে কতক্ষণ কাজ করেন আর তাদের কতক্ষণ কাজ করা উচিত—এই দুটি কিন্তু এক কথা নয়। চাকরি, বেতন আর সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণে এর কোনো ধরাবাঁধা উত্তর নেই। তবে কাজের সময় নিয়ে ব্যবস্থাপকদের ভাবনা থেকেই বোঝা যায় তাদের ধরণ বা মানসিকতা কেমন।
যারা 'ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স' বা ব্যক্তিগত জীবনকে গুরুত্ব দেন, তাদের কাছে ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষণার কথাটি যৌক্তিক মনে হতে পারে। তারা তিন দেশের কর্মীদের কাছে জানতে চেয়েছিল, কাজের সময় কমাতে তারা বেতন কমাতে রাজি কি না।
জার্মানি আর ব্রিটেনের মানুষ জানিয়েছে, তারা প্রয়োজনে বেতন কম নেবে, তবু ছুটি বা অবসর বেশি প্রয়োজন। যেমন জার্মানরা সপ্তাহে ৩৭ ঘণ্টা কাজ করতেই বেশি পছন্দ করে। অন্যদিকে আমেরিকানরা ঠিক উল্টো। তারা বেশি সময় কাজ করতে চায়, যাতে পকেটে বেশি টাকা আসে।
উৎপাদনশীলতার হিসাবটা আবার অন্যরকম। গবেষকরা বলছেন, কর্মীদের কাজের সময় কমালে সবারই লাভ হতে পারে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির জন পেনক্যাভেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ব্রিটিশ অস্ত্র কারখানার কর্মীদের কাজের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলেই কর্মীদের কাজের গতি কমতে শুরু করে।
আর ৬৩ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বাড়তি সময়ে আসলে কোনো লাভই হয় না। বিষয়টি সহজ। শুক্রবার বিকেলে বা সপ্তাহের শেষ দিকে কি সেরা কাজটা করা সম্ভব? উত্তরটা সাধারণত 'না'।
খরচের দিকটাও ভাবা দরকার। অনেক কোম্পানি মনে করে, নতুন কর্মী নেওয়ার চেয়ে পুরোনো কর্মীদের দিয়ে বেশি সময় কাজ করানো ভালো। কারণ নতুন কর্মী নিয়োগ দিলে অনেক ফিক্সড কস্ট বা বাঁধা খরচ বাড়ে। তাদের স্বাস্থ্যবীমাসহ নানা সুবিধা দিতে হয়। তার চেয়ে বরং অভিজ্ঞ কর্মীদের দিয়ে একটু বেশি সময় কাজ করানো অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী।
তবে নিরাপত্তার কথা ভাবলে কিন্তু লম্বা ডিউটি বেশ বিপজ্জনক। ক্লান্তি কাজের বারোটা বাজাতে পারে। একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মিসিসিপির প্যারামেডিক বা জরুরি চিকিৎসাকর্মীদের ওপর গবেষণা চালিয়েছে। দেখা গেছে, দীর্ঘ শিফটের শেষের দিকে তারা ক্লান্ত হয়ে ভুল করেন। আর জরুরি মুহূর্তে এই ভুল রোগীর মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
তবে কিছু চাকরিতে ক্লান্তির চেয়ে অভিজ্ঞতার দাম বেশি। নেদারল্যান্ডসের কল সেন্টারের কর্মীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি সময় কাজ করলে তাদের কলের সংখ্যা হয়তো বাড়ে না। কিন্তু কাজের মান কিছুটা ভালো হয়। একজন ক্লান্ত কর্মীও অভিজ্ঞতার কারণে গ্রাহকের সমস্যার সমাধান দ্রুত করতে পারেন।
অনেকে আবার বেশি কাজ করাকে সাফল্যের চাবিকাঠি মনে করেন। নতুন স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোতে রাত জেগে কাজ করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। গুগল বা ইনফোসিসের মতো বড় কোম্পানির কর্তারাও একই কথা বলেন। গুগলের সের্গেই ব্রিন একবার বলেছিলেন, সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ করলে সেরা উৎপাদনশীলতা পাওয়া যায়।
ইনফোসিসের এন আর নারায়ণ মূর্তি তো ভারতের উন্নতির জন্য সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টার বেশি কাজের পরামর্শ দিয়েছেন। বড় কোম্পানিতেও প্রমোশন পেতে হলে একটু বেশি খাটতেই হয়। ইলন মাস্ক একবার বলেছিলেন, সপ্তাহে মাত্র ৪০ ঘণ্টা কাজ করে কেউ কখনো পৃথিবী বদলাতে পারেনি।
কাজের সময় আসলে কত হওয়া উচিত? কেউ বলবেন ঘণ্টার হিসাব বাদ দিয়ে কাজের ফলাফলে নজর দেওয়া উচিত। কেউ নীতিনির্ধারকদের দিকে তাকাবেন, আবার কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর কথা তুলবেন। বেছে নেয়া উত্তরটাই বলে দেবে মালিকবৃন্দের কাছে কোন জিনিসটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ—কর্মীর সুস্থতা নাকি শুধুই কাজ।
