ইরান যুদ্ধে সামনে এলো তেল শোধনের দুর্বলতা, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটে নতুন করে গুরুত্ব
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে (যা গতকাল যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে থেমেছে) বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের এক কাঠামোগত দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে।
দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকে (ইআরএল) গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে উল্লেখযোগ্যভাবে আধুনিকায়ন বা সম্প্রসারণ করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত এ জ্বালানি শোধনাগারে সব ধরনের ক্রুড পরিশোধন করা যায় না।
এ সমস্যা নতুন নয়। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় জ্বালানি তেল নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছিল গোটা বিশ্ব। তখন বাংলাদেশও জ্বালানি সংকটে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বিকল্প উৎস হিসেবে তখন রাশিয়ার ক্রুড অয়েল পরিশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইআরএলের ইয়েল্ড প্যাটার্ন এমনভাবে তৈরি যে সেখানে অন্য কোনো ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা সম্ভব হয়নি। ওই সময় করা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছিল।
ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।
এদিকে, কোন ধরনের অপরিশোধিত তেল দেশের জন্য উপযোগী হবে—সে বিষয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) কাছে কারিগরি সুপারিশও চেয়েছে সংস্থাটি।
এছাড়া একটি প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই করছে বিপিসি। পরিবহন ব্যয়সহ যাবতীয় বিষয় বিবেচনা করে নতুন উৎস থেকে ক্রুড অয়েল আমদানির দিকে অগ্রসর হবে সংস্থাটি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমাদের দেশের সবচেয়ে কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্য। অন্য উৎস থেকে ক্রুড সংগ্রহ করতে হলে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। তবে ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের সময় আধুনিক সুবিধা রাখা প্রয়োজন, যেন সংকটের সময় অন্য উৎসের ক্রুড পরিশোধন করা যায়।"
বিকল্প খুঁজছে বিপিসি
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীরা 'ফোর্স মেজর' ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বোঝাই একটি জাহাজ গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পথে যাত্রা করার কথা থাকলেও তা আটকে যায়। জাহাজটির চুক্তি বাতিল করা হয়।
এছাড়া আবুধাবি থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলের আরেকটি চালানও বাতিল করা হয়েছে। ফলে চলতি মাসে অপরিশোধিত তেলের কোনো চালান দেশে আসেনি।
বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আগামী মাসে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে, যেখানে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত ২৫ সেন্ট বেশি ব্যয় হচ্ছে।
ইআরএলের কর্মকর্তারা বলছেন, পাকিস্তান আমলে নির্মিত ইস্টার্ন রিফাইনারি মূলত সৌদি আরব থেকে আমদানি করা অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড (এএলসি) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা মারবান ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করে। রাশিয়ার ক্রুড অয়েল অ্যারাবিয়ান ক্রুডের চেয়ে ভারি হওয়ায় তা পরিশোধনের সক্ষমতা ইস্টার্ন রিফাইনারির মতো পুরোনো স্থাপনার নেই। তবে ব্লেন্ডিং সুবিধা থাকলে অন্য ক্রুডও পরিশোধন করা যেত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএলের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই সংকটের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া বিকল্প উৎস থেকে ক্রুড সংগ্রহ নিয়ে কাজ করছে সরকার। ইআরএল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের ক্রুডের বৈশিষ্ট্য ও স্পেসিফিকেশন বিশ্লেষণ করে বিপিসিকে মতামত দিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়ার বনি লাইট ক্রুড, আজারবাইজানের আজেরি লাইট, নরওয়ের আলভহেইম ব্লেন্ড, অ্যাঙ্গোলার গিনডুঙ্গো এবং যুক্তরাজ্যের ফোর্টিস ব্লেন্ড ক্রুড।
এসব ক্রুডের পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বিশ্লেষণ করছে বিপিসি। এর মধ্যে বিটুমিনসহ বাই-প্রোডাক্ট উৎপাদনে যেন বিঘ্ন না ঘটে, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশনস) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ টিবিএসকে বলেন, "বিকল্প উৎস নিয়ে কাজ চলছে। একটি প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি ঠিক হলেও নতুন উৎসের তেল সরবরাহের লাইন-আপ ঠিক রাখতে হবে।"
সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ
বিপিসির তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি।
প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া পেট্রোল শতভাগ এবং অকটেনের বড় অংশ দেশে উৎপাদন হয়।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়েনি। জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা না বাড়ায় বেশি পরিমাণে ডিজেল আমদানি করতে হয়। ফলে প্রতিবছর বাড়তি ডলার খরচ করতে হচ্ছে সরকারকে।
আর ৩০ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতার ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেতেই দেড় দশক সময় পার হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২৪ কোটি ডলার সাশ্রয় হতো।
২০১০ সালে প্রথমবারের মতো এর দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য গত ২৩ ডিসেম্বর একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পটি নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের অনুমোদন দিলেও সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) এই প্রকল্পে ১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি ঋণ দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
বিপিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী মো. আপেল মামুন টিবিএসকে বলেন, "প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে। নতুন প্রকল্প ডিজাইনের সময় এটি ফ্লেক্সিবল করা হবে। বিভিন্ন ধরনের ক্রুড শোধনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।"
