‘জুলাই যোদ্ধা’ সুরভীর রিমান্ড বাতিল ও ৪ সপ্তাহের জামিন, তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দায়ের করা একটি চাঁদাবাজি মামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও 'জুলাই যোদ্ধা' হিসেবে পরিচিত তাহরিমা জান্নাত সুরভীর দুই দিনের রিমান্ড আদেশ বাতিল করে চার সপ্তাহের জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।
একই সঙ্গে আসামির বয়স নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (আইও) সশরীরে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ছয়টার দিকে গাজীপুরের দায়রা জজ আদালতের বিচারক অমিত কুমার দে এই আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুরভীর আইনজীবী ও গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান কামাল।
আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'দুপুরে নিম্ন আদালতের দেওয়া দুই দিনের রিমান্ড আবেদনের বিরুদ্ধে আমরা দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়ের করি। পরে বিজ্ঞ আদালতের বিচারক শুনানি শেষে আসামির বয়স ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রিমান্ড আদেশ বাতিল করেন। একই সঙ্গে আমার জিম্মায় আসামির চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।'
এদিকে, সুরভীর বয়স নিয়ে আদালতে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ ফজলুল মাহদির আদালত।
আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, মামলার শুনানিকালে আসামিপক্ষ সুরভীর বয়স ১৮ বছরের নিচে বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দাবি বা আইনি আপত্তি তোলেনি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামি অপ্রাপ্তবয়স্ক মর্মে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন আদালতের নজরে এসেছে।
এমতাবস্থায় আসামির প্রকৃত বয়স নিয়ে চরম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, যাকে তদন্তকারী কর্মকর্তার 'চরম গাফিলতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা' বলে অভিহিত করেছেন আদালত। মামলার সুষ্ঠু বিচার ও আইনি প্রক্রিয়ার স্বার্থে আসামির সঠিক বয়স নির্ধারণ জরুরি বলে মনে করেন বিচারক।
আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আগামী ৩ (তিন) কার্যদিবসের মধ্যে আসামির মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা অনলাইন ভেরিফাইড জন্মনিবন্ধন সনদসহ সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়ে বয়সের এই অসঙ্গতির বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।
এর আগে, গত ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিজ বাসা থেকে সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। টঙ্গী এলাকার সেলিম মিয়ার মেয়ে সুরভী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ও 'জুলাই যোদ্ধা' হিসেবে পরিচিত। গ্রেপ্তারের সময় তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। পুলিশ তাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সে সময় পুলিশের সাথে কয়েকজন সাংবাদিককেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, সুরভীর বিরুদ্ধে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেছেন নাঈমুর রহমান দুর্জয় নামে এক সাংবাদিক। এজাহার অনুযায়ী, ২৫ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে (২৬ নভেম্বর) কালিয়াকৈর থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়। মামলার বাদী নাঈমুর রহমান দুর্জয় ঢাকার বাসাবো শাহীবাগ এলাকার সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে এবং তার স্থায়ী ঠিকানা কিশোরগঞ্জে। তিনি নিজেকে 'বাংলাদেশ প্রতিদিন'-এর সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
এদিকে মামলার বাদীর একাধিক অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই অডিওতে বাদীকে সুরভীকে অনৈতিক কাজের প্রস্তাব দিতে শোনা যায়। আন্দোলনকারীদের দাবি, সুরভী ওই অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাকে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
আইনজীবী ও জুলাই যোদ্ধাদের দাবি, সুরভীকে এজাহারে ২১ বছর উল্লেখ করে প্রাপ্তবয়স্ক দাবি করা হলেও বাস্তবে তার বয়স ১৭ বছর ১ মাস। গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামাল বলেন, 'সুরভীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি। আমরা আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ চাইব এবং রিমান্ড বাতিলের আবেদন করব। তার বয়সের প্রমাণাদি আদালতের সামনে তুলে ধরা হবে।'
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালিয়াকৈর থানার এসআই ওমর ফারুক বলেন, 'আমরা ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলাম, আদালত ২ দিন মঞ্জুর করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বয়স সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ আদালতে জমা দেওয়া হবে।'
গ্রেপ্তার হওয়ার ১১ দিন পার হলেও কেন এখনো বয়স যাচাই করা হয়নি, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন জানান, এজাহারে বয়স ২১ বছর থাকায় তারা আলাদাভাবে খোঁজ নেননি। তবে এখন বিতর্ক ওঠায় জন্মনিবন্ধন যাচাই করা হচ্ছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শরীফ উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, 'মামলাটি আমার দায়িত্ব নেওয়ার আগের। বিষয়টি আমি জেনেছি। কোনো ধরনের অবিচার যেন না হয়, সেটি আমি ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করছি। আশা করছি একটি ন্যায়সংগত সমাধান হবে।'
