তেলের চড়া দামের মুনাফা পাচ্ছে রাশিয়া, ইউক্রেনও মস্কোর জ্বালানি শিল্পে হামলা জোরদার করছে
ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বিশ্ববাজার এখন চড়া। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদক রাশিয়া তার ফায়দাও পাচ্ছে। আর এই রপ্তানি ব্যাহত করতে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী রাশিয়ার জ্বালানি শিল্পের অবকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করেছে।
গত এক সপ্তাহে ইউক্রেনের ড্রোনগুলো রাশিয়ার একাধিক জ্বালানি তেলের শোধনাগার ও রপ্তানি টার্মিনালে আঘাত হেনেছে। গত বছরের গ্রীষ্মকাল থেকেই রুশ জ্বালানি শিল্পের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান চালাচ্ছে কিয়েভ, যা এখন আরও জোরদার করা হচ্ছে রাশিয়ার বাড়তি রাজস্ব আয়কে বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্য নিয়ে।
অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং অপরিশোধিত তেলের দামের উল্লম্ফনে ক্রেমলিন যখন অপ্রত্যাশিতভাবে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে, তখন কিয়েভ রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত করতে প্রচেষ্টা আরও বাড়িয়েছে।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর দাবি, চলতি মাসে তারা রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ১০টি বড় হামলা চালিয়েছে—যার কিছু রাশিয়ার বেশ অভ্যন্তরে অবস্থিত। এসব হামলার প্রকৃত প্রভাব এখনও স্পষ্ট নয়, তবে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া ইতোমধ্যেই পেট্রল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন এখন আরও কার্যকর হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ হামলার ঘটনা হিসেবে শনিবার ভোরে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী রাশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইয়ারোস্লাভল-এ অবস্থিত একটি বড় তেল শোধনাগারে আঘাত হানার দাবি করেছে। রাজধানী মস্কো থেকে কিছু দূরের ওই স্থাপনায় সরাসরি আঘাতের পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে জানানো হয়।
ইয়ারোস্লাভলের আঞ্চলিক গভর্নর মিখাইল ইভরায়েভ স্বীকার করেন যে, কয়েকটি আবাসিক ভবন ও একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তিনি জানান, হামলায় ব্যবহৃত ৩০টির বেশি ড্রোন প্রতিহতও করা হয়েছে।
বাল্টিক সাগর উপকূলে অবস্থিত রাশিয়ার তেল রপ্তানি টার্মিনাল উস্ত-লুগা-তেও গত সপ্তাহে দুইবার হামলা হয়েছে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার মতে, শুক্রবার ভোরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলায় সেখানে তেল লোডিং স্টেশন ও তেল সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্যাটেলাইট থেকে ভূ-অবস্থানভিত্তিক ভিডিওতে বন্দরটিতে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য দেখা গেছে। হামলার পর কাছাকাছি সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের বাসিন্দাদের 'বায়ুদূষণ' সম্পর্কে সতর্ক করে রাশিয়ার জরুরি মন্ত্রণালয়।
জেলেনস্কি বলেন, "আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার জবাব আমরা দিয়েছি। শক্তিশালী পাল্টা আঘাতের মাধ্যমে উস্ত-লুগার সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছি।"
তিনি আরও জানান, ড্রোন হামলার পর ওই স্থাপনার সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশই অবশিষ্ট রয়েছে।
পাশাপাশি নিকটবর্তী বন্দর প্রিমোরস্কে-ও গত সপ্তাহে হামলা হয়েছে এবং শনিবার পর্যন্ত দুই বন্দরের আগুন জ্বলতে দেখা গেছে বলে ইউক্রেনীয় সূত্র জানিয়েছে।
রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সারাতোভে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি-রসনেফট পরিচালিত একটি শোধনাগারেও গত সপ্তাহান্তে হামলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে যাওয়ার আগে— বিশ্ববাজারে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল অন্যান্য মানদণ্ডের তেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ছাড় দিয়ে বিক্রি করা হতো।
বর্তমানে বিশ্লেষকদের মতে, কখনো কখনো তা প্রিমিয়াম দামে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া, জ্বালানি রপ্তানির ওপর কিছু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় রাশিয়া লাভবান হয়েছে। তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় এ মাসের শুরুতে সমুদ্রে ট্যাংকারে মজুত থাকা রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে।
শনিবার জেলেনস্কি এই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সমালোচনা করে বলেন, রুশ গোয়েন্দারা ইরানকে স্যাটেলাইট চিত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছে।
তিনি বলেন, "যে আগ্রাসী শক্তি প্রতিদিন অর্থ উপার্জন করছে, তার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এদিকে তারা (রাশিয়া) উপসাগরীয় অঞ্চলে মিত্র ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলার তথ্য সরবরাহ করছে।"
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বাজেটের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আয় তেল থেকে আসে। গত এক মাসে এই আয় দ্বিগুণ হয়ে থাকতে পারে।
ইউক্রেনের হামলা অব্যাহত থাকায় রাশিয়া আবারও পেট্রল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা–তাস।
বার্তাসংস্থাটি জানায়, আগামী বুধবার ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হতে পারে এই পদক্ষেপ। এনিয়ে রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও তেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে মস্কোর তরফ থেকে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও জানুয়ারিতে তা প্রত্যাহার করা হয়।
রাশিয়ার সংবাদপত্র কমেরসান্ত জানায়, রপ্তানিতে বেশি লাভ হওয়ায় উৎপাদক কোম্পানিগুলো সেদিকেই পেট্রোল বেশি সরবরাহ করছে। এতে দেশীয় বাজার ও ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়—এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হচ্ছে।
তবে পত্রিকাটি "পরিশোধনাগারগুলোর অনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ" এবং প্রিমোরস্ক ও উস্ত-লুগায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকেও উল্লেখ করেছে।
জেলেনস্কি বলেন, এসব হামলা ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর রাশিয়ার হামলার প্রতিক্রিয়া, যার ফলে শীতকালে ইউক্রেনজুড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেছে।
তিনি বলেন, "রাশিয়াকে আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। তাহলে আমরাও পাল্টা হামলা করব না।"
