‘মেলানিয়া’ রিভিউ: ‘ট্রাম্প-পত্নীর ডকুমেন্টারি, সোনায় মোড়ানো আবর্জনা!’
ব্রিস্টলের উপকণ্ঠে এক নিরালা দুপুরে আমার 'মেলানিয়া' দর্শনের পালা। বিশাল সিনেমা হলটা দেখে মনে হলো, আমার জন্যই যেন ঝাড়পোঁছ করে সব ফাঁকা করা হয়েছে। অথচ গত সপ্তাহেই হোয়াইট হাউসে যখন ব্রেট র্যাটনারের এই বিতর্কিত তথ্যচিত্রটির প্রিমিয়ার হলো, তখন জৌলুসের কমতি ছিল না। অতিথির তালিকায় ছিলেন বক্সার মাইক টাইসন, জর্ডানের রানি এবং খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর আজ? আজ এই বিশাল হলে শুধুই আমি, আর পর্দায় মেলানিয়া। বেশ 'এক্সক্লুসিভ' ও ঘরোয়া একটা ভাব।
শুরুতে সিনেমার পরিবেশটা বেশ উষ্ণ মনে হলেও, টাইটেল বা নাম দেখানোর পরপরই যেন হাড়হিম করা ঠান্ডা নেমে এল। মনে হলো দাঁতের ডাক্তার যেমন মাড়ি অবশ করার ইনজেকশন দেন, তেমনি এক অসাড়তা ভর করল শরীরে। ছবির তারকা এবং নির্বাহী প্রযোজক মেলানিয়া দর্শককে নিয়ে চলেছেন তার স্বামীর দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির অন্দরমহলে। কিন্তু সেই যাত্রার গতি বড়ই মন্থর, যেন জমে যাওয়া বরফনদী। পোশাকের মাপজোক থেকে টেবিল সাজানো, 'ক্যান্ডেললাইট ডিনার' থেকে 'স্টারলাইট বল'—সবই তিনি ঘুরে দেখাচ্ছেন। কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি মুষ্টিবদ্ধ হাতের মতো শক্ত, আর গলার স্বর যেন টিনের পাতে ঘষা খাওয়ার শব্দের মতো খটখটে।
তিনি বলছেন, 'মোমবাতি, কালো টাই আর আমার সৃজনশীল দৃষ্টি।' কথাগুলো এমনভাবে বলছেন যেন কোনো ডাইনি তার জাদুর কড়াইয়ে রান্নার উপকরণ মেশাচ্ছেন। আবার এক জায়গায় আদুরে গলায় বলছেন, 'ফার্স্ট লেডি হিসেবে শিশুরা সব সময় আমার অগ্রাধিকারে থাকবে।' শুনে মনে হতে পারে রূপকথার সেই ডাইনি বুড়ি শিশুদের তার বাড়িতে ফুসলে ডাকছে।
স্লোভেনিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষী মডেল মেলানিয়া নাউস। বিয়ে করলেন নিউ ইয়র্কের এক রিয়েল এস্টেট মোগলকে। তারপর নিজেকে আবিষ্কার করলেন বর্তমান যুগের 'ইভা ব্রাউন' (হিটলারের স্ত্রী) চরিত্রে। তাকে নিয়ে নিঃসন্দেহে দারুণ কোনো তথ্যচিত্র হতে পারত। কিন্তু এই 'মেলানিয়া' ছবিটি তার ধারেকাছেও নেই। এটি এমন এক আজব সিনেমা যার একটি ভালো দিকও খুঁজে পাওয়া দায়। একে ঠিক তথ্যচিত্র বলা যায় কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। বরং একে বলা যায় 'ডিজাইনার ট্যাক্সিডার্মি' বা মরা পশুর চামড়ায় বানানো ভীষণ দামি শৌখিন পুতুল। যা স্পর্শ করলে বরফশীতল। মনে হয়, সিংহাসনে বসা লোভী রাজাকে খুশি করার জন্যই যেন মধ্যযুগীয় কায়দায় এই উপঢৌকন সাজানো হয়েছে।
এভাবেই চলতে থাকে সিনেমা। মেলানিয়া পর্দায় নড়াচড়া করছেন উদ্যমহীন এক রোবটের মতো। তিনি কথা বলছেন অনর্গল, কিন্তু তাতে সারবস্তু কিছুই নেই। মার-আ-লাগো থেকে ট্রাম্প টাওয়ার হয়ে শেষমেশ হোয়াইট হাউস—এই হলো তার গন্তব্য। সিনেমার মূল নাটকীয়তা বা টেনশন কী নিয়ে জানেন? তার গলার কাছে সাদা ব্লাউজটি একটু ঢিলে হয়ে গিয়েছিল! দর্জিদের কপালে ভাঁজ ফেলে সেটা কেটে ঠিক করতে হলো—এটাই এই সিনেমার বড় 'অ্যাকশন'।
মেলানিয়া জানান, তিনি তার মাকে মিস করেন। তবে মাইকেল জ্যাকসন, ছেলে ব্যারন এবং সম্ভবত তার স্বামীকেও তিনি ভালোবাসেন। ট্রাম্প অবশ্য এখানে পেছনের সারির চরিত্র। তিনি মাঝে মাঝে পর্দায় এসে নির্বাচনে জেতার বড়াই করছেন। আর অভিযোগ করছেন যে তার অভিষেকের দিনেই কেন টেলিভিশনে কলেজ ফুটবলের খেলা পড়েছে! তার অভিযোগ, 'ওরা ইচ্ছে করেই সম্ভবত এটা করেছে।'
সিনেমাটি হতাশাজনক, প্রাণহীন এবং এতে নতুন কোনো তথ্যই নেই। পরিচালক র্যাটনারের এই ছবিটিকে জোনাথান গ্লেজারের বিখ্যাত সিনেমা 'দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট'-এর এক চাকচিক্যময় ও সস্তা সংস্করণ মনে হয়। সিন্ডারেলার মতো মেলানিয়া আমাদের সোনার গয়না আর ডিজাইনার পোশাক দেখিয়ে ভুলিয়ে রাখছেন। আর এই ফাঁকে তার স্বামী ও সাঙ্গপাঙ্গরা সংবিধান তছনছ করার এবং সরকারের সম্পদ লুটের পায়তারা করছেন। বল নাচের রঙের থিম ঠিক করার সময় এক তোষামোদকারী বলে ওঠে, 'সাদা আর সোনালি—এটা একদম আপনার মতোই।' হবু ফার্স্ট লেডি সম্মতি জানান—হ্যাঁ, এটাই সত্যি।
শেষটা বলে দিলে খুব একটা ক্ষতি নেই। স্বস্তির বিষয় হলো, ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিষেক শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়। কলেজ ফুটবলের সঙ্গে সময় সংঘর্ষ কিংবা ফার্স্ট লেডির ব্লাউজের বিরক্তিকর ঢিলে ভাব—কোনো কিছুই বাধা হতে পারেনি। প্রস্তুতি ছিল ক্লান্তিকর। কিন্তু মুহূর্তের আনন্দ তাকে পার করে দেয়। স্টারলাইট বল নাচে 'ভিলেজ পিপল'-এর 'ওয়াইএমসিএ' গানের তালে তাকে একটু কোমর দোলাতেও দেখা যায়।
তিনি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেন, '২২ ঘণ্টা জেগে থাকাটা আমার কাছে কিছুই মনে হয়নি।' তার জন্য এটা ভালো খবর। কিন্তু এই আনন্দ দর্শকদের স্পর্শ করে না, অসহ্য লাগে। আর মেলানিয়াকে দেখা এই দুই ঘণ্টা যেন এক অন্তহীন নরকযন্ত্রণা।
