যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি: বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল তেলের দাম, এশিয়ায় শেয়ারে দরপতন
ইরান যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তেই সোমবার বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল তেলের দাম। ইসরায়েলের দিকে ইয়েমেনের হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের তেল দখলের ইচ্ছাপ্রকাশের পর জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও প্রবল হচ্ছে।
মে মাসের ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স-এর দাম ৩.২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার বাজারে সোমবার সকালে তা পৌঁছায় ব্যারেলপ্রতি ১১৬.১২ ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এই মাসিক মূল্যবৃদ্ধি একটি রেকর্ড হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাশাপাশি আমেরিকার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ফিউচার্স-এর দরও ৩.৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২.৯৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া এশিয়ায় শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। সোমবার জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচকের দরপতন হয়েছে ৪.৫ শতাংশ, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি-র দরপতন হয়েছে ৩.৫ শতাংশ।
রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ক্ষেত্রে 'তেলের দখল নেওয়াই' তাঁর প্রথম পছন্দ। ভেনেজ়ুয়েলার প্রসঙ্গও টেনে আনেন তিনি। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর সেখানকার তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ কার্যত নিজেদের হাতে নিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানেও একই পথে হাঁটতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
চার সপ্তাহ ধরে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আগ্রাসনের পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে ইরান। গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে ইরানে হামলার আঁচ। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন এ অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহকারী পরিকাঠামো চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আর তার জেরে অপরিশোধিত তেলের দামও লাফিয়ে বাড়ছে।
এরইমধ্যে শনিবার ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধে হুথিদের এমন প্রত্যক্ষ যোগদান এই প্রথম।
হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সমাজমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জানান, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলের একাধিক সংবেদনশীল সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছেন তারা।
হুথিদের এই পদক্ষেপ যুদ্ধের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলল।
ইয়ারদেনি রিসার্চ-এর প্রেসিডেন্ট এড ইয়ারদেনি বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তেলের চড়া দাম ও উচ্চ সুদহার দীর্ঘ দিন বজায় থাকতে পারে বলেও মনে করছেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি লাগাতার অবরুদ্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে মন্দার ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেন ইয়ারদেনি। যুদ্ধে আমেরিকার বৃহত্তর অংশগ্রহণের সম্ভাবনার জেরে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে এই অস্থিরতা চলবে বলেই মত তার।
সোমবার প্রকাশিত একটি নোটে ইয়ারদেনি লিখেছেন, তেল ও বন্ডের বাজার স্থিতিশীল রাখার আগের সব চেষ্টাই কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।
কোয়ান্টাম স্ট্র্যাটেজি-র কৌশলবিদ ডেভিড রোচ বলেন, আমেরিকা আগামী তে আরও আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে পারে বলে বাজার ধরে নিচ্ছে। স্থলসেনা মোতায়েন বা খারগ দ্বীপে ইরানের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্রটি দখলের চেষ্টা করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল এই দ্বীপ দিয়েই রপ্তানি হয়।
রোচ সতর্ক করে বলেন, এমন পদক্ষেপ নিলে ইরানের ডলার আয়ের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে ঠিকই, তবে পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিও আছে। সেক্ষেত্রে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে হামলা চালাতে পারে তেহরান, যা এই সংঘাতকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।
আর তেমনটা হলে, খুব দ্রুত তার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বের সরবরাহ ব্যবস্থায়। এই প্রসঙ্গে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন-এর অরক্ষিত অবস্থার কথা তুলে ধরেন রোচ। প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে পৌঁছায়। হুথিদের শক্ত ঘাঁটি বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে সামান্য বাধা এলেও রপ্তানি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।
রোচ বলেন, বিকল্প পথ হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহার করা হলেও পরিবহনের সক্ষমতা অনেকটাই কমে যাবে। এর জেরে বাজার থেকে দৈনিক প্রায় ৪০-৫০ লাখ ব্যারেল তেল উধাও হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
