নিজের উত্তরসূরি হিসেবে কিম জং উন কি তার মেয়েকেই বেছে নিচ্ছেন?
রহস্যঘেরা একটি দেশ উত্তর কোরিয়া। বহির্বিশ্ব থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন, শাসনব্যবস্থাও তেমনি কঠোর। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ অনেক খবরাখবরই বাইরের দুনিয়ার কাছে অজানা থেকে যায়। বিশেষ করে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উন ও তার পরিবারকে ঘিরে জল্পনার শেষ নেই।
তবে সাম্প্রতিক এক গোয়েন্দা তথ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—কে হচ্ছেন কিমের উত্তরসূরি?
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) বলছে, কিম জং-উন সম্ভবত তার মেয়েকেই উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এনআইএস তাদের এই নতুন মূল্যায়নের কথা জানায়।
কিম জং-উনের এই মেয়ের নাম কিম জু-এ বলে ধারণা করা হয়। তার সঠিক বয়স জানা না গেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি এখন কিশোরী। বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তর কোরিয়ার বড় বড় রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কর্মসূচিতে কিম জং-উনের পাশে মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিজের উত্তরসূরি হিসেবে মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই দক্ষ করে গড়ে তুলছেন কিম।
এনআইএস জানিয়েছে, জু-এ কেবল লোকদেখানো অনুষ্ঠানেই বাবার সঙ্গী হচ্ছেন না, বরং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী কিছু বিষয়েও তিনি মতামত দিচ্ছেন। জনসমক্ষে তার ঘন ঘন উপস্থিতি এবং তাঁকে দেওয়া রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে এটি স্পষ্ট যে কিম জং-উন তাকেই আগামীর নেতা হিসেবে তৈরি করছেন।
চলতি ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে দেশটিতে একটি বড় রাজনৈতিক সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই হবে এ ধরনের প্রথম কোনো বড় আয়োজন। ধারণা করা হচ্ছে, এই সমাবেশ থেকে নতুন কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে কিংবা প্রশাসনে বড় রদবদল আসতে পারে। তবে সবার নজর থাকবে অন্য এক জায়গায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার আইনপ্রণেতারা জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে কিম জং-উনের মেয়ে জু-এ উপস্থিত থাকেন কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখছে গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএস। সেখানে তাকে ঠিক কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল কেমন থাকছে কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক পদবি দেওয়া হয় কি না—এসবের ওপরই নির্ভর করছে তার পরবর্তী নেতা হওয়ার সমীকরণ।
পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, কিম জং-উনের মোট তিন সন্তান রয়েছে। জু-এ তাদের মধ্যে মেজ বলে ধারণা করা হয়। যদিও কঠোর গোপনীয়তার কারণে কিম পরিবারের ব্যক্তিগত কোনো তথ্যই নিশ্চিতভাবে জানার উপায় নেই।
বিশ্ববাসী প্রথম জু-এর নাম জানতে পারে ২০১৩ সালে। সে সময় পিয়ংইয়ং সফরে গিয়েছিলেন মার্কিন বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যান। সফর শেষে তিনি বলেছিলেন, 'আমি তাদের শিশু জু-একে কোলে নিয়েছি। কিমের স্ত্রীর সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে।'
এরপর দীর্ঘ প্রায় এক দশক জু-এ ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। ২০২২ সালে প্রথমবার তাঁকে জনসমক্ষে আনা হয়। উপলক্ষ ছিল একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উৎক্ষেপণ। তখন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, বিশালাকার এক ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোরী। এরপর পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক কুচকাওয়াজেও বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ক্ষেপণাস্ত্রের সারি পরিদর্শন করতে দেখা যায়।
গত সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো বাবার সঙ্গে বিদেশ সফরে যান জু-এ। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের আমন্ত্রণে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিতে বেইজিং গিয়েছিলেন তিনি। সেই কুচকাওয়াজে শি জিন পিংয়ের দুই পাশে ছিলেন কিম জং-উন ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
বিশ্বনেতারা যখন নতুন বিশ্বব্যবস্থার বার্তা দিচ্ছিলেন, তখন কিশোরী জু-এ বেইজিংয়েই অবস্থান করছিলেন। তবে ওই সফরে তাকে অত্যন্ত সুকৌশলে ক্যামেরার লেন্স থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।
কিমের সন্তানদের মধ্যে একমাত্র জু-একেই এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে দেখা গেছে। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাকে প্রায়ই 'আদরের কন্যা' বা 'প্রিয় কন্যা' হিসেবে সম্বোধন করে। কিমের আরও সন্তান আছে বলে ধারণা করা হলেও, তাদের কখনো সাধারণ মানুষের সামনে আনা হয়নি।
তবে জু-এই যে পরবর্তী নেতা হবেন, তা সবাই মনে করছেন না। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, এটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণের কৌশল মাত্র। সিএনএনকে এক বিশেষজ্ঞ জানান, কিম পরিবারে উত্তরাধিকারী নির্বাচনের বিষয়টি বরাবরই রহস্যময়। হঠাৎ কেন সেই ধারায় বদল আসবে?
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি পক্ষ মনে করেন, কিমের অন্য সন্তানদের হয়তো ইচ্ছা করেই আড়ালে রাখা হয়েছে।, যাতে তারা নীরবে পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকে কিম জং উন নিজেও সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু জু-এর ওপর এখন সবার নজর থাকায় তার পক্ষে বিদেশে পড়াশোনা করা কঠিন হতে পারে।
অবশ্য এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। কিম জং-উনের বয়স এখন কেবল চল্লিশের কোঠায়। ফলে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় আসতে এখনো অনেক বছর বাকি। এই দীর্ঘ সময়ে উত্তর কোরিয়ার রাজনীতিতে আরও অনেক নাটকীয় রদবদল ঘটা অস্বাভাবিক নয় বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
