‘কাটিং থ্রু রকস’: অস্কারে মনোনীত প্রামাণ্যচিত্রের তারকা ইরানের মোটরসাইকেল চালক ধাত্রী
ইরানের রাজধানী তেহরানে বড় হওয়ার সময় চলচ্চিত্র নির্মাতা সারা খাকি অনেক শক্তিশালী নারী দেখেছেন। তিনি বলেন, 'ওরা নিজের স্বাধীনতার জন্য লড়ছিল এবং নিজেদের জীবনের জায়গা দাবি করছিল।'
এরপর খাকি দেশের নারী উদ্যোক্তা ও আন্দোলনকারীদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তখনই তিনি ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে থাকা এক অসাধারণ নারীর খোঁজ পান। তিনি মোটরসাইকেল চালান এবং ওই অঞ্চলের একমাত্র নারী মোটরসাইকেল আরোহী। একজন ধাত্রী হিসেবে তিনি ৪০০ শিশুর জন্ম দিয়েছেন।
সেই নারী হলেন সারা শাহভারদি। কয়েক মাস ফোনে কথা বলে সম্পর্ক গড়ে তোলার পর খাকি ও সহ-পরিচালক মোহাম্মদরেজা আইনি জানতে পারেন, শাহভারদি কাউন্সিল নির্বাচনে লড়ছেন। তখন তারা তাকে নিয়ে সিনেমা বানানোর সিদ্ধান্ত নেন।
'কাটিং থ্রু রকস' সিনেমাটি আগামী মাসে অস্কারে সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে প্রথম ইরানি সিনেমা হিসেবে মনোনীত হয়েছে।
সিনেমায় দেখা যায়, জাঞ্জান অঞ্চলের এক গ্রামে শাহভারদি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একজন নারী নেত্রী হিসেবে তিনি নানা বাধার মুখোমুখি হন। সেখানে ৩০০টি গ্রাম কাউন্সিলের ১,৫০০ পুরুষ সদস্যের মধ্যে তিনি একমাত্র নারী।
তিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন এবং প্রথম নারী হিসেবে এই কৃতিত্ব পান। গ্রামে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে আসেন। নারী-পুরুষের জমির যৌথ মালিকানার জন্য চাপ দেন, যা ইরানে বিরল। এছাড়া মেয়েদের শিক্ষা ও বাল্যবিবাহ বন্ধের মতো কাজও করেন।
সিনেমায় দেখা যায়, শাহভারদি নারীদের সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং ১১ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ে ও সন্তান জন্মের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। একটি বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করে তিনি ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রতিশ্রুতি নেন, তারা ছোটবেলায় বিয়ে না করে পড়াশোনা শেষ করবে।
খাকি বলেন, '২০১৭ সালে শুরু হয়ে আট বছর ধরে তৈরি এই সিনেমায় শাহভারদি অস্বাভাবিক কিছু করছেন।' তিনি ওই অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা আজারিতে কথা বলা আইনি সঙ্গে কাজ করেছেন। খাকি বলেন, 'নারী-পুরুষ জুটি হিসেবে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মোহাম্মদরেজা যেসব জায়গায় ঢুকতে পারত, আমি সেখানে পারতাম না, আমার ক্ষেত্রেও উল্টো সত্য।'
সিনেমায় যখন নারীদের গল্পই মূল আকর্ষণ, তখন ক্যামেরার আড়ালে অন্য গল্পও চলছিল—তৈরির সময় খাকি ও আইনি বিয়ে করেছেন। আইনি বলেন, 'একই সময়ে দুটি গল্প ঘটছিল—ক্যামেরার সামনে 'কাটিং থ্রু রকস'-এর গল্প, আর পেছনে ভালোবাসার গল্প।'
শাহভারদি মজা করে বলেন, এই মিলনের কৃতিত্ব তার। তবে সিনেমায় তাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
একটি দৃশ্যে দেখা যায়, শাহভারদি ফেরেশতে নামের এক কিশোরীকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। ফেরেশতের বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১২ বছর বয়সে, স্বামীর বয়স ৩৫। আদালতে ফেরেশতা বলেছে, 'আমি চাই না আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ আমার মতো হোক।'
বিচারক তাকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে সে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যায়। নির্মাতারা আদালতের শুনানির ৪০ মিনিট ক্যামেরায় ধারণ করতে পেরেছেন।
সিনেমার পরবর্তী অংশে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। 'অসম্মানজনক বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড' অভিযোগে শাহভারদিকেও আদালতে তলব করা হয়। তাকে প্রশ্ন করা হয়, কেন নারীরা তার বাড়িতে আসে, কেন তিনি পুরুষদের মতো পোশাক পরেন, কণ্ঠস্বর কেন নারীদের মতো নয়। লিঙ্গ পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না তা দেখার জন্য একজন বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হয়। শাহভারদি বলেন, 'আমি আমার লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।'
পরীক্ষক পরামর্শ দেন, 'আপনি যদি সত্যিই একজন নারী হয়ে থাকেন, তবে নিয়ম ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমাদের সমাজে একজন নারী যা খুশি তা করতে পারে না।'
শেষ পর্যন্ত বিচারক অস্ত্রোপচারের বিপক্ষে রায় দেন এবং মামলাটি খারিজ হয়। তবে তাকে নারীদের অত সাহায্য না করে নিজের কাজে মন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মামলার সময় নির্মাতারা শাহভারদির পাশে ছিলেন। খাকি ও আইনি জানান, শুটিং করতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন—স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি দেরিতে পাওয়া, জেরার মুখে পড়া, হার্ড ড্রাইভ বাজেয়াপ্ত হওয়া। একপর্যায়ে তাদের ওপর এক বছরের জন্য ইরান ত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল।
খাকি বলেন, 'গল্পটি দেখাতে গিয়ে অসংখ্য বাধার মুখোমুখি হয়েছি। অনেকবার মনে হয়েছে, আমরা কখনো শেষ করতে পারব না।'
তবুও তারা শেষ করেছেন—এবং ২২ জানুয়ারি অস্কারে মনোনয়নের খবর পান।
যখন মনোনয়নের খবর আসে তখন ইরানে ইন্টারনেট সেবা বড় পরিসরে বন্ধ ছিল। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। খাকি বলেন, 'খুব ভারাক্রান্ত এবং অম্লমধুর সময় ছিল।' শুরুতে তারা শাহভারদির সঙ্গে খবরটি ভাগ করতে পারেননি।
শেষে তারা যোগাযোগে সক্ষম হন। শাহভারদি প্রথমে চুপ ছিলেন, পরে আবেগপ্রবণ হন। আইনি বলেন, 'এটি শুধু মনোনয়নের বিষয় ছিল না, পুরো অভিজ্ঞতার বিষয়। ফিরে দেখা তার জীবনের গল্প।'
তারা চেয়েছিলেন শাহভারদি বিভিন্ন উৎসবে অংশ নিক, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ভিসার জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি প্রদর্শনীতে যেতে সক্ষম হন। খাকি বলেন, 'এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তিনি কোরিয়ান কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে সিনেমা উপভোগ করেছিলেন, যারা সত্যিই অনুপ্রাণিত হয়েছিল।'
সিনেমার প্রিমিয়ারের পর শাহভারদির চার বছরের কাউন্সিল পদের মেয়াদ শেষ হলেও, তিনি নারী ও মেয়েদের অধিকার আদায়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার গ্রামে নতুন স্কুল তৈরি হচ্ছে, যার জন্য তিনি প্রচারণা করেছেন।
আইনি বলেন, 'তার সমাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন আরও বেশি নারী কাউন্সিলে বসছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে্ন। অনেক কিশোরী পড়াশোনা করছে এবং বাবা-মায়ের সমর্থন পাচ্ছে।'
