কালীগঞ্জে ২৬০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা: জামাই-শ্বশুরের বড় মাছ কেনার ‘মর্যাদার লড়াই’!
পৌষের হাড়কাঁপানো কনকনে শীত উপেক্ষা করে ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনীরাইল এলাকা। উপলক্ষ—প্রায় ২৬০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। স্থানীয়ভাবে এটি 'জামাই মেলা' নামে সর্বজনীন পরিচিতি পেয়েছে। পঞ্জিকা অনুযায়ী পৌষ সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবকে ঘিরে আয়োজিত এই মিলনমেলা এখন উত্তর জনপদের অন্যতম বৃহৎ উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মেলার মূল আকর্ষণ বিশাল আকৃতির সব মাছ। কয়েকশ বছরের রীতি অনুযায়ী, এই মেলা উপলক্ষে আশপাশের গ্রামের জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসেন। আর মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে নেওয়াটা এখানে আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক। শুধু জামাইরাই নন, শ্বশুররাও মেতে ওঠেন বড় মাছ কিনে জামাইকে আপ্যায়ন করার প্রতিযোগিতায়—যেন এক ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ মর্যাদার লড়াই।
মেলায় বড় মাছ দরদাম করছিলেন স্থানীয় এক জামাই সৈকত হোসেন। তিনি বলেন, 'আমি এবারই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে মাছ নিয়ে যাব। তাই সেরা মাছটা কেনার চেষ্টা করছি। ১৮ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ পছন্দ হয়েছে। বিক্রেতা দাম চেয়েছেন ২২ হাজার টাকা। জামাই হিসেবে এই বড় মাছটি নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতে পারাটা একটা আলাদা গর্বের বিষয়।'
মেলায় শত শত দোকানে মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা বিশাল আকৃতির মাছ নিয়ে হাজির হয়েছেন। মেলায় রুই, কাতল, বোয়াল, আইড়, বাঘাইড়, চিতল, কালী বাউশ, পাবদা, গুলশা, গলদা চিংড়ি, বাইম, কাইকলা ও রূপচাঁদাসহ নানা দেশি-বিদেশি প্রজাতির মাছের সরবরাহ দেখা গেছে।
সিলেটের বড়লেখা থেকে আসা মাছ বিক্রেতা শৈবাল দাস জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি। তবে কিছু বিক্রেতার মতে, ভিড় বেশি থাকলেও সেই তুলনায় বেচাকেনায় কিছুটা মন্দা ভাব আছে।
আয়োজকদের মতে, দিন শেষে এই মেলায় প্রায় দুই কোটি টাকার উপরে মাছ বিক্রি হয়। ময়মনসিংহ থেকে আসা বিক্রেতা সিয়াম হোসেন জানান, 'এই মেলার সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে মাছ বিক্রির পাশাপাশি উৎসবের আমেজটাই বড়।'
মেলায় ক্রেতা–দর্শনার্থীর ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন আয়োজকরা। ঢাকার উত্তরা থেকে আসা দর্শনার্থী মোহাম্মদ আলী বলেন, 'এটি শুধু মাছের মেলা নয়, হাজারো মানুষের মিলনমেলা। এই ঐতিহ্য দেখতে প্রতিবছরই আসি।'
মাছ ছাড়াও মেলায় বসেছে আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি ও কুটির শিল্পের কয়েকশ দোকান। বিশেষ করে চমচম, রসগোল্লা ও নিমকি-মোরালির দোকানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। গ্রামীণ ঐতিহ্য বজায় রাখতে মেলায় আয়োজন করা হয়েছে পুতুল নাচ, নাগরদোলা ও লাঠি খেলার।
আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া এই মেলা কোনো একক ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সব ধর্মের মানুষের সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ সংক্রান্তিতে শুরু হওয়া এই মেলাটি সময়ের বিবর্তনে এখন ৩০ তারিখে বড় পরিসরে আয়োজিত হয়।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও বিনীরাইলের মাছের মেলা আজও তার স্বকীয়তা ও জৌলুস ধরে রেখেছে। এটি গাজীপুর জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি আলী হোসেন বলেন, 'কালক্রমে মেলাটি মাছের ও মিষ্টির মেলা হিসেবে পরিচিত হয়েছে। মেলাটি জামাই মেলা নামেও পরিচিত। মেলার নিরাপত্তার জন্য সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আশা করছি মেলাটি শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকবে।'
