সোনার ডিম, টুপি এবং সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা: মেলানিয়ার তথ্যচিত্র থেকে যা যা জানা গেল
যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন তথ্যচিত্র 'মেলানিয়া'। এতে উঠে এসেছে তাঁর স্বামী ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেকের ২০ দিন আগের মেলানিয়ার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন।
মেলানিয়া ট্রাম্পের রাজনৈতিক লক্ষ্য, পোশাকের নিখুঁত মাপজোখ কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক—সবই উঠে এসেছে পরিচালক ব্রেট র্যাটনারের নতুন এক তথ্যচিত্রে।
তথ্যচিত্রটিতে মেলানিয়ার জীবনকে দেখানো হয়েছে অনেকটা 'রুদ্ধশ্বাস' এক অস্তিত্ব হিসেবে। সোনালি করিডোর দিয়ে তিনি যখন নীরবে হেঁটে যান, তখন তাকে অনেকটা রহস্যময় কোনো চরিত্রের মতো মনে হয়। অবাক করা বিষয় হলো, তাঁর কোনো বন্ধু নেই।
তাঁর অধীনে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সবাইকেই প্রায় মেলানিয়ার মতোই পোশাক পরতে হয়। কর্মীদের বেশিরভাগই পরেন কালো পোশাক। তাঁর ইন্টেরিয়র ডিজাইনারকেও দেখা যায় মেলানিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে বাদামি রঙের স্যুট পরতে। এমনকি তাঁর সহকারী পদের জন্য যাঁরা ইন্টারভিউ দিতে আসেন, তাঁদের সাজগোজ ও চুলের ধরনও থাকে অনেকটা মেলানিয়ার ঢঙেই।
প্রামাণ্যচিত্রটির প্রায় ৩০ শতাংশ সময় ব্যয় করা হয়েছে মেলানিয়ার অভিষেক অনুষ্ঠানের পোশাক তৈরির খুঁটিনাটি নিয়ে। পোশাকের মাপ নিয়ে তিনি কোনো ছাড় দিতে রাজি নন।
তাঁর ভাষায়, 'আমার সৃজনশীল ভাবনা সবসময় স্পষ্ট, আর সেটা আমার দলের কর্মীদের বুঝিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব।'
টুপির কিনারা সামান্য নড়বড়ে হলেও সেখানে চলে তাঁর কড়া শাসন। পোশাকে সামান্য ভাঁজ বা ঢিলেঢালা ভাবও তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অভিষেক অনুষ্ঠানের সব আয়োজনের দায়িত্বে মেলানিয়া থাকলেও খাবারের মেনু নিয়ে তাঁকে খুব একটা মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি। একটি অনুষ্ঠানের শুরুতে খাবার হিসেবে রাখা হয়েছিল একটি 'সোনার ডিম'। সেটি আদৌ খাওয়া যায় কি না বা তার স্বাদ কেমন, সেদিকে তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই; কেবল ডিমের সোনালি রং দেখেই তিনি খুশি। মজার ব্যাপার হলো, পুরো তথ্যচিত্রে তাঁকে কিছু খেতে বা পান করতে দেখা যায়নি।
ব্রেট র্যাটনারের প্রামাণ্যচিত্রে মেলানিয়া ট্রাম্পের জীবনের আরও কিছু বিচিত্র ও ব্যক্তিগত দিক ফুটে উঠেছে। রাজকীয় জীবনযাপনের আড়ালে তাঁর পছন্দ-অপছন্দগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণের চেয়ে আলাদা।
মেলানিয়া মনে করেন, তাঁর চারপাশের প্রতিটি উপাদানে যেন 'চিরন্তন আভিজাত্য' প্রকাশ পায়। অভিষেক অনুষ্ঠানের দাওয়াতপত্র পাঠানোর জন্য তিনি বিশাল লাল খাম বেছে নেন, যা অনেকটা বড়দিনের উপহারের খামের মতো।
বাইডেন পরিবার হোয়াইট হাউস ছাড়ার ঠিক পরেই এবং ট্রাম্প পরিবারের প্রবেশের আগে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কার্পেট পরিষ্কার ও আসবাবপত্র ধোয়ার জন্য তিনি বেশ কড়া নির্দেশ দেন। এমনকি তাঁর অফিসের দেয়ালে বিখ্যাত শিল্পী রেনোয়ার একটি ছবির প্রিন্ট টাঙানো রয়েছে।
পুরো প্রামাণ্যচিত্রে মেলানিয়া ও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুব কম সময় একসঙ্গে দেখা গেলেও তাঁদের রসায়ন বেশ নজর কেড়েছে। মেলানিয়ার শারীরিক ভঙ্গি দেখে মনে হয়, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখনো বেশ অটুট।
ট্রাম্পের কঠিন সময়ে মেলানিয়া তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও অনেক সময় তাঁকে বেশ উদাসীন মনে হয়। একবার ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক জয়ের খবর ফোনে গর্ব করে জানাচ্ছিলেন, তখন মেলানিয়া অনেকটা দায়সারাভাবে বললেন, 'দারুণ, খুব ভালো হয়েছে।' তাঁর কথা বলার ধরণ দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যত দ্রুত সম্ভব ফোনটি রাখতে চাইছেন।
প্রামাণ্যচিত্রে ট্রাম্প-পুত্র ব্যারনকে তেমন কোনো কথা বলতে দেখা না গেলেও শেষের দিকে প্রায় প্রতিটি দৃশ্যে তাঁর উপস্থিতি ছিল। মা-বাবা হিসেবে ট্রাম্প ও মেলানিয়া তাঁকে নিয়ে বেশ গর্বিত। গাড়িতে বসে ট্রাম্প বলছিলেন, 'ব্যারন খুব কিউট, ওর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে।' পাশে থাকা মেলানিয়া সায় দিয়ে বলেন, 'হ্যাঁ, আমি ওকে ভালোবাসি।'
বিলাসবহুল গাড়িতে বসে পরিচালক ব্রেট র্যাটনারকে মেলানিয়া তাঁর প্রিয় সংগীতশিল্পী সম্পর্কে জানান। তিনি বলেন, ডোনাল্ডের সঙ্গেই একবার তাঁর মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। মেলানিয়া বলেন, 'তিনি (জ্যাকসন) খুব অমায়িক ও ভদ্র ছিলেন।' মেলানিয়ার প্রিয় গান হলো জ্যাকসনের 'বিলি জিন' ও 'থ্রিলার'। এমনকি গাড়িতে যাওয়ার সময় পরিচালকের সঙ্গে গুনগুন করে 'বিলি জিন' গাইতেও দেখা যায় তাঁকে।
প্রামাণ্যচিত্রের একটি বড় অংশ জুড়ে দেখা যায় বিভিন্ন শোকানুষ্ঠানে মেলানিয়ার উপস্থিতি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের শেষকৃত্য বা আর্লিংটন সমাধিস্থলে শোকের অনুষ্ঠানে কালো পোশাকে মেলানিয়াকে বেশ স্বচ্ছন্দ দেখায়।
নিজের মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে নিউ ইয়র্কের একটি গির্জায় গিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন হতে দেখা যায় তাঁকে। আর্লিংটন সমাধিস্থলে ছাতা হাতে উঁচু হিল জুতো পরে যখন তিনি হাঁটছিলেন, তখন তাঁকে অনেকটা 'মাফিয়া ডন'দের মতো অভিজাত ও গম্ভীর লাগছিল। পুরো অভিষেক অনুষ্ঠানের মধ্যে তাঁকে সবচেয়ে আনন্দিত দেখা গেছে একটি সমাধিকক্ষপরিদর্শন করার সময়।
ব্রেট র্যাটনারের এই প্রামাণ্যচিত্রটি অ্যামাজন প্রাইমে মুক্তি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান জেফ বেজোসকেও কয়েকবার পর্দায় দেখা গেছে। তবে শুধু বেজোস নন, অ্যাপলের সিইও টিম কুকের পরোক্ষ উপস্থিতিও এখানে স্পষ্ট। মেলানিয়াকে তাঁর ম্যাকবুক এয়ার ব্যবহার করে ভিডিও কলে অংশ নিতে দেখা যায়। মজার ব্যাপার হলো, ল্যাপটপ ব্যবহার করেই তিনি শিশুদের 'স্ক্রিন টাইম' ও ডিভাইসের ব্যবহার কমানোর প্রচারণা নিয়ে কাজ করছিলেন।
মেলানিয়া নিজেকে মোটেও রাজনীতিবিমুখ হিসেবে তুলে ধরেননি। বরং প্রামাণ্যচিত্রে তিনি নিজেকে একজন 'বিশ্বনেতা' হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি প্রথা ভেঙে ফার্স্ট লেডির ভূমিকাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চান এবং নীতিনির্ধারণী বিষয়েও নিজের আগ্রহের কথা জানান।
ফরাসি ফার্স্ট লেডি ব্রিজিত ম্যাক্রোঁর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক আলাপচারিতার দৃশ্যও এখানে রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বারাক ওবামা ও কমলা হ্যারিসের মতো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কিছুটা বিমর্ষ বা বিরক্ত ভঙ্গিতে দেখানোর সুযোগও তিনি হাতছাড়া করেননি।
প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণে মেলানিয়া নিজেকে ২৮ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি নিজেই এর প্রযোজক এবং বিপণন ব্যবস্থার তদারকি করেছেন। তবে এত বিপুল অর্থ খরচ করলেও সিনেমা হিসেবে এটি খুব একটা মানসম্মত হতে পারেনি।
সমালোচকদের মতে, এটি ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল হওয়ার বদলে মেলানিয়ার একঘেয়ে 'আত্মপ্রচারণায়' পরিণত হয়েছে। অভিষেক অনুষ্ঠানের জাঁকজমক দেখাতে গিয়ে সিনেমাটি দর্শকরা বেশ বিরক্তিকর মনে করতে পারেন।
মেলানিয়া ট্রাম্প সব সময় একজন রহস্যময়ী নারী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। অনেক সময় মানুষের কল্পনা বা অনুমান সত্যের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হয়। এই প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে পর্দার আড়ালের জীবন দেখাতে গিয়ে মেলানিয়া সম্ভবত নিজের সেই 'রহস্যময়' ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন তুলে ধরার এই চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে। দিনশেষে মনে হয়, আড়ালে থাকাই হয়তো তাঁর জন্য বেশি ভালো ছিল।
