নিজেদের প্রথম ‘পারমাণবিক শক্তিচালিত’ সাবমেরিনের নতুন ছবি প্রকাশ করল উত্তর কোরিয়া
উত্তর কোরিয়া বৃহস্পতিবার তাদের প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের নতুন কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেছে। এটি একটি বিশাল জলযান, যার আকার মার্কিন নৌবাহিনীর 'অ্যাটাক সাবমেরিন' বা আক্রমণাত্মক সাবমেরিনগুলোর সমতুল্য।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন একটি ইনডোর নির্মাণ কেন্দ্রে বসে গাইডেড-মিসাইল সাবমেরিনটি পরিদর্শন করছেন। তবে সাবমেরিনটি এখনো সাগরে ভাসানো হয়নি।
পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরি করা কিম জং উনের বহুদিনের স্বপ্ন। ২০২১ সালে ক্ষমতাসীন দলের এক সম্মেলনে তিনি প্রথম এ পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে জানান। তবে সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ কোরিয়া ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে নিজস্ব পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণের অনুমতি পাওয়ায়, কিম জং উন তার এই প্রকল্পের কাজ আরও জোরদার করেছেন।
এই ধরনের সাবমেরিনের কিছু বিশেষ সুবিধা রয়েছে। সাধারণ সাবমেরিনগুলো ডিজেল ইঞ্জিন চালানো এবং ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য বাতাসের প্রয়োজন হওয়ায় নিয়মিত পানির ওপরে উঠে আসে। কিন্তু পারমাণবিক সাবমেরিন কয়েক বছর পর্যন্ত একটানা পানির নিচে ডুবে থাকতে পারে—যতক্ষণ না ক্রুদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও রসদ ফুরিয়ে যায়।
এই ধরনের সাবমেরিন সাধারণ সাবমেরিনের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুতগতির এবং চলাচলের সময় তুলনামূলকভাবে অনেক কম শব্দ করে। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ছয়টি দেশের কাছে এই প্রযুক্তি রয়েছে। দেশগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ভারত।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, গত মার্চ মাসে প্রথমবার এই সাবমেরিনটির অস্তিত্ব প্রকাশের পর থেকে এর নির্মাণকাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির ধারণক্ষমতা (ডিসপ্লেসমেন্ট) ৮,৭০০ টন, যা মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক 'ভার্জিনিয়া-ক্লাস' অ্যাটাক সাবমেরিনের সমান।
কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, কিম জং উন পিয়ংইয়ংয়ের প্রতিরক্ষা নীতিতে এই সাবমেরিনের গুরুত্বের ওপর আবারও জোর দিয়েছেন।
তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত 'সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক সক্ষমতার' ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়েছে। কিম আরও বলেন, 'সশস্ত্র বাহিনীকে আরও উন্নত করার ক্ষেত্রে আমরা এই অতি-শক্তিশালী আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকেই জাতীয় নিরাপত্তার সর্বোত্তম ঢাল হিসেবে বিবেচনা করি।'
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলে কিম বলেন, এই উদ্যোগ উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তার লঙ্ঘন এবং এটি এমন এক হুমকি, যার মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
তবে সিউলের ইউহা ওম্যানস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লিফ-এরিক ইসলির মতে, কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য পিয়ংইয়ং নিজেই দায়ী। ইসলি বলেন, 'কিম হয়তো ঠিকই বলেছেন যে পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির প্রতিযোগিতা কোরীয় উপদ্বীপের অস্থিরতা বাড়িয়ে দেবে, কিন্তু এই অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্য তিনি নিজেই দায়ী।'
তিনি আরও বলেন, 'পিয়ংইয়ং-ই সিউলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করছে, পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে প্রতিবেশীদের হুমকি দিচ্ছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বদলে সামরিক একনায়কতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে বিপুল সম্পদ ব্যয় করে নিজের জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে।'
২০২১ সালে ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদি সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কিম নিজের দেশের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর বিষয়টি সরাসরি তদারকি করছেন। এই পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরোধ করা কঠিন এমন হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল এবং নৌবাহিনীর জন্য দুটি নতুন গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার।
চলতি বছরের শুরুর দিকে দ্বিতীয় ডেস্ট্রয়ারটি সাগরে ভাসানোর সময় উল্টে যাওয়ার ঘটনায় তা খবরের শিরোনাম হয়। পরে যুদ্ধজাহাজটি পানি থেকে উদ্ধার করা হয় এবং দৃশ্যত সেটি মেরামত করা হয়েছে।
কেসিএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন সাবমেরিন পরিদর্শনের সময় কিম বলেন, ডেস্ট্রয়ার ও পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণের এই উদ্যোগ 'আমাদের নৌবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা জোরদার করার ক্ষেত্রে এক বিশাল অগ্রগতি'।
তবে ইসলি বলেন, উত্তর কোরিয়ার নৌবহর এখনো দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। কারণ দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বিশ্বের অন্যতম সেরা গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং নতুন, উন্নতমানের সাধারণ (ডিজেলচালিত) সাবমেরিন রয়েছে। তিনি আরঅ বলেন, 'কিম যখন দক্ষিণ কোরিয়ার এই উন্নত প্রযুক্তি প্রত্যক্ষ করবেন, তখন হয়তো তিনি বুঝতে পারবেন যে তার হিসাব ভুল ছিল।'
উত্তর কোরিয়ার জন্য বড় একটি সুবিধা হতে পারে, দক্ষিণ কোরিয়ার আগেই পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন হাতে পাওয়া।
দক্ষিণ কোরিয়া কয়েক দশক ধরেই এমন ধরনের সাবমেরিন পেতে চেয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের পারমাণবিক চুক্তির কারণে তারা এটি তৈরি করতে পারছিল না। গত অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই বাধা দূর করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবুও, এসব সাবমেরিনের নকশা তৈরি এবং নির্মাণ সম্পূর্ণ করতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে।
সিউলের কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশন-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হং মিন সিএনএন-কে বলেন, 'আগামী দুই বছরের মধ্যে সাবমেরিনটি সাগরে ভাসানো হলে উত্তর কোরিয়া এটি ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাতে পারে।'
ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে হং আরও মত দিয়েছেন যে, সাবমেরিনটিতে সম্ভবত ইতোমধ্যেই পারমাণবিক চুল্লি বসানো হয়ে গেছে। ফলে সাগরে ভাসানোর জন্য এখন আর মাত্র কিছু ধাপ বাকি।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ছবিগুলোতে শুধু উত্তর কোরিয়ার সামরিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিতই ছিল না, আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানের ছবিগুলোতে দেখা যায় কিম জং উনের সঙ্গে তার মেয়ে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি কিম জু এ। সাম্প্রতিক সময়ে তাকে বেশ কয়েকটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। এতে জল্পনা তৈরি হয়েছে, কিম হয়তো তাকে তার ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি করছেন।
