ইরান যুদ্ধের জেরে এপ্রিলে রাশিয়ার তেল রাজস্ব দ্বিগুণ হয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের তীব্র সংকট শুরু হয়েছে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সংকটের কারণে এপ্রিলে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় একক তেল কর থেকে আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। এই মাসে দেশটির এই রাজস্ব বেড়ে ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া। ইরান যুদ্ধ থেকে দেশটি অপ্রত্যাশিতভাবে বিপুল আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত রয়টার্সের এই হিসাবটি সেই সুবিধারই প্রথম শক্ত প্রমাণ। তেল ব্যবসায়ীদের মতে, এই যুদ্ধ সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের জন্ম দিয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে হরমুজ প্রণালি একপ্রকার বন্ধ করে দেয় তেহরান। বিশ্বজুড়ে তেল ও এলএনজির মোট সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পার হয়। প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
রাশিয়ার বিশাল তেল ও গ্যাস শিল্পে আয়ের প্রধান উৎস হলো এদের উৎপাদন। এই খাতে দীর্ঘমেয়াদী কর সংস্কার বা 'ট্যাক্স ম্যানুভার' চলছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের শুরু থেকেই অপরিশোধিত তেলের ওপর রপ্তানি শুল্ক শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
প্রাথমিক উৎপাদন তথ্য ও তেলের দামের ওপর ভিত্তি করে এই হিসাবটি করেছে রয়টার্স। এতে দেখা যায়, এপ্রিলে রাশিয়ার তেল উৎপাদন থেকে পাওয়া 'খনিজ উত্তোলন কর' মার্চ মাসের ৩২৭ বিলিয়ন রুবল থেকে বেড়ে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন রুবলে (৯ বিলিয়ন ডলার) দাঁড়াবে। এই আয় গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
২০২৬ সালের পুরো বছরের জন্য এই খনিজ উত্তোলন কর থেকে ৭.৯ ট্রিলিয়ন রুবল আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে রাশিয়া।
রাশিয়ার জ্বালানির প্রবল চাহিদা
রাশিয়ার অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যে একটি নতুন চিত্র উঠে এসেছে। কর নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত রাশিয়ার উরালস ক্রুডের গড় দাম গত মার্চে বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ৭৭ ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এটিই এই তেলের সর্বোচ্চ দাম।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে এই দাম ছিল ৪৪.৫৯ ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ। চলতি বছরের রাষ্ট্রীয় বাজেটে এই তেলের দাম ধরা হয়েছিল ৫৯ ডলার; বর্তমান দাম তার চেয়েও অনেক বেশি।
মঙ্গলবার ক্রেমলিন জানায়, বিশ্বের চরম জ্বালানি সংকটের কারণে তেল ও গ্যাসের বাজার এখন রীতিমতো কাঁপছে। ঠিক এই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে রাশিয়ার জ্বালানির জন্য বিপুল সংখ্যক অনুরোধ আসছে।
তবে রাশিয়ার এই অপ্রত্যাশিত আয়ের একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দেশটির নিজস্ব অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, ২০২৬ সাল রাশিয়ার জন্য বেশ কঠিন একটি বছর হতে পারে। বুধবার দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি ছিল ৪.৫৮ ট্রিলিয়ন রুবল। এই অঙ্ক তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.৯ শতাংশ।
এছাড়া, মস্কোর অর্থনীতি পঙ্গু করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেন। এসব হামলার কারণেও রাশিয়ার আয় কমেছে। পাশাপাশি এটি তেল উৎপাদন কমারও একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
শেষ পর্যন্ত রাশিয়া এই যুদ্ধ থেকে ঠিক কতখানি অপ্রত্যাশিত আয় ঘরে তুলতে পারবে, তা মূলত একটি বিষয়ের ওপরই নির্ভর করছে। আর তা হলো, ইরান যুদ্ধ ঠিক কতদিন স্থায়ী হয়।
