প্রকল্পের ধীরগতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে অনুষ্ঠানের মঞ্চেই উত্তর কোরিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করলেন কিম
নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের ওপর উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের চটে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এবার এক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে কর্মকর্তাদের 'অযোগ্য' আখ্যা দিয়ে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করেছেন তিনি। উত্তর কোরিয়ার মতো কড়া গোপনীয়তার দেশে এভাবে প্রকাশ্যে কোনো কর্মকর্তাকে ভর্ৎসনা ও পদচ্যুতির ঘটনা বেশ বিরল।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ মঙ্গলবার জানিয়েছে, একটি শিল্প কমপ্লেক্সের আধুনিকীকরণ প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কিম জং উন উপ-প্রধানমন্ত্রী ইয়াং সুং-হোকে অনুষ্ঠানস্থলেই বরখাস্ত করেন। কিমের মতে, ইয়াং এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের যোগ্য নন।
নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে কিম এক মজার উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, 'সহজ কথায় বলতে গেলে, ইয়াংকে এই দায়িত্ব দেওয়া ছিল ছাগলের পেছনে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো। এটা আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি ভুল ছিল। মনে রাখা উচিত, গাড়ি টানে গরু, ছাগল নয়।'
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, বরখাস্ত হওয়া ইয়াং সুং-হো এর আগে দেশটির শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। পরে তাকে পদোন্নতি দিয়ে মেশিনারি খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছিল। তিনি ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্ব কাউন্সিলেরও একজন বিকল্প সদস্য ছিলেন। তবে তার জায়গায় কাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা এখনো জানায়নি পিয়ংইয়ং।
আগামীতে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির 'নবম কংগ্রেস' অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও বড় নীতি নির্ধারণী লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করার কথা।
গত সোমবার ওই শিল্প কমপ্লেক্স পরিদর্শনের সময় প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে থাকার জন্য সরাসরি কর্মকর্তাদের দায়ী করেন কিম। তিনি অভিযোগ করেন, দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তাদের কারণেই আধুনিকীকরণ প্রকল্প সময়মতো শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
উপ-প্রধানমন্ত্রীকে মঞ্চেই বরখাস্ত করার পর নিজ দলের কর্মকর্তাদের ওপর রীতিমতো চড়াও হন কিম। তাঁর মতে, একদল 'দায়িত্বজ্ঞানহীন, বেয়াদব এবং অযোগ্য' কর্মকর্তাদের কারণেই রিয়ংসং মেশিন কমপ্লেক্সের আধুনিকায়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ কিমের এই কড়া সমালোচনার কথা প্রকাশ করেছে।
কিম জং উন অভিযোগ করেন, দলের অনেক সদস্য দীর্ঘ সময় ধরে 'পরাজয়বাদী মানসিকতা, দায়িত্বহীনতা এবং নিষ্ক্রিয়তায়' অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বর্তমানের এই অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের দিয়ে দেশের শিল্প খাতের আমূল পরিবর্তন বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ এই ঘটনাকে 'বিরল' বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, সামনেই উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দলের বড় সম্মেলন (পার্টি কংগ্রেস)। তার আগেই কর্মকর্তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং ভয় ধরিয়ে দিতেই কিম এমন কঠোর ভাষা ব্যবহার করছেন।
এদিকে গত সপ্তাহে খবর পাওয়া গিয়েছিল, কিম জং উনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিমকে 'হত্যার ষড়যন্ত্র' করা হতে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যেই তাঁর দেহরক্ষী বাহিনীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের প্রধানদের বদল করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এভাবে প্রকাশ্যে কর্মকর্তাদের অপমান বা বরখাস্ত করা কিম জং উনের একটি পুরনো কৌশল। ২০১৩ সালে কিম তাঁর আত্মীয় জং সং থয়েককে একইভাবে জনসমক্ষে আটক ও পরে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।
ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ইয়াং মু-জিন বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, 'কিম জং উন এখন কর্মকর্তাদের মধ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এক ধরনের 'শক ট্যাকটিক' বা চমকে দেওয়ার মতো কঠোর কৌশল ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে তিনি দলের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই বার্তাই দিতে চাইছেন যে, কাজে অবহেলা করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।'
