শরীয়তপুরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: হাসপাতালে নিতে দুইবার বাধায় পথেই রোগীর মৃত্যু
শরীয়তপুরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে আবারও প্রাণ হারিয়েছেন এক রোগী। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে দুই দফায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার কারণে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে এক হৃদরোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেল পাঁচটায় অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়ে জরুরি সভা ডেকেছেন জেলা প্রশাসক।
মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম জমশেদ আলী ঢালী (৭০)। তিনি শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কুতুবপুর এলাকার বাসিন্দা। স্বজনরা জানান, গত মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
মারা যাওয়া ব্যক্তির স্বজনদের অভিযোগ, সদর হাসপাতাল থেকে প্রথমে একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা হলেও পরে চালক অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় তারা পরিচিত অন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা–শরীয়তপুর মহাসড়কের কোটাপাড়া এলাকায় প্রথম দফায় এবং পরবর্তীতে নড়িয়ার জামতলা এলাকায় দ্বিতীয় দফায় স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সদস্যরা গাড়িটি আটকে দেয়।
প্রতিবারই তারা জেরা করেন—কেন স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স বাদ দিয়ে বাইরের গাড়ি নেওয়া হয়েছে। এভাবে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে থাকার পর অ্যাম্বুলেন্সটি ছাড়া পেলেও ততক্ষণে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে। বিকেল চারটার দিকে ঢাকার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথেই মারা যান জমশেদ আলী।
মারা যাওয়া ব্যক্তির নাতি জোবায়ের হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'এই ঘটনার পর আমরা ভেঙে পড়েছি। এমন অবস্থায় দাফনের প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। তবে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে আমরা থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছি।'
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জেলার অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই বলেন, 'এই মর্মান্তিক ঘটনার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। এ ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। মালিক সমিতি এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় কোনো সমর্থন করে না।'
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর হোসেন বলেন, 'অ্যাম্বুলেন্স একটি জরুরি জনসেবা। এই সেবা যেন মানুষ নির্বিঘ্নে পায়, সেজন্য অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি, বিআরটিএ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মামলা হলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।'
তবে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. রেহান উদ্দীন। তিনি বলেন, 'অ্যাম্বুলেন্সের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে নেই। বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করতে হবে।'
উল্লেখ্য, শরীয়তপুরে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত বছরের ১৪ আগস্ট একইভাবে এক নবজাতককে ঢাকায় নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখলে শিশুটি মারা যায়। সেই ঘটনায় মামলা ও চার্জশিট হলেও অভিযুক্তরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের ওই ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত সুমন এই সর্বশেষ ঘটনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং সিন্ডিকেটের লাগামহীন দৌরাত্ম্যে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন ক্ষুব্ধ জনতা।
