ফেরদৌস স্টিলে গ্যাস লিকেজে নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারকে ৭ লাখ টাকা করে সহায়তা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিতে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারকে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ ৭ লাখ টাকা করে সহায়তা দিয়েছে।
রবিবার (২৩ আগস্ট) জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহেদুল ইসলাম মিয়া উপস্থিত ছিলেন।
ইয়ার্ডের দেওয়া ৭ লাখ টাকার পাশাপাশি জেলা প্রশাসক চট্টগ্রামের পাঁচটি পরিবারকে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেন।
বাকি পাঁচ পরিবার তাদের নিজ নিজ জেলার প্রশাসনের কাছ থেকে একই পরিমাণ টাকা পাবে বলে জানান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক।
ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার পরপরই প্রতি পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে দিয়েছিল। শ্রম আইন অনুযায়ী, নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য আরও ২ লাখ টাকা করে শ্রম আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে পরিবারগুলোকে আরও সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জাহেদুল ইসলাম বলেন, 'আমরা জানি, কোনো ক্ষতিপূরণই একটি জীবনকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। তবে সরকার ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা পরিবারগুলোর পাশে আছে। সুযোগ হলে আমরা আরও সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করব।'
জাহাজভাঙা শিল্পে শূন্য মৃত্যুহার চায় সরকার
জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে শ্রমিকদের নিরাপত্তার দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, 'আমরা চাই, এই খাতে হতাহতের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে।'
তিনি উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
তিনি স্বীকার করেন, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের ভেতরে উচ্চমাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইড তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ছিল না।
ঘটনার পর একটি বিশেষজ্ঞ দল আনা হয় এবং বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ ও জাহাজটি নিরাপদ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করা হয়।
জেলা প্রশাসক বলেন, 'প্রযুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতার ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।'
এলএনজি, গ্যাস ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ বহনকারী জাহাজ কেনা এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশে আনার আগে সেগুলো আরও ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আহ্বান জানান তিনি।
জাহাজটির ভেতরে কীভাবে হাইড্রোজেন সালফাইড জমেছিল এবং জাহাজটির গ্যাসমুক্ত সনদ থাকার পরও কেন তা শনাক্ত করা যায়নি, তা নির্ধারণ করতে কয়েকটি সরকারি সংস্থা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অবহেলা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
আগের জাহাজমালিকের দায়
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুধু স্থানীয় জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের ওপর দেওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, একটি জাহাজ পুনর্ব্যবহারের জন্য বিক্রি করার আগে সেটি যথাযথভাবে পরিষ্কার ও নিরাপদ করার দায়িত্ব আগের মালিকের।
তার মতে, পরিদর্শন প্রক্রিয়ার নথিপত্রে জাহাজটি বিক্রির আগে পরিষ্কার করা হয়েছিল বলে উল্লেখ ছিল। তবে পরে জাহাজটির ভেতরে বিপজ্জনক গ্যাস পাওয়া যায়।
জাহাজটি বাংলাদেশে বিক্রির আগে যেসব পক্ষ জড়িত ছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে অ্যাসোসিয়েশনটি। কীভাবে গ্যাস জাহাজের ভেতরে থেকে গেল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের জাহাজ যাতে পুনর্ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশে পাঠানো না হয়, তা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান।
মহসিন নিহতদের পরিবারগুলোর পাশে থাকারও প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, 'আমরা সব সময় পরিবারগুলোর পাশে থাকব। শুধু শ্রমিকদের নয়, তাদের সন্তানদের পাশেও থাকব।'
নিহত শ্রমিকদের পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা
ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস ওয়াহিদ নিহত শ্রমিকদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানটি উচ্চমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছিল।
তিনি জানান, তার বাবা আলহাজ মোহাম্মদ লোকমান হাজী ১৯৯৫ সালে জাহাজভাঙা ব্যবসায় প্রবেশ করেন। ২০২১ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর তিনি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন।
তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে ফোরম্যান মনসুর ও সিনিয়র কাটার নাসির প্রায় ১৮ বছর ধরে ইয়ার্ডে কাজ করতেন।
ফেরদৌস বলেন, 'তারা আমার সহকর্মী ছিলেন। আমরা একে অপরকে সম্মান করতাম। তাদের সঙ্গে আমার কখনো কোনো বিরোধ হয়নি।'
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল জাহাজ পুনর্ব্যবহার সুবিধা গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছে এবং বর্তমানে তাদের দুটি গ্রিন শিপইয়ার্ড রয়েছে।
তিনি বলেন, 'আমাদের কোনো ভুল হয়ে থাকলে ফেরদৌস স্টিল পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।'
ফেরদৌস বলেন, ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, 'এ ধরনের ঘটনার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তবে ভবিষ্যতে আমরা আরও অনেক বিষয় বিবেচনায় নেব এবং আরও নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির চেষ্টা করব।'
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রির একটি জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে পানি অপসারণের সময় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক নিহত এবং অন্তত ৬ জন আহত হন।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরীক্ষায় জাহাজটির ভেতরে প্রতি মিলিয়নে ১০ দশমিক ৮ অংশ (পিপিএম) হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া যায়। কর্মকর্তারা ধারণা করেন, দুর্ঘটনার সময় গ্যাসটির ঘনত্ব ১০০ পিপিএমের বেশি ছিল।
গ্যাসটির সংস্পর্শে এসে জাহাজে লিক পরীক্ষা করতে ঢোকা শ্রমিকেরা মারা যান। তাদের সহকর্মীদের উদ্ধারের জন্য জাহাজে প্রবেশ করা কয়েকজন শ্রমিকও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
ঘটনার পর একাধিক তদন্ত শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে নজরদারি শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসমুক্ত সনদ, বিপজ্জনক জাহাজ ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের আবদ্ধ স্থানে প্রবেশের আগে বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
