‘এজন্যই চ্যাপলিন অনন্য': ‘সিটি লাইটস’ ও সিনেমার ইতিহাসে সেরা শেষ দৃশ্যের গল্প
৯৫ বছর পেরিয়ে গেছে, তবু চার্লি চ্যাপলিনের নির্বাক কমেডি সিনেমা 'সিটি লাইটস'-এর আবেদন এতটুকু কমেনি। ১৯৩১ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাকে আজও বিশ্বের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এই সম্মানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সিনেমার সেই জাদুকরী শেষ মুহূর্তটি।
১৯৬৬ সালে লাইফ ম্যাগাজিন যখন চার্লি চ্যাপলিনকে জিজ্ঞেস করেছিল, নিজের বানানো কোন সিনেমাটি তার সবচেয়ে প্রিয়? চ্যাপলিন একবাক্যেই 'সিটি লাইটস'-এর নাম বলেছিলেন। যদিও নিজের স্বভাবসুলভ বিনয়ের সঙ্গে যোগ করেছিলেন, 'আমার মনে হয় ওটা বেশ ভালোই হয়েছে।'
১৯৩১ সালের ৩০ জানুয়ারি লস অ্যাঞ্জেলেস থিয়েটারে প্রিমিয়ারের পর থেকেই সিনেমাপ্রেমী ও নির্মাতারা এই নির্বাক রোমান্টিক কমেডির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সিনেমায় চ্যাপলিনের আইকনিক চরিত্র 'দ্য ট্র্যাম্প' এক অন্ধ ফুলওয়ালির (ভার্জিনিয়া চেরিল) প্রেমে পড়ে। আর মেয়েটি তাকে ভুল করে কোটিপতি মনে করে।
১৯৫২ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট (বিএফআই) যখন সর্বকালের সেরা সিনেমার তালিকা প্রকাশ করে, তখন 'সিটি লাইটস' ও চ্যাপলিনের 'দ্য গোল্ড রাশ' (১৯২৫) যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। স্ট্যানলি কুবরিক, অরসন ওয়েলস এবং আন্দ্রেই তারকোভস্কির মতো কিংবদন্তি পরিচালকরাও এটিকে তাঁদের প্রিয় সিনেমা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 'দ্য নাইট অফ দ্য হান্টার'-এর চিত্রনাট্যকার জেমস অ্যাজি তো বলেই দিয়েছেন, সিনেমার শেষ মুহূর্তটি ছিল 'অভিনয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন এবং সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত'।
সিনেমার একেবারে শেষ দৃশ্যেই সেই জাদুকরী মুহূর্তটি আসে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ফুল বিক্রেতার সঙ্গে ট্র্যাম্পের দেখা হয়। মেয়েটি তখন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে। ট্র্যাম্প তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, ভালোবাসায় ভরা সেই চাহনি। তারপর পর্দা কালো হয়ে যায়। দৃশ্যটি এতই বিশুদ্ধ আবেগের এবং এতই মর্মস্পর্শী যে, একে সিনেমার ইতিহাসের সেরা সমাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। গত ৯৫ বছরে অসংখ্য সিনেমা এই দৃশ্যের শৈল্পিকতা ও অভিনয়ের গভীরতা নকল করার চেষ্টা করেছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা সৃজনশীল পরিশ্রম আর কষ্টের ফসল ছিল এই শেষ দৃশ্য। সিনেমার পুরো গল্পই আসলে এই ক্লাইম্যাক্সের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ট্র্যাম্প যখন জানতে পারে যে ফুলওয়ালিকে তার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উচ্ছেদ করা হবে, তখন সে রাস্তার ঝাড়ুদার এবং পরে বক্সার হিসেবে কাজ করে। শেষমেশ এক মাতাল কোটিপতির কাছ থেকে টাকা পায়, কিন্তু মাতাল অবস্থায় কোটিপতি তাকে চিনতে পারে না এবং চুরির অপবাদ দেয়। গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগে ট্র্যাম্প মেয়েটিকে টাকাটা দিয়ে দেয়। সেই টাকা দিয়ে মেয়েটি তার ভাড়া শোধ করে এবং চোখের চিকিৎসা করিয়ে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়।
মাস কয়েক পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ট্র্যাম্প দেখে, মেয়েটি এখন দেখতে পায় এবং একটি সফল ফুলের দোকান চালাচ্ছে। জীর্ণ পোশাকে ট্র্যাম্প তার দোকানের সামনে দাঁড়ায়। মেয়েটি যখন অবশেষে তাকে চিনতে পারে, তখন তার মুখে ফুটে ওঠে গভীর মমতার ছাপ। ট্র্যাম্পও মুচকি হাসে, আর সিনেমা শেষ হয়।
'এটি ছিল বিশুদ্ধ'
বিএফআই ক্লাসিকস বইয়ের লেখক চার্লস মারল্যান্ড মনে করেন, চ্যাপলিনের পরিচালনার দক্ষতার চূড়ান্ত উদাহরণ এই শেষ দৃশ্য। তিনি বিবিসিকে বলেন, 'চ্যাপলিন জানতেন কীভাবে শট নিলে দৃশ্যের আবেগ আরও তীব্র হবে। ক্যামেরা মিডিয়াম শট থেকে ধীরে ধীরে ক্লোজ-আপে চলে আসে।' তিনি আরও বলেন, চ্যাপলিন কমেডির জন্য লং শট এবং ট্র্যাজেডি বা ড্রামার জন্য ক্লোজ-আপ ব্যবহার করতেন। 'এর সঙ্গে ছিল সাউন্ডট্র্যাক, যা ছিল জটিল, আবেগঘন এবং দর্শকের মনে গভীর রেখাপাত করে।'
তবে চ্যাপলিন ও চেরিলের অনবদ্য অভিনয় ছাড়া এই দৃশ্যটি কখনোই এমন উচ্চতায় পৌঁছাত না। মজার ব্যাপার হলো, 'সিটি লাইটস' ছিল চেরিলের প্রথম সিনেমা। মারল্যান্ড জানান, শেষ দৃশ্যের কয়েকটি টেক নেওয়ার পর চ্যাপলিনের মনে হচ্ছিল তারা বেশি আবেগ দেখাচ্ছেন বা 'ওভারঅ্যাক্টিং' করছেন। তাই চ্যাপলিন সিদ্ধান্ত নেন, ট্র্যাম্প শুধু চেরিলের দিকে আরও তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে।
মারল্যান্ড জানান, চ্যাপলিন এই দৃশ্যের শুটিং সম্পর্কে বলেছিলেন, 'এটি ছিল অভিনয় না করার এক সুন্দর অনুভূতি। যেন নিজের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। মূল বিষয়টা ছিল—একটু লজ্জিত হওয়া, তাকে আবার দেখে আনন্দিত হওয়া এবং আবেগপ্রবণ না হয়েই ক্ষমা চাওয়া। [ট্র্যাম্প] তাকিয়ে ভাবছে মেয়েটি কী ভাবছে। এটা ছিল একেবারে বিশুদ্ধ।'
সিনেমার মুক্তির বহু বছর পর চেরিল লেখক জেফরি ভ্যান্সকে বলেছিলেন, চ্যাপলিনের ত্বক সাধারণত শুষ্ক থাকত। কিন্তু এই দৃশ্যের সময় তিনি অনুভব করেছিলেন চ্যাপলিনের হাতের তালু ঘামছে। ভ্যান্স বিবিসিকে বলেন, 'চেরিল বুঝতে পেরেছিলেন চ্যাপলিনের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে। চেরিল ঠিক সেটাই দিচ্ছিলেন যা চ্যাপলিন চাইছিলেন, আর চ্যাপলিন চরিত্রের মতোই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিলেন।'
'সিটি লাইটস' দশকের পর দশক ধরে প্রাসঙ্গিক থাকার অন্যতম কারণ হলো চ্যাপলিনের সিদ্ধান্ত—সুনির্দিষ্ট কোনো উপসংহার না দেওয়া। রোমান্টিকরা মনে করেন, জীর্ণ দশা ও অর্থহীন হওয়া সত্ত্বেও মেয়েটি ট্র্যাম্পকে গ্রহণ করেছে। কিন্তু অন্যরা মনে করেন, তাদের মিলনের কোনো সম্ভাবনাই নেই।
ভ্যান্স বলেন, 'আমি মনে করি না এটা মোটেও রোমান্টিক। দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর মেয়েটির মধ্যে অহংকার দেখা যায়। সে আয়নায় নিজেকে দেখে, চুল ঠিক করে। সে হতাশ হয় যে তার সেই ধনী প্রেমিক আসলে এই ভবঘুরে। ট্র্যাম্পকে দেখে সে প্রথমে খিলখিল করে হেসে ওঠে এবং করুণা করে টাকা দেয়।'
আনন্দ, ভয়, লজ্জা থেকে উত্তেজনায় রূপ নেওয়া চ্যাপলিনের অভিনয় এতই সূক্ষ্ম ও গভীর ছিল যে, এরপর কী ঘটবে তা দর্শকের কল্পনার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সেরাদের সেরা?
অবশ্যই সিনেমার ইতিহাসে সেরা শেষ দৃশ্যের দাবিদার আরও অনেক সিনেমা আছে। 'প্ল্যানেট অফ দ্য এপস', 'দ্য গ্র্যাজুয়েট', 'দ্য গডফাদার' বা 'সানসেট বুলেভার্ড'-এর শেষ দৃশ্যগুলোও অবিস্মরণীয়। কিন্তু 'সিটি লাইটস'-এর মতো এতবার কোনো দৃশ্য নকল বা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।
'দ্য ৪০০ ব্লোজ', 'দিস ইজ ইংল্যান্ড', 'গন গার্ল' বা 'মুনলাইট'-এর মতো ভিন্ন ধারার সিনেমাগুলোও চ্যাপলিনের কাছে ঋণী। উডি অ্যালেনের 'ম্যানহাটন' (১৯৭৯) বা পিক্সারের 'মনস্টারস, ইনক.'-এর শেষ দৃশ্যেও 'সিটি লাইটস'-এর ছায়া দেখা যায়।
এই সব দৃশ্যের পেছনে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং মেধা। 'সিটি লাইটস'-এর ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি সত্য। এটি ছিল চ্যাপলিনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা। উৎপাদন খরচ ছিল ১৫ লাখ ডলার (আজকের দিনে প্রায় ৩ কোটি ডলার)। গল্প তৈরি ও শুটিংয়ে তিনি বছরের পর বছর সময় দিয়েছিলেন।
ভালোবাসার শ্রম
১৯২৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর যখন শুটিং শুরু হয়, তখন চ্যাপলিন ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি। লন্ডনের বস্তি থেকে উঠে এসে তিনি তখন কোটিপতি। সিনেমার ওপর তার ছিল পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। ১৪ মাস আগে সবাক চলচ্চিত্র বা 'টকি'র যুগ শুরু হলেও চ্যাপলিন জেদ ধরেন 'সিটি লাইটস' হবে সংলাপহীন।
ভ্যান্স বলেন, 'তিনি বিশ্বাস করতেন ট্র্যাম্প নির্বাক সিনেমারই চরিত্র। কিন্তু তিনি জানতেন, দর্শককে নির্বাক সিনেমা খাওয়াতে হলে তা হতে হবে নিখুঁত।'
চ্যাপলিন এতটাই নিখুঁত হতে চেয়েছিলেন যে প্রি-প্রডাকশনেই এক বছর সময় দেন। শুটিং চলে ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ট্র্যাম্প ও ফুলওয়ালির প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্যটি চ্যাপলিনকে এতটাই ভুগিয়েছিল যে, একটি দৃশ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি 'রি-টেক' নেওয়ার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড আজও এটির দখলে। দৃশ্যটি তিনি ৩৪২ বার শুট করেছিলেন!
চ্যাপলিনের এই হাড়ভাঙা খাটুনি বিফলে যায়নি। বক্স অফিসে বাজেটের তিনগুণ আয় করে সিনেমাটি। সমালোচকদের প্রশংসায় ভেসে যায়। সময়ের সঙ্গে এর খ্যাতি আরও বেড়েছে।
দশক পেরিয়ে গেলেও 'মডার্ন টাইমস', 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর' বা 'দ্য গোল্ড রাশ'-এর ভিড়ে 'সিটি লাইটস' আজও চ্যাপলিনের সবচেয়ে প্রিয় ও দীর্ঘস্থায়ী সিনেমা হিসেবে টিকে আছে। ভ্যান্স বলেন, 'ডিকেন্সের উপন্যাস বা শেক্সপিয়ারের নাটকের মতো চ্যাপলিনের সিনেমা কখনো পুরোনো হয় না। তবে সিটি লাইটসের সৌন্দর্য এর সরলতায়। চ্যাপলিন জানতেন সরলতা অর্জন করা সবচেয়ে কঠিন।'
'সিটি লাইটস'-এর শক্তি ও কাব্যিকতা তার শেষ দৃশ্যেই সবচেয়ে ভালো ফুটে উঠেছে। ট্র্যাম্পের সেই আশাবাদী হাসি আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন—প্রায় ১০০ বছর আর হাজার হাজার সবাক সিনেমার ভিড়েও অন্য কোনো সমাপ্তি এর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। ভ্যান্স বলেন, 'এজন্যই চ্যাপলিন ছিলেন জিনিয়াস। এজন্যই তিনি ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা।'
