ট্রাম্পের পুতিনের ওপর ‘রাগের’ কথা জানানোর পর রাশিয়া বলছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ চলছে’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাশিয়ার সমালোচনার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এসেছে মস্কো থেকে। খবর বিবিসি'র।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ তার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, তবে তিনি কোনো বিতর্কে জড়াতে চাননি।
'আপনার উল্লেখ করা মন্তব্যগুলোর কিছু অংশ ব্যাখ্যামূলক ছিল, সেগুলো সরাসরি উদ্ধৃতি নয়,'—ট্রাম্পের সঙ্গে এক এনবিসি নিউজ উপস্থাপকের ফোনালাপের প্রসঙ্গ টেনে বলেন পেসকভ।
তিনি আরও জানান, 'আমরা আমেরিকার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, বিশেষ করে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে, যা আগের [মার্কিন] প্রশাসনের সময় দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পাশাপাশি, আমরা ইউক্রেনের শান্তি প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।'
তবে এই আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন পেসকভ। তিনি জানান, দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে প্রয়োজনে দ্রুত টেলিফোন সংলাপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য
ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম ইয়েভ্রোপেস্কা প্রাভদা জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে আংশিক যুদ্ধবিরতির সময় রাশিয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কিছু জ্বালানি স্থাপনার তালিকা তৈরি করেছিল, যা রাশিয়ার তালিকার সঙ্গে মিলছিল না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনের তালিকায় তেল ও গ্যাস উত্তোলন কেন্দ্রগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা সম্প্রতি রাশিয়ার হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র এখনও রাশিয়ার তালিকা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
'পারস্পরিক হামলা বন্ধের চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সব জ্বালানি অবকাঠামোর তথ্য বিনিময় করেছে এবং একমত হয়েছে,'—ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'এটি বৈদ্যুতিক শক্তি, তেল ও গ্যাস শিল্প, পারমাণবিক ও কয়লা শিল্প এবং বিদ্যুৎ প্রকৌশল-সংক্রান্ত অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।'
একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পর থেকেই রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরকে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ করে আসছে।
কৃষ্ণ সাগরে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে: ক্রেমলিন
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, কৃষ্ণ সাগরে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি জানান, রাশিয়া ও ইউক্রেন পৃথক চুক্তির মাধ্যমে কৃষ্ণ সাগরে নৌ-যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
পেসকভ আরও বলেন, ২০২২ সালে সম্পন্ন হওয়া কৃষ্ণ সাগর শস্য রপ্তানি উদ্যোগের ইউক্রেন-সংক্রান্ত অংশ বাস্তবায়িত হলেও রাশিয়া-সংক্রান্ত অংশ কখনো পূরণ হয়নি। 'এই কারণেই আলোচনায় এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে,'—জানান তিনি।
ট্রাম্পের রাশিয়ার ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি—এর মানে কী?
ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হলে রাশিয়ার ওপর 'সেকেন্ডারি ট্যারিফ' আরোপ করা হবে।
'যদি রাশিয়া ও আমি ইউক্রেনে রক্তপাত বন্ধের জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারি এবং আমি যদি মনে করি যে, এটি রাশিয়ার দোষ, তাহলে আমি রাশিয়া থেকে আসা সব তেলের ওপর সেকেন্ডারি শুল্ক আরোপ করব,'—এনবিসি নিউজকে বলেন ট্রাম্প।
তিনি আরও জানান, 'এর অর্থ হচ্ছে, যদি কেউ রাশিয়া থেকে তেল কিনতে চায়, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা করতে পারবে না।'
ট্রাম্প জানান, 'সব তেলের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে এটি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।'
সেকেন্ডারি ট্যারিফ কী?
কোনো সরকার যখন বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করে, তখন এটি আমদানিকৃত পণ্যের ওপর এক ধরনের কর হয়ে দাঁড়ায়। কার্যত, এটি পণ্যের জন্য একটি প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করে।
ট্রাম্প রাশিয়ার তেল ক্রয়কারী দেশগুলোর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা পণ্যের ওপর ২৫% থেকে ৫০% শুল্ক বসানোর হুমকি দিয়েছেন। রাশিয়ার প্রধান তেল ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে চীন ও ভারত।
২০২২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সব রাশিয়ান জ্বালানি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক পরিকল্পনা রাশিয়ার জন্য তেল বিক্রি আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
ট্রাম্পের ক্ষোভের কারণ
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর 'খুব ক্ষুব্ধ' বলে মন্তব্য করেন, তখন তিনি মূলত পুতিনের এক সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন।
পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জাতিসংঘের সহায়তায় ইউক্রেনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরিয়ে শান্তি আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।
পূর্ব তিমুর, নিউ গিনি ও প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ার কিছু অঞ্চলে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের উদাহরণ টেনে পুতিন বলেন, 'এই ধরনের অনুশীলন বিদ্যমান।'
ইউক্রেনে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করা ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম অঙ্গীকার। তিনি বলেন, 'আমি প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেই এটি মিটমাট হয়ে যাবে।'
এদিকে সুইডিশ সরকার ইউক্রেনের জন্য ১৬ বিলিয়ন ক্রোনার (প্রায় ১.২ বিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের নতুন সামরিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা দেশটির এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা উদ্যোগ।
সুইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাল জনসন জানান, এই প্যাকেজে বিমান প্রতিরক্ষা, কামান, উপগ্রহ যোগাযোগ ও নৌ-সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া, ইউক্রেনকে সামরিক উপকরণ সরবরাহে উৎসাহিত করতে একটি 'রপ্তানি গ্যারান্টি' চালু করা হবে।