'শ্রমিকদের বেতন দেব কীভাবে?': ট্রাম্পের ৫০% শুল্কের ধাক্কায় টালমাটাল ভারতের কারখানাগুলো

ভারতের তিরুপপুরে এন কৃষ্ণমূর্তির পোশাক কারখানায় নেমে এসেছে নীরবতা। ভারতের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি কেন্দ্রের প্রায় ২০০টি সেলাই মেশিনের মধ্যে চলছে কেবল অল্প কয়েকটি। শ্রমিকরা যুক্তরাষ্ট্রের বড় খুচরা বিক্রেতাদের জন্য শিশুদের পোশাকের শেষ অর্ডার শেষ করছেন। খবর বিবিসি'র।
রুমের একপাশে নতুন ডিজাইনের কাপড়ের নমুনা ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে। এসব পণ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ৫০ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধির আওতায় পড়েছে, যা বুধবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
ভারত যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণে পণ্য রপ্তানি করে—এর মধ্যে পোশাক, চিংড়ি, রত্ন ও গয়না উল্লেখযোগ্য। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বেশি শুল্ক আরোপ—রাশিয়ার তেল ও অস্ত্র কিনলে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ জরিমানাসহ—ভারতের পণ্যের ওপর কার্যত অবরোধ তৈরি করেছে।
তিরুপপুর একাই ভারতের ১৬ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তুত পোশাক রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে। এসব তৈরি পোশাকের গ্রাহক হলো—টার্গেট, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও জারা'র মতো ব্র্যান্ড। এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রবল আশঙ্কা।
কৃষ্ণমূর্তি বলেন, 'সেপ্টেম্বরের পর হয়তো আর কোনো কাজই থাকবে না।'
গ্রাহকেরা সব অর্ডার স্থগিত করেছেন। শুল্ক ঘোষণার আগে তিনি কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন এবং ২৫০ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছেন।
শুল্ক বৃদ্ধির সময়টিও ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন। কারণ বার্ষিক বিক্রির প্রায় অর্ধেকই বড়দিনের আগে হয়। ফলে অনেক কারখানা এখন টিকে থাকার আশায় স্থানীয় বাজার ও দীপাবলি মৌসুমের দিকে ঝুঁকছে।
অন্য এক অন্তর্বাস কারখানায় দেখা গেছে প্রায় ১০ লাখ ডলারের পণ্য মজুত পড়ে আছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য তৈরি হলেও এখন ক্রেতা নেই।
রাফট গার্মেন্টসের মালিক শিবা সুব্রামানিয়াম বলেন, 'আমরা আশা করছিলাম ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবে। কিন্তু গত মাস থেকে পুরো উৎপাদন চেইন থমকে আছে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের বেতন কীভাবে দেব?'
শুল্ক হার ৫০ শতাংশ হলে আগে ১০ ডলারে বিক্রি হওয়া ভারতীয় একটি শার্টের দাম দাঁড়াবে ১৬ দশমিক ৪ ডলার। অথচ চীনা শার্টের দাম হবে ১৪ দশমিক ২ ডলার, বাংলাদেশের ১৩ দশমিক ২ ডলার আর ভিয়েতনামের মাত্র ১২ ডলার। এমনকি শুল্ক কমে ২৫ শতাংশ হলেও ভারত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকবে।
আপাতত এই প্রভাব কমাতে সরকার কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে এবং অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা জোরদার করেছে। তবে অনেকের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপ অনেক দেরিতে নেওয়া হচ্ছে।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, 'আমরা দেখতে পাব বাণিজ্যের প্রবাহ বদলে যাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা চলে যাচ্ছেন মেক্সিকো, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের দিকে।'
মুম্বাই থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের এক্সপোর্ট জোনে শত শত শ্রমিক হীরা ঘষামাজা ও প্যাকেটজাত করতে ব্যস্ত। এখান থেকেই ভারতের ১০ বিলিয়ন ডলারের রত্ন ও গয়না রপ্তানি হয়।
কিন্তু সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের গয়না রপ্তানি করা হবে। এ রপ্তানিতে নতুন শুল্কের প্রভাব কি হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় আছেন।
ক্রিয়েশন জুয়েলারির আদিল কোটওয়াল জানান, কয়েক মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করা বাজার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তার হীরা-খচিত গয়নার ৯০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয়।
কোটওয়ালের ব্যবসা ৩-৪ শতাংশ ক্ষীণ মুনাফার ওপর দাঁড়িয়ে। অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বসলে তা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। তিনি বলেন, 'এই শুল্ক কে বহন করবে? যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতারাও সেটা পারবেন না।'
তিনি হীরা সংগ্রহ করেন গুজরাটের সুরাট থেকে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় হীরা কাটা ও ঘষামাজার কেন্দ্র। তবে শুল্কের আগেই সেখানে সংকট তৈরি হয়েছিল—বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া ও ল্যাব-গ্রো হীরার প্রতিযোগিতার কারণে। এখন শুল্ক দ্বিগুণ হওয়া আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমেরিকান ক্রেতারা সরে গেছেন। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ করা কারখানাগুলো মাসে মাত্র ১৫ দিন চালু থাকে। শত শত চুক্তিভিত্তিক শ্রমিককে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
সুরাটের শহরতলির একটি অন্ধকার কারখানায় সারি সারি খালি টেবিল ধুলোয় ঢাকা। পাশে ভাঙা কম্পিউটার সিপিইউ ছড়িয়ে আছে।
একজন শ্রমিক বললেন, 'এখানে একসময় ভীষণ কর্মচাঞ্চল্য ছিল। সম্প্রতি অনেককে ছাঁটাই করা হয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, জানি না।'
কারখানার মালিক শৈলেশ মাঙ্গুকিয়া জানান, একসময় তার কারখানায় ৩০০ শ্রমিক ছিল, এখন রয়েছে মাত্র ৭০ জন। প্রতি মাসে যেখানে ২ হাজার হীরা ঘষামাজা হতো, এখন হচ্ছে কেবল ৩০০।
স্থানীয় শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ভবেশ তাঙ্ক বলেন, শ্রমিকেরা এখন 'কমতে থাকা মজুরি, জোর করে ছুটি আর সংকুচিত মাসিক আয়ে' ভুগছেন।
ভারতের অনেক চিংড়ি খামারি টিকে থাকার জন্য বিকল্প পণ্যে মনোযোগ দেওয়ার কথা ভাবছেন। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় চিংড়ি রপ্তানিকারক দেশ, আর যুক্তরাষ্ট্র এর প্রধান বাজারগুলোর একটি।
অতিরিক্ত শুল্কসহ চিংড়ির মোট শুল্ক এখন ৬০ শতাংশের ওপরে। এতে খাতটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। শুল্ক ঘোষণার পর থেকে প্রতি কেজি চিংড়ির দাম ০.৬০ থেকে ০.৭২ ডলার কমেছে। ৫০ শতাংশ নতুন শুল্ক কার্যকর হলে দাম আরও কমবে বলে আশঙ্কা।
রপ্তানিকারক ঠোটা জগদীশ বিবিসিকে বলেন, 'এ সময়টা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য ক্রিসমাস ও নববর্ষের বিক্রির প্রস্তুতির মৌসুম। আমাদের খামারিরা নতুন চাষ শুরু করেছেন। ট্রাম্পের শুল্ক সিদ্ধান্তে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আমরা কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারছি না।'

হ্যাচারি মালিকরাও জানিয়েছেন, এ কারণে তারা চিংড়ির লার্ভা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছেন।
ভীরাভাসারামের শ্রীমান্নারায়ণা হ্যাচারির এম এস ভার্মা বলেন, 'আগে বছরে গড়ে ১০ কোটি চিংড়ির লার্ভা উৎপাদন করতাম। এখন তা ৬ থেকে ৭ কোটিরও কমে গেছে।'
সব মিলিয়ে এ সংকটে সরাসরি প্রায় পাঁচ লাখ এবং পরোক্ষভাবে আড়াই মিলিয়ন মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির দীর্ঘস্থায়ী সংকট থাকা দেশে এ সংখ্যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
এদিকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের অচলাবস্থা এখনও অব্যাহত। বরং গত কয়েক সপ্তাহে বাণিজ্য আলোচনার পরিবেশ আরও খারাপ হয়েছে।
এই সপ্তাহে দিল্লিতে নতুন এক দফা আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অভিযোগ তুলে বলেছেন, ভারত 'বেইজিংয়ের কাছাকাছি যাচ্ছে' এবং রাশিয়ার জন্য 'লন্ড্রোম্যাটে' [মধ্যস্থতার জায়গা] পরিণত হয়েছে।
এশিয়া গ্রুপ অ্যাডভাইজরি ফার্মের গোপাল নাড্ডুর বলেন, 'ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারগুলোর ওপর। এর মধ্যে দেশীয় বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাশিয়া ও চীন-সংক্রান্ত বিষয়ও।'
তিনি আরও বলেন, 'ভারতের নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের জন্য মন্ত্র হবে—আত্মনির্ভরতা বাড়ানো, বহুমুখী করা এবং কোনো সুযোগ হাতছাড়া না করা।'