রাশিয়ার বিমানঘাঁটিতে হামলার আগে কাঠের ছাউনিতে ড্রোন লুকিয়ে রেখেছিল ইউক্রেন
ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা গতকাল রোববার রাশিয়ার বিমান ঘাঁটিতে কৌশলে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। ইউক্রেনের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, কাঠের তৈরি ছাউনির ছাদের বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন লুকানো ছিল।
ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউ এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। তারা এ অভিযানের নাম দিয়েছে 'স্পাইডারস ওয়েব'। তারা দাবি করছে, এ অভিযানে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউক্রেনীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, রোববার চারটি রুশ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয় এবং এতে ৪১টি রুশ যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ওই কর্মকর্তার মতে, কাঠের ছাউনিগুলো ট্রাকে করে রাশিয়ার বিমানঘাঁটির সীমানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন একটি যন্ত্রের মাধ্যমে ছাউনিগুলোর ছাদ খোলা হয়, ফলে ভেতরে থাকা ড্রোনগুলো উড়ে গিয়ে হামলা চালায়।
এসবিইউ টেলিগ্রাম মেসেজিং অ্যাপে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, এই হামলায় আনুমানিক ৭০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
টেলিগ্রামেই এসবিইউ আরও জানায়, 'রুশ ফেডারেশনের প্রধান বিমানঘাঁটিগুলোতে অবস্থিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী বিমানের ৩৪ শতাংশ এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।'
টেলিগ্রামে একটি বার্তায় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই অভিযানের ফলাফলকে 'চমৎকার' বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি লিখেছেন, 'এটি সম্পূর্ণভাবে ইউক্রেনের নিজের প্রচেষ্টায় অর্জিত একটি সাফল্য।'
জেলেনস্কি আরও জানান, এই অভিযানের প্রস্তুতি নিতে দেড় বছরেরও বেশি সময় লেগেছে। তিনি এটিকে 'আমাদের সবচেয়ে দূরপাল্লার অভিযান' বলে বর্ণনা করেছেন।
ঘটনার কিছুক্ষণ পর রাতে ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, রুশ বিমানঘাঁটিতে হামলায় ১১৭টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে এবং রাশিয়ান বাহিনী 'খুবই উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যা একেবারেই ন্যায্য'।
তিনি বলেন, এসবিইউ এই অভিযানের জন্য রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি-র একটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের একদম পাশেই একটি কমান্ড সেন্টার স্থাপন করেছিল।
জেলেনস্কি আরও জানান, অভিযানের আগের দিনই অভিযানে অংশ নেওয়া সব অপারেটিভকে রাশিয়া থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
রাশিয়ার বিমান ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও
রাশিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হামলার কিছু ভিডিও ও ছবি দেখা গেছে। সেখানে সাইবেরিয়ার ইরকুৎস্ক অঞ্চলের বেলায়া বিমানঘাঁটিতে রাশিয়ার কৌশলগত বোমারু বিমানগুলো আগুনে পুড়তে দেখা যায়। তবে ভিডিও ও ছবিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
আঞ্চলিক গভর্নর ইগর কোবজেভ জানান, বেলায়া বিমানঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত স্রেডনি গ্রামসংলগ্ন একটি সামরিক ইউনিটে ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি ঠিক কোন লক্ষ্যবস্তুতে এই হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ড্রোনগুলো একটি ট্রাক থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়।
রয়টার্সকে দেওয়া ছবিতে ইউক্রেনের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা একটি শিল্প স্থাপনায় স্তূপ করে রাখা অসংখ্য স্বল্পপাল্লার কোয়াডকপ্টার ড্রোন দেখিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা জানান, হামলায় ঠিক এই ধরনের ড্রোনই ব্যবহার করা হয়েছে।
ওই ইউক্রেনীয় কর্মকর্তার শেয়ার করা অন্য কিছু ছবিতে দেখা গেছে, কাঠের ছাউনিগুলোর ধাতব ছাদ সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং ছাদের কাঠামোর ফাঁকা জায়গায় ড্রোনগুলো বসানো আছে।
অন্যদিকে, রুশ টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলোতে পোস্ট হওয়া একটি ভিডিও—যেটির সত্যতা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি—তাতে একই ধরনের ছাউনিগুলো একটি ট্রাকের পেছনে বসানো অবস্থায় দেখা গেছে।
ভিডিওতে ছাউনিগুলোর ছাদ ট্রাকের পাশেই মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর অন্তত দুটি ড্রোন সেই ছাউনির ভেতর থেকে উপরের দিকে উঠে আকাশে উড়ে যেতে দেখা যায়।
ভিডিওটি যেটি রুশ অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাজা প্রকাশ করেছে, তাদের দাবি অনুযায়ী এটি বেলায়া বিমানঘাঁটির কাছাকাছি একটি এলাকায় ধারণ করা হয়েছে।
সাইবেরিয়ার ইরকুৎস্ক অঞ্চলের এই বিমানঘাঁটিতে রয়েছে টুপোলেভ টিইউ-২২এম ধরনের সুপারসনিক দূরপাল্লার কৌশলগত বোমারু বিমান, যেগুলো ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ব্যবহার করে আসছে রাশিয়া।
ইউক্রেনের নিরাপত্তা কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, এই পুরো অভিযান সরাসরি তত্ত্বাবধান করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ-এর প্রধান ভাসিল মালিউক।
যদি এ হামলার সত্যতা নিশ্চিত হয়, তবে এটিই হবে যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেনের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ড্রোন হামলা এবং মস্কোর জন্য একটি বড় ধাক্কা।
ওই কর্মকর্তা একটি ড্রোনে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজও শেয়ার করেছেন, যেটিকে তিনি হামলার একটি দৃশ্য বলে উল্লেখ করেন। ছবিগুলোতে বেশ কয়েকটি বড় আকারের বিমান—যার মধ্যে কিছু সম্ভবত টিউ-৯৫ বোমারু বিমান—আগুনে পুড়ে যেতে দেখা গেছে।
