পদ্মার ভাঙনে জাজিরায় নিঃস্ব মানুষ, হুমকিতে ৫ শতাধিক পরিবার
শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে নতুন করে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে সাতটি দোকানঘর। ভাঙনের আতঙ্কে অর্ধশতাধিক বসতঘর সরিয়ে নিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঝুঁকিতে রয়েছে কাথুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত পাঁচ শতাধিক বাড়ি। প্রায় তিন কিলোমিটার নদীতীরকে ভাঙনপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হলেও, পদ্মার তীব্র স্রোতের সঙ্গে পেরে উঠছে না প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এদিকে, নদীতীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বুধবার (১২ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়, বর্ষার পানিতে উত্তাল পদ্মা। তীব্র স্রোত আছড়ে পড়ছে নদীর ডান তীরে। পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া, মোহন ফকিরের কান্দি ও মধু ব্যাপারীকান্দি এলাকায় একের পর এক ভাঙন দেখা দিয়েছে।
একদিকে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা ও সড়ক, অন্যদিকে ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভাঙন আতঙ্কে ঘরবাড়ি ও মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন নদী তীরের বাসিন্দারা।
পালেরচর থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ইটের তৈরি সড়কের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ। ভাঙনের মুখে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সংযোগ সরিয়ে নিতে কাজ করছে পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা।
কাথুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে। নদী কাছে চলে আসায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক।
শেষ সম্বলটুকুও হারাচ্ছেন মালেক ঘরামী
ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন ৮২ বছর বয়সী মালেক ঘরামী। তার মোট ২৮ শতাংশ জমির মধ্যে ইতোমধ্যে ২৪ শতাংশই চলে গেছে পদ্মার গর্ভে। এখন শেষ সম্বল বসতঘরটিও সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
মালেক ঘরামী বলেন, 'কোথায় যাব, তার কোনো ঠিকানা নেই। এখানে আর থাকা সম্ভব না। তাই শেষ সম্বলটুকু খুলে অন্যত্র যাওয়ার চেষ্টা করছি।'
একই অবস্থা মধু ব্যাপারীকান্দির বাসিন্দা সোলেম শরীফের। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে গড়ে তোলা সংসার এখন ভাঙনের মুখে। নিজের হাতে তৈরি টিনের ঘরটি চোখের সামনে খুলে ফেলতে হচ্ছে তাকে।
সোলেম শরীফ বলেন, 'সারাজীবন কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করেছি। শখ করে এই ঘরটি বানিয়েছিলাম। এখন চোখের সামনে সেটিও ভেঙে ফেলতে হচ্ছে। নদীভাঙন কি আর কখনো থামবে না?'
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জাজিরার পদ্মার ডান তীর রক্ষায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। ৩৯টি প্যাকেজে পরিচালিত প্রকল্পটির কাজ এরই মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ শেষ হয়েছে।
তবে বর্ষায় পদ্মায় পানির চাপ ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় স্রোতের প্রধান প্রবাহ জাজিরা অংশের তীরে আঘাত হানছে। ব্যাথিমেট্রিক সার্ভের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার প্রায় তিন কিলোমিটারকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কাথুরিয়া এলাকার ১২ নম্বর প্যাকেজ এবং মোহন ফকিরের কান্দি এলাকার ৮ নম্বর প্যাকেজে ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এম এ শামীম বলেন, পদ্মার তীব্র স্রোতের কারণেই এ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নদীতীরের মানুষ ভাঙনের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই রক্ষা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস প্রশাসনের
ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম।
তিনি বলেন, 'ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে খাদ্যসামগ্রী ও ঘর নির্মাণের জন্য ঢেউটিন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়হীনদের সরকারি খাসজমিতে পুনর্বাসনের বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।'
জেলা প্রশাসক বলেন, 'নদীতীর রক্ষায় চলমান প্রকল্পের কাজের ধীরগতির বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।'
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পালেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন ফরাজী অভিযোগ করেন, 'সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।'
তিনি বলেন, 'ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থেকে সরকারি সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।'
