রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও বগুড়াতেও চালু হলো ‘মহিলা বাস সার্ভিস’
মমতাজ বেগমের স্বামী বাসচালক। তার কাছ থেকেই বাস চালানোর অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তিনি। পরে সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে অর্জন করেছেন ভারী যান চালানোর দক্ষতা। পরিবারের সমর্থনও পেয়েছেন শুরু থেকে। সেই অনুপ্রেরণা ও প্রশিক্ষণের পথ পেরিয়ে এবার চট্টগ্রামে চালু হওয়া 'মহিলা বাস সার্ভিস'-এর একটি বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসেছেন তিনি।
নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম নগরে চালু হয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ 'মহিলা বাস সার্ভিস'। প্রাথমিকভাবে নগরীতে দুটি বাস দিয়ে শুরু হওয়া এ সেবায় চালক ও সহকারী—দুই দায়িত্বেই থাকছেন নারী। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি একই দিনে বগুড়ায়ও বিশেষায়িত এ পরিবহনসেবা চালু করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে নগরের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এলাকায় বেলুন উড়িয়ে বাস সার্ভিসটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর বাস দুটি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা, নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও ফ্রি পোর্ট হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলাচল শুরু করে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার জিয়াউদ্দিন, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম এবং বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মাসুদ আলমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
১২ স্টপেজে ওঠানামা
বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২২ থেকে ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে ১২টি নির্ধারিত স্টপেজ রাখা হয়েছে। এসব স্টপেজে নারী যাত্রীরা বাসে উঠতে ও নামতে পারবেন।
রুটটি কালুরঘাট থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা হয়ে বহাদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি, টাইগারপাস, আগ্রাবাদ ও ফ্রি পোর্ট হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত। দূরত্বভেদে বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৬৮ টাকা। কালুরঘাট থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। আর কালুরঘাট বা কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত পুরো রুটের ভাড়া ৬৮ টাকা।
নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তি নারী যাত্রীদের
চট্টগ্রাম নগরে কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক নারী প্রতিদিন গণপরিবহন ব্যবহার করেন। প্রচলিত বাসে অতিরিক্ত ভিড়, আসনসংকট ও নিরাপত্তাজনিত নানা সমস্যার কারণে অনেক সময় তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
নতুন বাসে যাত্রা করা এক নারী বলেন, 'সাধারণ বাসে চলাচলের সময় নারীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এখানে চালক, সহকারী ও সহযাত্রী সবাই নারী হওয়ায় নিরাপত্তার অনুভূতি অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরেই নারীদের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজন ছিল।'
সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীদের নিরাপদে গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করাই এ সার্ভিসের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি নারী চালক ও সহকারী নিয়োগের মাধ্যমে পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
ভবিষ্যতে বাড়তে পারে বাস
প্রাথমিকভাবে দুটি বাস দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও যাত্রীদের চাহিদা ও সার্ভিস পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের পাশাপাশি পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি—দুই দিক থেকেই নতুন এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর মমতাজ বেগমের মতো নারীদের হাতে গণপরিবহনের স্টিয়ারিং তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই পরিবর্তনের পথচলাও শুরু হলো চট্টগ্রামে বলে জানান তারা।
বগুড়ায় চালু হলো নারীদের জন্য বিশেষ বাস
এদিকে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে একইদিনে বগুড়ায়ও দুটি রুটে নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ 'মহিলা বাস সার্ভিস' চালু করা হলো।
বগুড়া জেলা বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুটে প্রাথমিকভাবে ১০টি বাস চালু করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে বগুড়া ও চট্টগ্রামে দুটি করে বাসসহ আরও চারটি বাস এ সেবায় যুক্ত হয়েছে। নতুন করে চালু হওয়া এই সেবা বগুড়ার কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা নিতে পারবেন।
প্রাথমিকভাবে বগুড়ায় দুটি রুটে চলবে বাস। একটি শহরের ভেতর দিয়ে শেরপুর থেকে মাটিডালি। অপরটি মোকামতলা থেকে বনানী। এটিও শহরের ভেতর দিয়ে সাতমাথায় গিয়ে থামবে।
বিশেষ এই বাসের যাত্রীরা ছাড়া চালক-সহকারীও হবেন নারী। ইতোমধ্যে বগুড়ায় দুইজন নারী বাসচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন খাদিজাতুল কুবরা ও তাছলিমা খাতুন সাথী। এই দুইজন ২০১৮ সালে গাজীপুর বিআরটিসি থেকে গাড়ি চালানোর ওপর প্রশিক্ষণ নেন। তারা রাজধানীসহ বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘদিন গাড়ি চালিয়েছেন। দেশের প্রথম মহিলা বাস সার্ভিসের ইতিহাসে নিজেদের নাম জড়িয়ে পড়েছে। এ জন্য তারাও অনেক আনন্দিত।
খাদিজাতুল কুবরা বলেছেন, 'পরিবারের উৎসাহ আছে বলেই আজকে বগুড়ায় আসতে পেরেছি। নারীদের জন্য বিশেষ বাস চালানোর দায়িত্ব পেয়ে আমরাও খুব খুশি।'
বগুড়া বিআরটিসির নারী প্রশিক্ষক সুবর্না খাতুন বলেন, 'নতুন এই বাস নারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে। যারা চাকরি করেন, শিক্ষার্থী তারা একাকী নিরাপদে যাত্রা করতে পারবেন। পর্যায়ক্রমে এই বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে আমরা আশা করি।'
বিশেষ এই বাস সার্ভিস চালু করাকে নারীরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই বাসের কারণে গণপরিবহনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নারীরা সুরক্ষিত থাকবে।
বাস উদ্বোধনকালে জেলা বিআরটিসি কার্যালয়ে বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেছেন, 'আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারীদের জন্য ভাবেন, তার ফলশ্রুতিতে এই বাস সার্ভিস চালু হওয়া। এর ফলে নারীরা সহজে যাতায়াত করতে পারবেন। পাশাপাশি এর মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়েছে। এই বাসগুলোয় নারীরা চালক, নারীরাই সহকারী থাকবে।'
