যৌনতা, মৃত্যু আর বিশ্বাসঘাতকতা: উত্তর কোরিয়ার সিনেমায় যে দৃশ্য আগে দেখেনি কেউ
কোরিয়ার একটি নতুন সিনেমা দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছে। এতে এমন সব দৃশ্য ও কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে, যা দেশটির রাষ্ট্র-অনুমোদিত সিনেমায় আগে কখনো দেখা যায়নি।
'ডেইজ অ্যান্ড নাইটস অফ কনফ্রন্টেশন' নামের সিনেমাটিতে দেখা যায় এক ব্যক্তিকে প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হচ্ছে। এক দুর্ভাগা চরিত্রকে তার নিজের স্বামীই ছুরিকাঘাত করছে, পরে সে গাড়ির ধাক্কায় আহত হয় এবং শেষমেশ খুন হয়। পর্দায় দেখা যায় সুইসাইড বম্ব ভেস্ট বা আত্মঘাতী বোমা, যার তারগুলো বেরিয়ে আছে। আছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, এমনকি স্বল্প সময়ের জন্য আংশিক নগ্নতাও।
গত বছর উত্তর কোরিয়ার সিনেমা হলগুলোতে এই ছবিটি দেখতে ভিড় জমিয়েছিল মানুষ। আর চলতি মাসে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রথমবারের মতো প্রচারের পর এটি আরও বিশাল দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, দেশটির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বিনোদন জগতে দীর্ঘদিনের ট্যাবু বা প্রথা ভাঙার বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন রয়েছে।
গল্পটি সাজানো হয়েছে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের প্রেক্ষাপটে। এর কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা। গল্পের চূড়ান্ত পরিণতিতে দেখা যায় দেশটির প্রয়াত নেতা কিম জং ইলের (বর্তমান নেতা কিম জং উনের বাবা) ট্রেন উড়িয়ে দিয়ে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র।
উত্তর কোরিয়ার সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। তাই সাধারণ দর্শকদের মতামত স্বাধীনভাবে জানা অসম্ভব। তবে এক দশক আগেও এই সিনেমার কোনো কিছুই সেন্সরশিপ পার হতে পারত না। অথচ 'ডেইজ অ্যান্ড নাইটস'কে একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রযোজনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। পিয়ংইয়ং চলচ্চিত্র উৎসবে এটি সেরা অভিনেতা ও সেরা সাউন্ড এফেক্টের পুরস্কারও জিতেছে।
সিনেমাটি উসকানিমূলক হলেও রাষ্ট্রবিরোধী নয়। এটি উত্তর কোরিয়ার সেই পুরোনো নৈতিকতার গণ্ডিতেই আছে: বিশ্বাসঘাতকতা ডেকে আনে ধ্বংস, আর রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। যা নতুন, তা হলো উপস্থাপনা। এর নির্মাণশৈলী উন্নত, গতি দ্রুত এবং ভঙ্গিটি নিঃসন্দেহে আধুনিক। উত্তর কোরিয়ার সিনেমা এতদিন যা এড়িয়ে চলত, সেই হলিউড থ্রিলারের দৃশ্যরীতিই এখানে ধার করা হয়েছে।
এই পরিবর্তন হয়তো নেতা কিম জং উনের সরকারের একটি উপলব্ধির প্রতিফলন। তারা বুঝতে পারছে তাদের দর্শক কারা হয়ে উঠছে এবং তরুণদের মনোযোগ ধরে রাখতে এখন কী প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কথা বলেছেন উত্তর কোরিয়া বিষয়ক গবেষক মার্টেল। তিনি জানান, দেশটির অভ্যন্তরীণ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্প কয়েক দশক ধরে খুব একটা বদলায়নি।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'দেশীয় সিনেমা ও টিভি নাটকে পরিচিত গল্প আর পুরোনো পদ্ধতিই ব্যবহার করা হতো।' গত ২০ বছরে শিল্পটি স্থবির ছিল। বড় সিনেমার বদলে স্বল্প বাজেটের কাজই বেশি হতো।
মার্টেল বলেন, 'সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার অনেক বেশি সম্পৃক্ত হয়েছে এবং নতুন সব প্রযোজনায় প্রচুর অর্থ ঢালছে।'
সিনেমার কাহিনির সঙ্গে ২০০৪ সালে চীন সীমান্তের কাছে রিয়ংচন স্টেশনে ঘটা বাস্তব এক বিস্ফোরণের মিল রয়েছে। সে সময় উত্তর কোরিয়া একে নিছক দুর্ঘটনা বলেছিল। দেশের বাইরে গুঞ্জন ছিল, এটি হয়তো হত্যাচেষ্টা। উত্তর কোরিয়ার ভেতরে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা বারণ ছিল।
মার্টেল বলেন, 'যতদূর জানি, সরকার রিয়ংচন বিপর্যয়কে দুর্ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু বলে স্বীকার করেনি। সবাই একে গুজব হিসেবেই জানত। তাই উত্তর কোরিয়ার সিনেমায় এটিকে গল্পের অংশ হিসেবে দেখা অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং নিশ্চিতভাবেই প্রথম।'
সিনেমার শেষ অঙ্কে হত্যার ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায়। ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হয় এবং মূল চরিত্র গ্রেপ্তার হয়। এর মাধ্যমে সিনেমার মূল বার্তাটিই জোর দিয়ে বলা হয়—রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি পেতেই হয়।
১৯৬০ থেকে ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার সিনেমাগুলো মূলত তিনটি ভাগে পড়ত: বিপ্লবী যুদ্ধের মহাকাব্য, আদর্শিক পবিত্রতা নিয়ে মেলোড্রামা এবং কিম পরিবারের গুণগান গাওয়া ঐতিহাসিক রূপক।
দেশটির অন্যতম বিখ্যাত সিনেমা 'দ্য ফ্লাওয়ার গার্ল'-এ জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনে এক কৃষক নারীর নির্যাতনের গল্প বলা হয়েছে। সেখানে ভোগান্তি ছিল চরম, কিন্তু প্রতীকী। সহিংসতা সরাসরি না দেখিয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হতো। শারীরিক নিষ্ঠুরতার বদলে ছিল আবেগের বাড়াবাড়ি। মুক্তি আসত উত্তেজনার মাধ্যমে নয়, বরং বিপ্লবী জাগরণের মাধ্যমে।
এমনকি যখন সিনেমায় শত্রুদের দেখানো হতো, তারা সাধারণত বিদেশি হতো। কোরীয় যুদ্ধের সিনেমাগুলোতে খলনায়করা ছিল বিদেশি ও স্পষ্ট। আর উত্তর কোরিয়ার চরিত্ররা থাকত আদর্শগতভাবে খাঁটি।
পরের দিকে সিনেমায় ঘরোয়া বিষয় নিয়ে সাবধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া 'দ্য স্কুলগার্লস ডায়েরি'তে পারিবারিক উত্তেজনা ও সামাজিক প্রত্যাশার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সংঘাতের সমাধান হতো নৈতিক সংশোধনের মাধ্যমে, ধ্বংসের মাধ্যমে নয়। পথভ্রষ্ট চরিত্রদের সঠিক পথে আনা হতো, মেরে ফেলা হতো না।
এর ঠিক উল্টো চিত্র 'ডেইজ অ্যান্ড নাইটস'-এ। এখানে বিশ্বাসঘাতকতাই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এবং এর পরিণতিও দেখানো হয়েছে কঠোরভাবে। খলনায়ক কোনো বিদেশি আক্রমণকারী নয়। সে একজন বিশ্বাসভাজন ঘরের লোক—একজন সরকারি কৌঁসুলি, একজন স্বামী, সমাজেরই একজন নাগরিক। সিনেমাটি আধুনিক থ্রিলারের কাঠামো নিয়েছে: নৈতিকভাবে স্খলিত নায়ক, ক্রমশ বাড়তে থাকা ব্যক্তিগত ঝুঁকি, অ্যাকশন দৃশ্য এবং সবশেষে নির্মম বিচার।
কোরীয় যুদ্ধের পর 'এপ্রিল ২৫ ফিল্ম স্টুডিও' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে তারা জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী নাটক তৈরিতেই পারদর্শী ছিল। দশকের পর দশক তাদের কাজ ছিল গৎবাঁধা। কিন্তু কিম জং উনের আমলে তা বদলাতে শুরু করে। তার সরকার আদর্শ ঠিক রেখে উপস্থাপনা আধুনিক করার ওপর জোর দেয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম 'উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ' দিয়ে দর্শক টানার জন্য এই সিনেমার প্রশংসা করেছে।
মার্টেল বলেন, 'আমি যেসব চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গে কথা বলেছি, তারা এই পুনর্জাগরণের কৃতিত্ব সরাসরি কিম জং উনকেই দিয়েছেন। ঠিক যেমন তার বাবা কিম জং ইল একসময় দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে অর্থ, সম্পদ ও ব্যক্তিগত নির্দেশনা দিয়েছিলেন।'
উত্তর কোরিয়া সব সময়ই সিনেমাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতা কিম জং ইল শুধু দেখভালই করতেন না, তিনি প্রচার ও আন্দোলন বিভাগের প্রধান হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে এটি পরিচালনা করতেন। চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও কাস্টিংয়ে তিনি যুক্ত থাকতেন। শোনা যায়, তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ১৫ হাজারেরও বেশি সিনেমা ছিল, যার মধ্যে নিষিদ্ধ হলিউড সিনেমাও ছিল।
নিজের দেশের সিনেমার সীমাবদ্ধতায় হতাশ হয়ে তিনি একবার চরম পথ বেছে নিয়েছিলেন—অপহরণ।
১৯৭৮ সালে হংকং থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিনেত্রী চোই ইউন-হি এবং পরে তার সাবেক স্বামী পরিচালক শিন সাং ওককে অপহরণ করে পিয়ংইয়ংয়ে নেওয়া হয়। পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের পুনরায় বিয়ে করতে এবং রাষ্ট্রের জন্য সিনেমা বানাতে বাধ্য করা হয়।
তারা উত্তর কোরিয়ার জন্য ১৭টি সিনেমা বানান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল 'পুলগাসারি' (১৯৮৫), যা 'গডজিলা'র আদলে তৈরি। এটি ছিল বিপ্লবী রূপক। এছাড়া শিন 'সল্ট' (১৯৮৫) সিনেমাটি পরিচালনা করেন, যার জন্য চোই মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। উত্তর কোরিয়ার সিনেমার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছিল এক বিরল ঘটনা।
কিম জং ইল বুঝতেও পারেননি যে শিন ও চোই গোপনে তাদের কথোপকথন রেকর্ড করছিলেন। পরে পাচার হওয়া সেই টেপে নিজের দেশের সিনেমা নিয়ে কিমের খোলামেলা সমালোচনা শোনা যায়।
একটি রেকর্ডিংয়ে তাকে বলতে শোনা যায়, 'মানুষ নতুন কিছু চায় না।' তিনি অভিযোগ করেন, 'কেন তারা সব দৃশ্যে শুধু মানুষের কান্না দেখাতে চায়? যেন পরিবারে কেউ মারা গেছে!'
১৯৮৬ সালে ইউরোপ সফরের সময় ওই নির্মাতা দম্পতি পালিয়ে যান এবং যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন।
কিম জং ইল একটি সত্য বুঝেছিলেন যা আজও উত্তর কোরিয়ার প্রচারণাকে প্রভাবিত করছে: মানুষ যদি না দেখে তবে প্রচারণায় কাজ হবে না।
আজকের উত্তর কোরিয়ায় স্মার্টফোন বাড়ছে। সরকারি অ্যাপে গান, গেম ও ভিডিও পাওয়া যায়। নিজস্ব স্ট্রিমিং সার্ভিসও আছে। একই সঙ্গে ইউএসবি ড্রাইভ ও মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার নাটক ও গান অবৈধভাবে ছড়াচ্ছে, যা তরুণদের আধুনিক জীবনের অন্য এক চিত্র দেখাচ্ছে।
এসব দেখার শাস্তি এখন আরও কঠোর। দক্ষিণ কোরিয়ার মিডিয়া দেখার বা ছড়ানোর দায়ে কিশোরদের প্রকাশ্যে দীর্ঘমেয়াদি সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ২০২০ সালের এক আইনে 'অবিশ্বস্ত' সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান করা হয়েছে।
কিন্তু শুধু দমন-পীড়নই যথেষ্ট নয়। মনোযোগও কাড়তে হবে। 'ডেইজ অ্যান্ড নাইটস' সেই প্রচেষ্টারই অংশ। এটি আগের প্রচারণামূলক সিনেমাগুলোর চেয়ে দ্রুতগতির, অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং আরও বেশি আবেগনির্ভর। আধুনিক বিনোদনের মোড়কে এটি সেই পুরোনো বার্তাই দিচ্ছে: নেতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।
