অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ১.৮৫%, এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১.৮৫ শতাংশ, যা ব্যয়ের হিসাবে এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২.৩৯ শতাংশ।
সোমবার প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপির বরাদ্দ থেকে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরে সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নসহ এডিপিতে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, অর্থবছরের শুরুতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সাধারণত প্রস্তুতিমূলক কাজ ও কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে ব্যস্ত থাকে। সে কারণে এ সময়ে অর্থ ব্যয় কম হয়। তবে পর্যায়ক্রমে ব্যয় বাড়বে।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক প্রধান ও পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ মো. সাইদুজ্জামান বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন হার কম থাকার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর অন্যতম নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিজেদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস ও সিদ্ধান্ত নিতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময় লাগে।
তিনি বলেন, "প্রতিবছরই অর্থবছরের শুরুতে ব্যয় কম থাকে। কারণ এ সময় নতুন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান, অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে হয়। এসব কারণে শুরুতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কিছুটা ধীর থাকে।"
বাস্তবায়নে গতি আনার উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, "দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পরিকল্পনায় থাকা প্রকল্পগুলোর দ্রুত অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নিয়মিত তদারকি জোরদার এবং এডিপি পর্যালোচনা সভা কার্যকরভাবে পরিচালনার মাধ্যমে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ সমস্যা সমাধানে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়সহ সংশ্লিষ্ট জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর বৈঠক করতে হবে।
প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত, কার্যকর সমন্বয় ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, "বাস্তবায়ন হার কমে যাওয়া অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। তবে এটি পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজেদের অগ্রাধিকার, পরিকল্পনা ও নীতিমালা নির্ধারণে প্রাথমিকভাবে কিছু সময় লাগে। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার খুব বেশি সময় পায়নি। ফলে শুরুতে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাওয়া স্বাভাবিক।"
তিনি বলেন, "এ প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত কার্যকর কৌশল নেওয়া জরুরি। সরকারকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত বাস্তবায়নে যেতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করতে হবে, যাতে প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সময় কমে আসে।"
ড. মুজেরি বলেন, ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন হার বাড়াতে শুধু ব্যয় বাড়ালেই হবে না, প্রকল্পের গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হবে। সময়মতো প্রকল্প শেষ করা, ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
প্রাথমিক বাধাগুলো কাটিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিতে পারলে সামনের মাসগুলোতে বাস্তবায়ন হার আবার বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।
পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে এডিপি বাস্তবায়ন জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নে গতি আনা ও মানসম্মতভাবে এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব সমস্যা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে কোনো কারণে বাস্তবায়ন থেমে না থাকে।
সরকারি তহবিলের ব্যয় বেড়েছে, বৈদেশিক তহবিলের কমেছে
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে সরকারি তহবিল থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জুলাই-আগস্টে এ তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা বা বরাদ্দের ২.১৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা বা ১.৯১ শতাংশ।
অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। জুলাই-আগস্টে বৈদেশিক তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বা বরাদ্দের ১.২২ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৫০১ কোটি টাকা বা ২.৯১ শতাংশ।
সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৩২৩ কোটি টাকা, যা এ খাতে বরাদ্দের ৩.৬২ শতাংশ।
১৭ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ব্যয় ১ শতাংশের নিচে
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ১৭টির অর্থ ব্যয়ের হার ১ শতাংশের কম। এর মধ্যে পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জুলাই-আগস্টে এক টাকাও ব্যয় করতে পারেনি।
অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে কোনো অর্থ ব্যয় করতে না পারা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সেতু বিভাগ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতো বেশি বরাদ্দ পাওয়া সংস্থাও রয়েছে।
১ শতাংশের কম অর্থ ব্যয় করা উল্লেখযোগ্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
চলতি অর্থবছরে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এডিপির ৫২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রথম দুই মাসে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এডিপি বাস্তবায়নেও উল্লেখযোগ্য গতি দেখা যায়নি।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা বা মোট বরাদ্দের ১০.৮০ শতাংশ পাওয়া স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রথম দুই মাসে বরাদ্দের ৫.৯৩ শতাংশ ব্যয় করেছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৯ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ব্যয় করেছে ৬৬৬ কোটি টাকা বা ২.২৩ শতাংশ। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিভাগ ৩৮৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা বরাদ্দের ২.১৩ শতাংশ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ২৮২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা ১.৬৬ শতাংশ ব্যয় করেছে।
বরাদ্দের তুলনায় শতাংশের হিসাবে অর্থ ব্যয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়টি বরাদ্দের ১১.৫১ শতাংশ ব্যয় করেছে।
অন্যদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে মাত্র ০.১৮ শতাংশ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় ০.৫৯ শতাংশ।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ বরাদ্দের ৫.৪২ শতাংশ, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ৪.৩০ শতাংশ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ৪ শতাংশ ব্যয় করেছে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ১.৩৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ১.৫১ শতাংশ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ২.১৭ শতাংশ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ২.৫৯ শতাংশ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ১.৪৫ শতাংশ ব্যয় করেছে। ফলে এসব বড় মন্ত্রণালয় ও বিভাগেও প্রথম দুই মাসে অর্থ ব্যয়ের হার ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যেই সীমিত রয়েছে।
