মাছ কাটা যাদের পেশা
রাকিব সবে ১৩ বছরে পা দিয়েছে। প্রায় ছয় মাস ধরে সাতক্ষীরা সদরের সুলতানপুর বড় বাজারে মাছ কাটে সে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত স্কুলে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগ কম থাকায় বাবা-মা তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কাজে পাঠান।
মাছ কাটা কঠিন কাজ—ধারালো বটির সামনে হাত চালাতে সাহস লাগে। তবু মহাজনের কাছ থেকে দেখে দেখে ছয় মাসেই কাজটা রপ্ত করে ফেলেছে রাকিব। বাজারের ভিড়ে বিশাল বটির সামনে একের পর এক কাঁকড়া কেটে চলেছে সে—বিরাম নেই। সেই ফাঁকেই কথায় কথায় শোনা হলো খুদে রাকিবের গল্প।
মা-বাবা, দুই ভাইবোন মিলে রাকিবের পরিবারে সদস্য পাঁচজন। বাবা-মা দুজনেই রোজগেরে, তবু সংসারে অভাব লেগেই থাকে। ছেলের চঞ্চল স্বভাব আর পড়াশোনায় অনীহা যেন তাদের পক্ষেই যায়—পরিবারে আরেকজন উপার্জনক্ষম হাত তৈরি হয়। 'গরিবের ছেলে কাজ করেই যখন খেতে হবে, তবে এখনই কেন নয়?'—এই ভাবনায়ই হয়তো সিদ্ধান্ত।
রাকিবের মহাজন তারই প্রতিবেশী। তিনি জানান, রাকিব শুরুতেই বেশ ভালোমতো কাজ শেখে। তবে কথা বেশি বলার ফুরসত মিললা না। একেরপর এক মাছ এসেই চলেছে।
রাকিব ২০ টাকা কেজি দরে মাছ কাটে। তবে মাছের ধরন অনুযায়ী রেট বদলায়—ট্যাংরা মাছ কেজিপ্রতি ৬০ টাকা লাগে, আর রুই, মৃগেল, সিলভার কার্প কাটা যায় ২০ টাকা কেজিতে। সব মিলিয়ে রাকিবের দৈনিক আয় এখন প্রায় ৪০০ টাকার মতো।
মহাজন বললেন, মাছ ব্যবসা অনেকটাই জুয়ার মতো—কখনো বিক্রি ভালো, কখনো কম। কিন্তু যারা মাছ কাটেন তাদের লোকসান হয় না, কারণ প্রতিদিনই কেউ না কেউ মাছ কেটে নেন। বেনাপোল এলাকা থেকে শুরু হওয়া এই পদ্ধতি এখন সাতক্ষীরা-খুলনা-যশোরসহ আশপাশের এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। তবে বাজারে 'পজিশন' পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। রাকিবের সে সামর্থ্য এখনো নেই। তাই যেসব বিক্রেতা আগে উঠে যায়, তাদের জায়গা ফাঁকা হলে সেখানেই বসে পড়ে সে—পজিশনের আলাদা টাকা দিতে হয় না।
না দেখেই মাছ কাটেন নবীজান
মাছের জেলা হিসেবে সাতক্ষীরার পরিচিতি অনেক পুরনো। লবণাক্ত নদী, মাছের ঘের—সব মিলিয়ে দক্ষিণের এই অঞ্চল এক বিশাল মাছের ভাণ্ডার। হাজারো মানুষের জীবিকা চলে মাছকে ঘিরে। কেউ মাছ কাটে, কেউ বিক্রি করে, কেউ প্রক্রিয়াজাত করে। সেই সব মানুষেরই একজন নবীজান।
প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছ কেটে সংসার সামলাচ্ছেন তিনি। স্বামী মারা যাওয়ার পর এই দক্ষ হাতই আশ্রয় হয় সাত সন্তানের। সেই থেকে মাছ কাটায় বিরাম নেই নবীজানের—বটি আর মাছ যেন তার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে।
বয়স হয়েছে এখন। চোখেও ভালো দেখেন না। কিন্তু তাতে খুব বেশি অসুবিধা হয় না। রোজকার অভ্যাসে না দেখেই কাটতে পারেন ছোট থেকে বড় নানা জাতের মাছ। দ্রুত কাটার জন্য বাজারে তার সুনাম আছে—সবচেয়ে কম সময়ে মাছ কাটতে পারেন তিনি। বারো মাসই তার হাতে লেগে থাকে মাছের আঁশটে গন্ধ। গন্ধই যেন জীবনের সঙ্গী হয়ে গেছে তার।
মাছ কেটেই ৪ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন নবীজান। এখন ছেলেরাও রোজগার করে। ফলে তার কাজ না করলেও চলে। তবু দুঃসময়ের সাথে এই আঁশ, বটি আর আঁশটে গন্ধের নেশা যেন তিনি ছাড়তে পারেন না আর।
নবীজান প্রতিদিন আয় করেন প্রায় ১,০০০–১,২০০ টাকা। পজিশন বাবদ বাজারে ২০০ টাকা দিতে হয়, বাকি থাকে তার হাতে। বললেন, "এখন আয় ভালো, কিন্তু প্রথম দিকে এমন ছিল না। তখন বাজারে মাছ কাটাতে লোক আসতও কম, বেশিরভাগ বাড়ির মেয়েরাই মাছ কাটত। সময়ের সাথে পেশা বদলেছে, কাজ বেড়েছে, সাথে রোজগারও।"
নবীজান ছোট মাছ কেজিপ্রতি ৪০–৬০ টাকা, আর বড় মাছ কেজিপ্রতি ১০–৩০ টাকা নেন। তিনি স্বাধীনভাবে মাছ কাটেন—কোনো নির্দিষ্ট মহাজন নেই। তবে বাজারে এমন অনেকে আছেন যারা মহাজনের সাথে চুক্তিতে কাজ করেন। তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট টাকায় কাজ পান, তবে লাভ বেশি হলে মুনাফার অংশ দিতে হয়।
বটির কারিগর: ঢাকা শহরের এক চিলতে স্বস্তি
রাজধানী ঢাকা—যেখানে সময় মানেই টাকা, আর প্রতিটি মুহূর্তে ব্যস্ততা। নাগরিক জীবনের এই অবিরাম দৌড়ে মাছে-ভাতে বাঙালির পাতে মাছ তোলা অনেকের জন্যই বিরাট ঝক্কি। তার ওপর যদি সেই মাছ আবার বাসায় এনে নিজের হাতে কাটতে হয়, তবে কর্মজীবী পরিবারের ভোগান্তি আরও বাড়ে।
ঢাকাবাসীর এই ঝামেলা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন বাজারে বসা পেশাদার মাছ কাটিয়েরা। সামান্য খরচে তারা মাছ কেনা থেকে রান্না পর্যন্ত মাঝের সবচেয়ে কঠিন ধাপটুকু সহজ করে দেন। মাছ কাটার এই পেশাটা তাই শহুরে ব্যস্ত জীবনে এনে দিয়েছে ছোট্ট এক স্বস্তি।
ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ঘাটপাড়ে মাছ কাটেন সালিহা আক্তার। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কাজের সাথে আছেন। আগে শুধু মাছ কেটেই সংসার চলত, এখন পাশাপাশি একটি ছোট চায়ের দোকানও চালান তিনি। স্বামী রিকশাচালক—একজনের আয় দিয়ে সংসার সামলাতে টানাপোড়েন লেগেই থাকত। তাই নিজের হাতে তুলে নিলেন বটি।
কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়নি। ছোটবেলা থেকেই মায়ের সাথে হাতে হাতে মাছ কাটা শিখেছেন। "বাঙালি ঘরের গেরস্ত মেয়ে-বৌ মাছ কাটা না জানলে চলে?"—হাসিমুখে বলতে বলতে নিজের গল্প শোনালেন সালিহা আক্তার।
আছে অনিশ্চয়তাও
মাছ কাটায় আয় ভালোই। মূলধন বলতে একখানা বটি—মাঝেমধ্যে ধার দিলেই চলে। তবে প্রতিদিন রোজগার একরকম থাকে না, জানালেন সালিহা আক্তার।
শুক্রবার সকালে বসে দুপুরের আগেই সাত থেকে আট শ টাকা উঠে যায়। সেদিন দম ফেলার ফুরসতও মেলে না তার। আবার মাছের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও অনেকেই সেসময় বেশি করে মাছ কেনেন। ঈদ, পহেলা বৈশাখেও কাটাকাটির কাজ বাড়ে।
তবে অন্যদিনগুলোতে অবস্থা মাঝারি থেকে কম। কখনো সারাদিনে দুই-তিন শ টাকাই ভরসা। মাছের সিজন বুঝে কাজ ধরতে পারলে বাড়তি রোজগার হয়। সারাদিনে কমবেশি খরিদ্দার থাকে এই পেশাদার মাছ কাটিয়ের। তবে সন্ধ্যার পর হাতেগোণা কিছু বাঁধা খরিদ্দার আছে তার। অফিস ফিরতি এসব মানুষ কিছুদিনের ব্যবধানে মাছ কাটায় তার থেকে।
সালিহা যখন শুরু করেছিলেন, কেজি পাঁচ টাকায় মাছ কাটতেন। এখন কেজি ২০ টাকা থেকে ৪০/৫০ টাকা পর্যন্ত নেন। ঘাটপাড় এলাকায় তাকে সবাই চেনে। দশ-বারো বছরের অভিজ্ঞতায় এখনো কোনোদিন হাত কাটেননি। তবুও পেশায় অনিশ্চয়তা আছে বলেই চায়ের দোকান খোলেন। এলাকায় বিয়েবাড়ি বা অনুষ্ঠানের সময় মাছ কাটার ডাক পড়ে তার।
পিছিয়ে নেই পুরুষরাও
মাছ কাটার পেশায় শুধু নারীই নন। পুরুষরাও যুক্ত হচ্ছেন নতুন করে। শরিফুল তাদেরই একজন। রাজধানীর কুরিল বিশ্বরোডের কুড়াতলী এলাকায় মাছ কাটেন তিনি। অভিজ্ঞতা ছয় বছরের। এলাকায় কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় ছাত্ররাই তার বড় কাস্টমার।
মাছের আকার অনুযায়ী কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা নেন শরিফুল। ছোট মাছ কাটতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে বলে আগে সেগুলো নিতেন না। এখন ছোট মাছের খরিদ্দার বেশি হওয়ায় আর এড়িয়ে যান না। প্রায় ২০ ধরনের মাছ কাটতে পারেন তিনি। গ্রামের বাড়ি গাজীপুর। আগে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। এক দূর সম্পর্কের ভাইয়ের কাছ থেকে এই ব্যবসার ধারণা পান। মাছ কাটার পেশায় এখন স্বচ্ছল—শারীরিক কষ্টও আগের তুলনায় কম।
কুড়াতলী এলাকার মাছ ব্যবসায়ী আলমগীর রহমান বাবলুও মাছ কাটায় দক্ষ। বিশাল মাছের দোকান তার। তবে মাছ কেটে আলাদা পয়সা নেন না। দোকান থেকে কিনলে তিনি বিনা মূল্যে কেটে দেন। বাড়ি বরিশালে। মাছের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছেলেবেলা থেকেই। কিন্তু বরিশালে কেনাবেচার খাটুনি বেশি, আয় কম—তাই ২৫ বছর আগে ঢাকায় আসেন। ব্যবসা বড় হয়েছে ধীরে ধীরে।
তার ভাষায়, "সৃষ্টিকর্তার রহমতে ব্যবসা এখন ভালো।" ক্রেতারা উপকার পেলে তিনিও খুশি।
মাছ কাটার এই পেশা একসময় প্রান্তিক মানুষের উপার্জনের ক্ষুদ্র পথ ছিল। এখন তা বহু মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস। আঁশটে গন্ধভরা জীবনের পরও তাদের মুখে ক্লান্তির তুলনায় তৃপ্তির রেখাই স্পষ্টতর। কারণ প্রতিটি বটির চলায় লুকিয়ে থাকে চাল-ডাল ওঠার হিসাব, সন্তানের খরচ, ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সাতক্ষীরা থেকে ঢাকা—সবখানেই মাছ আর মানুষের জীবনের গল্প জড়িয়ে আছে গিঁটের মতো।
ছবি: অনুস্কা ব্যানার্জী