চায়না স্টিম আয়রনের বিপরীতে বাংলা আয়রনের শেষ সময়!

ঊনত্রিশ বছরের সুরহাবের মনে খুব দুঃখ। দেখতে তিনি মন্দ নন, কাজও জানেন ভালো, অথচ বিয়ের চিন্তাভাবনা করতে পারছেন না। কারণ বেতন পান মোটে ষোল হাজার টাকা। এই টাকায় বাবা-মা ও নিজের খরচ চালিয়ে বেশি কিছু আর বেঁচে থাকে না।
কাজ শিখেছিলেন দক্ষিণ মৈশুন্ডির এক কারখানায়, তাও আজ পনের বছর হয়ে গেল। সে সময় কারখানাটিতে আঠাশ জন লোক কাজ করত। দিনরাত কাজ করেও চাহিদামতো আয়রন (ইস্ত্রি) সরবরাহ করতে পারত না তারা।
আজ দুই বছর হলো সুরহাব ওয়াইজঘাটের 'টাইগার ইলেকট্রিক কোম্পানিতে' এসেছেন। মালিককে দুই দফা বেতন বাড়াতে বলেছেন। কিন্তু মালিকের সাধ্য নেই। কারণ লোহার ইস্ত্রির চাহিদা নেই বললেই চলে। বিশেষ করে চীনের তৈরি স্টিম আয়রন আসার পরে এই ব্যবসায় ধস নামে।
কারখানার যিনি ওস্তাদ বা মালিক, তার নাম আবু বকর। তার আয়রনের বেশ সুনাম আছে নবাবপুর আর ওয়াইজঘাটের ইলেকট্রিক দোকানগুলোতে।

আয়রন কারখানায় পরিশ্রম অনেক বেশি। ঝুঁকিও কম নয়। সুরহাব নিজেও দফায় দফায় ইলেকট্রিক শক খেয়েছেন। তাই প্রথম যারা কাজ শিখতে আসে, তাদেরকে এক বছর কেবল বসে বসে দেখতে হয়—কীভাবে নাট-বল্টু-স্ক্রু লাগাতে হয়, হাতুড়ি ঠুকতে হয়, ড্রিল করতে হয়, লেদ মেশিনে কাটতে হয়, হ্যান্ডেলে ক্যাপ বসাতে হয়, প্লাগে পিন জুড়ে দিতে হয় ইত্যাদি সব কাজ।
আবু বকর পুরো সাত বছর হেলপারি করেছেন। সেই এরশাদ আমলে, চুরাশি নয়তো পঁচাশি সালে, যখন তার বয়স ছিল পনের, চাচা তাকে যাত্রাবাড়ির এক কারখানায় কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সাত বছর সে কাজ করেছে পেটে-ভাতে।
সে সময়ে মাসে ৭০০ টাকা বেতন ধরা হয়েছিল তার। তারপর যখন দক্ষ হয়ে উঠলেন, মজুরি গোনা হলো সপ্তাহপ্রতি ১২০০ টাকা। এভাবে করে এক পর্যায়ে ২০০০ টাকায় বৃদ্ধি পায় সেটি।
তারপর নিজের কারখানা দিলেন। আবু বকরের দুই ছেলে, এক মেয়ে। সবাই বাড়িতে থাকে। তিনি ঢাকায় একটি মেসে থাকেন। আগে থাকতেন কারখানাতেই। কিন্তু এখন বয়স হয়ে গেছে পঞ্চাশের বেশি, তাই এসব ধকল সহ্য হয় না।

আবু বকরের কাছে জানলাম, ইস্ত্রিতে থাকে কাঠের হ্যান্ডেল, ক্যাপ, স্ক্রু, নাট, বল্টু, পিন, অ্যাডজাস্টার, প্লাগ, কয়েল আর ঢালাই লোহা। সবগুলো উপকরণ নিজের কারখানায় তৈরি করার সুযোগ নেই, বরং প্রতিটির আলাদা আলাদা কারখানা আছে।
চাহিদামতো তারা শনিবারে উপকরণ দিয়ে যায়, বৃহস্পতিবারে দাম নিয়ে যায়। সবগুলো উপকরণ পেয়ে গেলে পরে নিজের কারখানায় বসে জোড়া দেন আবু বকর।
এই জোড়া দেওয়ার ওপরই ওস্তাদের ওস্তাদি প্রকাশ পায়। হ্যান্ডেলে ক্যাপ ঢোকানো বা প্লাগে পিন ঠিকমতো বসানো দীর্ঘ অভিজ্ঞতা না থাকলে পারা যায় না। তাছাড়া একসঙ্গে শক্তি আর ধৈর্যও লাগে।
আবু বকরের কারখানারও নিজস্ব ছাঁচ আছে, যা সব কারখানারই থাকে। এ ছাঁচ তৈরি হয় অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে। ছাঁচের ওপর বালি ঢেলে, তার ওপর গরম লোহা ঢেলে দিলে আকৃতি পেয়ে যায়। তারপর তা পালিশ বা মসৃণ করা হয়।

যাত্রাবাড়িতে আবু বকরের ওস্তাদের বেশ কারখানা ছিল। সপ্তাহে তখন ৫০০ ইস্ত্রি তৈরি করতেন।
তখন বড় বড় কারখানা ছিল নাজিরাবাজার, সিদ্দিকবাজার, টিপু সুলতান রোড, আলুবাজার, দোলাইরপাড় ইত্যাদি জায়গায়। লোহার ইস্ত্রির চাহিদা কমে যাওয়ায় যাত্রাবাড়ির কারখানা বন্ধ করে দিয়ে আবু বকরের ওস্তাদ সোয়েব আলী নারিন্দায় কাছে একটি ছোট কারখানা করেছিলেন।
সেখানেও আবু বকর কাজ করেছেন দুই বা আড়াই বছর। এখন তার নিজের কারখানায় সপ্তাহে শ খানেক ইস্ত্রি তৈরি করেন।
নবাবপুরে চায়না স্টিম আয়রনের সঙ্গে লোহার আয়রন ('বাংলা মাল' বলে বেশি পরিচিত) বিক্রি করে কয়েকটি দোকান। তার মধ্যে একটি ভূঁইয়া ইলেকট্রিক। সেটির মালিক খলিল ভূঁইয়া। ধোলাই খালে তার চাচাতো ভাইয়ের ইস্ত্রি কারখানা ছিল।

বলছিলেন আটাশি সালের কথা। খুব দুরন্ত ছিলেন খলিল। তাই ভাই বাড়ি গিয়ে বলল, 'খলিলকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে পড়াব, সে সঙ্গে কাজও শেখাব।'
তখন খলিলের বয়স এগারো অথবা বারো। ভাই তাকে কাছের একটি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে খলিলের বেশি ভালো লাগত কারখানায় থাকতে।
সে কাজও শিখে নিয়েছিল দ্রুতই। একানব্বই সালে তাকে কারখানার ফোরম্যান করে দেওয়া হয়।
খলিল বললেন, 'ফোরম্যান হলো কারখানার রাজা। কর্মীদের হাজিরার হিসাব রাখা, উপকরণ বুঝে নেওয়া, রেডি প্রডাক্ট সময়মতো সরবরাহ করা—সবই ফোরম্যানের দায়িত্বে থাকে।'
২০০৫ সালের দিকে তার ভাই কারখানা থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবতে থাকেন। তখন খলিল নিজেই কারখানা কিনে নেওয়ার সাহস দেখান। কারখানার মালিক হওয়ার পর তিনি আরও কিছু কর্মী নিয়োগ দেন। তখনো বাংলা মালের বাজার ভালো ছিল।

খলিলের কারখানাতেই প্রথম কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সুরহাব। সেখানে এক যুগ কাজ করার পর আড়াই বছর আগে তিনি আবু বকরের কারখানায় আসেন।
খলিলের কারখানাও আগের মতো নেই। এখন মাত্র দুইজন কর্মী সেখানে কাজ করেন। দোকান থেকে পাওয়া উপার্জনই তার প্রধান সম্বল। কারখানা থেকে সেভাবে উপার্জন হয় না। যা আয় হয়, তা কর্মীদের বেতনেই চলে যায়।
তবে নিজের দোকান আছে বলে কিছু বাংলা মাল বিক্রি করার সুযোগ পান খলিল। কিন্তু আগের মতো আর চাহিদা নেই।
বাংলা মাল এখন কারা কেনেন? জানতে চাইলে আবু বকর বলেন, 'যারা গরিব, পুরান লোক, তারাই এগুলো কেনেন।'
অর্থটা পরিস্কার না হওয়ায় আরেকটু বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'চায়না স্টিম আয়রনের দাম শুরু হয় ২৫০০ টাকা থেকে, আর বাংলা মালের দাম ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। যাদের সামর্থ্য বেশি, তারা স্টিম আয়রন কেনেন। কারণ এটি ওজনে হালকা এবং বোতাম টিপে দিলেই নির্দিষ্ট ছিদ্রগুলো দিয়ে পানি ঝরে পড়ে।'

অন্যদিকে বাংলা মালের বড় সমস্যা হলো এর ওজন। এখনকার বাংলা আয়রনের ওজন সাধারণত ৩ কেজি। আগে ৭–৮ কেজির আয়রনও পাওয়া যেত।
আগে লন্ড্রি ও টেইলার্স বাংলা মালের বড় সংগ্রাহক ছিল। গার্মেন্টসেও প্রচুর সংখ্যায় ইস্ত্রি লাগত। কিন্তু এখন সবাই স্টিম আয়রন ব্যবহার করতে চায়।
বাংলা মালের চাহিদা কতটা কমেছে? এ প্রশ্নের জবাবে আবু বকর বলেন, 'অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।' তবে তিনি এটাও জানান যে, বাংলা আয়রনের বিশেষত্ব হলো—এ দিয়ে কাপড় বেশি টানটান হয় এবং ইস্ত্রি মিহিন হয়।
কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কর্মীরা এখন কী করছেন? জানতে চাইলে আবু বকর বলেন, 'অনেকেই দোকান দিয়েছে, কেউ ভ্যান চালায়, কেউ বাড়ি ফিরে হাঁস-মুরগি পালন করছে। ন্যাশনাল নামে একসময় বিখ্যাত একটি কোম্পানি ছিল। সেই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সুপারভাইজারকে আমি চায়ের দোকান চালাতে দেখেছি।'
তিনি আরও বলেন, 'আসলে আমরা এখন চলছি রিপেয়ারিং করে। স্টিম আয়রন হোক বা বাংলা আয়রন, সবকিছুই আমরা সারাই করতে পারি।'

বাংলা আয়রন কারখানা সব বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন সুরহাব?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, 'কাজ তো এটাই শিখছি, অন্য কিছু পারি না। কপালে যা আছে, তা-ই করব।'
প্রায় সব কারিগরই বলেন, বাংলা আয়রন ঘরবাড়িতে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যতক্ষণ বিদ্যুতের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, ততক্ষণ এটি গরম হতেই থাকে। এতে রেগুলেটর না থাকায় তাপমাত্রা বাড়ানো-কমানোর সুযোগ নেই।
তবে লন্ড্রির লোকেরা সাবধানতা মেনেই এটি চালাতেন। তাদের দেখা যেত কিছুক্ষণ পরপর প্লাগ আলগা করে দিতে। চালাতে চালাতে তারা অভিজ্ঞ হয়ে উঠতেন। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কম ছিল।
তারও আগে কয়লার ইস্ত্রির চাহিদা ছিল তুঙ্গে। প্রতিটি লন্ড্রি বা টেইলার্সে কয়লার ইস্ত্রি ছিল একটি 'কমন' সামগ্রী। এখন এটি প্রায় বিলুপ্ত।

সুরহাব জানালেন, যারা কয়লার ইস্ত্রি তৈরি করত, তাদেরও কেউ কেউ একপর্যায়ে বেকার হয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, 'যখন বিদ্যুতের ব্যবহার কম ছিল বা বিদ্যুৎ সব জায়গায় পৌঁছায়নি, তখন কয়লার আয়রনের ভালো চাহিদা ছিল। বিদ্যুৎ সহজলভ্য হওয়ার পর কয়লার আয়রন দ্রুতই হারিয়ে যায়।'
এখন লোহার আয়রনের অবস্থাও প্রায় একই।
একজন দক্ষ কারিগর হয়েও সুরহাবের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আবু বকরও বড় কোনো পরিকল্পনা করতে পারছেন না। নিজের সংসার চালাতেই তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তাহলে শেষ পর্যন্ত কী হবে? ভবিষ্যতের কাছেই উত্তর জমা আছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—ততদিন কি সুরহাবের বিয়েটা স্থগিতই রাখতে হবে?
ছবি: টিবিএস