হাঙ্গেরির চমকপ্রদ নির্বাচনে পেতের ম্যাজিয়ারের জয়ে ইউরোপীয় নেতাদের উচ্ছ্বাস
হাঙ্গেরিতে পেতের ম্যাজিয়ারের অভাবনীয় নির্বাচনি বিজয়ের পর ইউরোপীয় নেতারা তাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। শুধু তিনি কী করবেন তা নয়, বরং তিনি কে নন, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ তিনি হাঙ্গেরির দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান নন এটাই অনেকের জন্য স্বস্তির। অরবানকে অনেকে মহাদেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখতেন।
এই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ২৭ জাতির ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অরবানের প্রতি জমে থাকা গভীর হতাশারই প্রতিফলন।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ লিখেছেন, 'আজ ইউরোপ জিতেছে এবং ইউরোপীয় মূল্যবোধ জিতেছে।' পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লিখেছেন, 'আবার একসাথে! গৌরবময় বিজয়, প্রিয় বন্ধুরা!'
অরবানের ১৬ বছরের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা ইইউ-এর সেই শাসন ব্যবস্থাকে বারবার পরীক্ষায় ফেলেছে, যা বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার পর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংহতির মাধ্যমে শান্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি হয়েছিল। ব্রাসেলসের কৌশলের চেয়ে হাঙ্গেরির জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি তুলে অরবান বারবার সম্মিলিত পদক্ষেপে ভেটো দিয়েছেন, যার মধ্যে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়টি অন্যতম।
সম্প্রতি এই উগ্র-ডানপন্থী নেতার সরকার ইইউ নেতা ও কর্মকর্তাদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে যখন তারা স্বীকার করে যে, শীর্ষ সম্মেলনগুলোর সময় তারা রাশিয়ার সঙ্গে একটি গোপন যোগাযোগ মাধ্যম বা 'ব্যাকচ্যানেল' বজায় রেখেছিল।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ম্যাজিয়ার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে হাঙ্গেরির সম্পর্ক মেরামত করবেন।
তবে তিনি নির্বাচনি প্রচারণার সময় বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া সতর্কভাবে এড়িয়ে গেছেন—যার মধ্যে অরবানের এলজিবিটিকিউ+ বিরোধী নীতি এবং হাঙ্গেরির ইউক্রেনকে আরও সহায়তা দেওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নগুলোও ছিল।
বুদাপেস্টের দানিউব নদীর তীরে বিজয়ী ভাষণে ম্যাজিয়ার বলেন, 'সব হাঙ্গেরীয় জানেন যে এটি একটি সম্মিলিত বিজয়। আমাদের জন্মভূমি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। এটি আবার বাঁচতে চায়। এটি একটি ইউরোপীয় দেশ হতে চায়।'
অরবানের পরাজয় স্বীকার এবং অভিনন্দনের জোয়ার
ম্যাজিয়ার জানান, রোববার রাতে বিজয়ী ভাষণ দেওয়ার আগেই তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তে, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন-এর কাছ থেকে অভিনন্দন বার্তা পেয়েছেন।
অনলাইনেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন, সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের স্পিকার রবার্টা মেটসোলা অভিনন্দন জানিয়েছেন। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন, রোমানীয় প্রেসিডেন্ট নিকুসোর দান এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তাও ম্যাজিয়ারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
স্টারমার বলেন, 'এটি কেবল হাঙ্গেরির জন্যই নয়, ইউরোপীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।' মাঁখো বলেন, 'গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের এই জয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল্যবোধ ও ইউরোপের প্রতি হাঙ্গেরীয় জনগণের প্রতিশ্রুতিকে ফ্রান্স স্বাগত জানায়।'
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস বলেন, 'আসুন একটি শক্তিশালী, নিরাপদ এবং সর্বোপরি ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের জন্য আমরা আমাদের শক্তিকে এক করি।'
ক্রিস্টারসন তার অভিনন্দন বার্তায় ইইউ এবং ন্যাটো উভয়েরই উল্লেখ করে লিখেছেন, 'আমি মিত্র এবং ইইউ সদস্য হিসেবে আপনার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছি। এটি হাঙ্গেরির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।'
স্লোভেনিয়ার উদারপন্থী প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলোব মাগিয়ারকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, 'ডানপন্থী পপুলিজমের বিরুদ্ধে তার এই বিজয় ইইউ এবং এর ভবিষ্যতের জন্যও এক বিশাল বিজয়।'
গোলোব আরও বলেন, 'কেবল একটি আরও ঐক্যবদ্ধ এবং কার্যকর ইইউ-ই সামনের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর জবাব দিতে সক্ষম হবে।'
ইসরায়েলি বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ, যিনি নিজে হাঙ্গেরীয় ইহুদি বংশোদ্ভূত (যাঁরা হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন), তিনিও ম্যাজিয়ারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
অরবানের প্রতিও কিছু সহানুভূতি
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ম্যাজিয়ারকে অভিনন্দন জানালেও অরবানের 'বিগত বছরগুলোর নিবিড় সহযোগিতার' জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
ফ্রান্সের উগ্র-ডানপন্থী রাজনীতিবিদ জর্ডান বারডেলা, যাকে ২০২৭ সালের ফরাসি নির্বাচনে একজন শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে, তিনি এক্স-এ অরবানের পপুলিস্ট কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেছেন। তবে তিনি ম্যাজিয়ারের বিষয়ে কিছু বলেননি।
উরসুলা ফন ডার লিয়েন, যিনি অনেক ইইউ কর্মকর্তার মতো হাঙ্গেরির নির্বাচন নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেওয়া এড়িয়ে চলছিলেন, তিনি এক্স-এ লিখেছেন, 'হাঙ্গেরি ইউরোপকে বেছে নিয়েছে। ইউরোপ সর্বদা হাঙ্গেরিকে বেছে নিয়েছে। একসাথে আমরা শক্তিশালী। একটি দেশ তার ইউরোপীয় পথে ফিরে এল। ইউনিয়ন আরও শক্তিশালী হলো।'
উল্লেখ্য, অরবান ব্রাসেলস-ভিত্তিক ইইউ নির্বাহী বিভাগের সমালোচনা করতেন এবং ফন ডার লিয়েন-এর অনেক এজেন্ডা বারবার আটকে দিতেন।
ইউরোপীয় পিপলস পার্টির প্রেসিডেন্ট ম্যানফ্রেড ওয়েবার, যিনি নিজেও অরবানের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন, 'হাঙ্গেরি আবার ইউরোপের হৃদয়ে ফিরে এসেছে।'
জার্মান আইনপ্রণেতা ড্যানিয়েল ফ্রুয়েন্ড বলেন, 'হাঙ্গেরি বিশ্বকে একটি সংকেত দিচ্ছে'—এবং তিনি সতর্ক করেছেন, অরবানের এই নির্বাচনি পরাজয় বিশ্বজুড়ে পপুলিস্ট নেতাদের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি করবে।
ফ্রুয়েন্ড আরও বলেন, 'অনুদার এবং ইউরোপ-বিরোধী শক্তির আইকন এখন ব্যর্থ হয়েছে—বিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্নীতি এবং তার নিজের তৈরি অন্যায্য নির্বাচনি ব্যবস্থার কারণেই তার পতন ঘটেছে।'
ইউক্রেন তার অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে মাগিয়ারকে অভিনন্দন জানিয়েছে, যেখানে ইউক্রেন ও হাঙ্গেরির দুটি ঐতিহাসিক নদীর উল্লেখ করা হয়েছে। বার্তায় বলা হয়েছে, 'ডিনিপ্রো এবং তিসা একটি ভাগ করে নেওয়া বাড়ি—ইউরোপের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়।'
