নতুন দরপত্র বিধিমালাতেও ফাঁক খুঁজে পেয়েছে সিন্ডিকেট
সরকারি ক্রয়ে আরও বেশি প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দরপত্র বা টেন্ডার বিধিমালায় ব্যাপক সংশোধনী এনেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে সরকারের সেই প্রচেষ্টা ঠিকাদারদের মধ্যে এক নতুন ধরনের সিন্ডিকেট বা কার্টেল সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে—যেখানে সবাই এখন 'সর্বনিম্ন দরদাতা' হওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে।
সরকারি ক্রয়ের উন্মুক্ত দরপত্রে জেঁকে বসা ঠিকাদার সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং কারসাজি রুখতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ) সংশোধন করা হয় এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০২৫ প্রবর্তন করা হয়। এই নতুন বিধিমালায় সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাবের ফিক্সড লিমিট বা মূল্যসীমা তুলে দেওয়া হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই নতুন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ঠিকাদারদের একটি অংশ অস্বাভাবিক কম দর উল্লেখ করে দরপত্র জমা দিতে শুরু করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি প্রাক্কলিত (এস্টিমেটেড) ব্যয়ের চেয়েও অর্ধেকের কম দর হাঁকা হচ্ছে। মূলত ঠিকাদার নিজে কাজ পেতে কিংবা তাদের পছন্দের কোনো প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার জেতাতে সাহায্য করতেই এই কৌশল গ্রহণ করছে।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "সরকার যে পণ্য বা সেবা কিনতে বা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ১০০ টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করেছে, সংশোধিত আইন ও নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর কিছু ঠিকাদার সরকারকে তা ২০ টাকা, ৫০ টাকায় করে দিতে চাচ্ছেন। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হলে, কাজ শুরুর পর ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব আসতে থাকবে। অন্যদিকে প্রকৃত ও বাস্তবসম্মত দরদাতারা কাজ পাবেন না।"
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) এই চর্চাকে ''চক্রান্তমূলক কর্ম'' ও ঠিকাদারদের ''পেশাগত অসদাচরণ'' বলে উল্লেখ করেছে। এই কারসাজির পেছনে দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারদের সঙ্গে ক্রয়কারী সংস্থাগুলোর অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে মনে করছেন বিপিপিএ'র কর্মকর্তারা।
গত ৪ মে এক পরিপত্রে বিপিপিএ-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সচিব) এস এম মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, "এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে প্রকৃত দরদাতাদের কাজ পাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি অতিরিক্ত কম মূল্যের এই চুক্তিগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।"
গত শনিবার 'দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'কে তিনি বলেন, এ ধরণের দরদাতাদের কাছে নামমাত্র দামে দরপত্র দাখিল করার কারণ জানতে চেয়ে তলব করা হবে। তাদের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে তাদের দরপত্র বাতিল করাসহ বিভিন্ন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় যোগসাজশ রোধ এবং সরকারি ক্রয়ে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই সংস্কারগুলো করা হয়েছিল। তবে দরপত্র জমা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় কারসাজি ঠেকাতে যদি আরও ব্যাপক ও কঠোর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই ধরনের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল না-ও দিতে পারে।
পিপিএ ও পিপিআর সংশোধন
সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা আনতে ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ) প্রণয়ন করে সরকার, যা বাস্তবায়ন করতে ২০০৮ সালে পিপিআর জারি করা হয়। ওই কাঠামোর অধীনে, অভ্যন্তরীণভাবে কোনো কিছু কেনার ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান বা প্রকিউরমেন্ট এনটিটির দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কম বা বেশি মূল্যে টেন্ডার জমা করতে পারত ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বেশি বা কম মূল্যে দরপত্র জমা দিলে তা বাতিল হয়ে যেত।
কিন্তু, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরকারি কেনাকাটা ও দরপত্রে কারসাজি করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় অন্তবর্তী সরকার আইনটির ২০টি ধারা সংশোধন, প্রতিস্থাপন ও বিলুপ্ত করে গত বছরের মে মাসে অধ্যাদেশ জারি। পরে নতুন অধ্যাদেশের সঙ্গে মিলিয়ে পিপিআর-এর প্রায় সবগুলো বিধিতে পরিবর্তন এনে পিপিআর-২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা গত সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
পিপিআর-২০২৫ এর ১৪৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, ''প্রত্যেক প্রস্তাবের আর্থিক স্কোর এইরূপ নির্ধারিত হবে যে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত আর্থিক প্রস্তাবকে ১০০ নম্বর দেওয়া হবে এবং অন্যান্য প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আনুপাতিক ক্রমহ্রাসমান হারে নম্বর দেওয়া হবে; সর্বনিম্ন আর্থিক প্রস্তাবের তুলনায় যে হারে অন্যান্যদের আর্থিক প্রস্তাব বেশি হবে, সে হারে তাদের নম্বর কমতে থাকবে।'' দরপত্রের কারিগরি ও আর্থিক স্কোর যুক্ত করে সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
'চক্রান্তমূলক কর্ম'
২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সংশোধিত পিপিএ ও নতুন পিপিআর কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ বছরের ১১ মে পর্যন্ত মোট ১,৮৭৬টি দরপত্র আহ্বান করেছে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
বিপিপিএ তাদের পরিপত্রে জানিয়েছে, একাধিক ঘটনা পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে নির্দিষ্ট কোন দরপত্রদাতাকে সফলকাম করার অভিপ্রায়ে কতিপয় দরপত্রদাতা পারস্পারিক যোগসাজশে এ ধরণের কৃত্রিম ও বাস্ততাবিবর্জিত দর প্রদান করছেন।
এতে আরো বলা হয়েছে, "স্বাভাবিক বাজার ধারণায় যৌক্তিকভাবে প্রণীত ব্যয় প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে এ ধরণের দরপ্রস্তাব স্পষ্টতই বাস্তবতাবিবর্জিত ও অগ্রহণযোগ্য।"
গত শনিবার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাথে আলাপকালে বিপিপিএ-র প্রধান নির্বাহী মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, সন্দেহভাজন দরদাতাদের ডেকে তাদের প্রস্তাবের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। "যদি তাদের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হয়, তবে কর্তৃপক্ষ টেন্ডার বাতিল করতে পারে এবং বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।"
তবে সরকারের দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের কতো শতাংশ কম দামে দরপত্র দাখিল করলে দরপত্র জমা দানকারীদের তলব করা হবে, তা বিধিমালায় নির্ধারিত নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ''প্রকিউরমেন্টের ন্যাচারের উপর এটি নির্ভর করবে। কি কিনছি, বাস্তবে কেমন দাম, দরদাতা কতো দামে সরবরাহ করতে আগ্রহী- তার ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ধারা প্রযোজ্য হবে''- জানান তিনি।মঈন উদ্দীন আহম্মেদ টিবিএসকে বলেন, "কিছু দরপত্র দেখেই বোঝা যায়, তারা নিজেরা কারসাজি করে কাজ পেতে বা অন্যকে কাজ পেতে সহযোগিতা করার জন্য অস্বাভাবিক কম দামে দরপত্র জমা দিচ্ছে। পিপিআর, ২০২৫-এর অধীনে এ ধরণের দরদাতাদের কর্মকাণ্ডকে 'চক্রান্তমূলক কর্ম' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।"
পিপিআর, ২০২৫ এর ১৪৯(সি) ধারায় 'চক্রান্তমূলক কর্ম' সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ ধারা অনুযায়ী, সরকারের ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে অথবা ক্রয়কারীর কোন কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতায় প্রকৃত বা অবাধ প্রতিযোগিতার সুযোগ হতে বঞ্চিত করে দরপত্র বা প্রস্তাব দাখিলের সংখ্যা ইচ্ছামত হ্রাস করা বা তার মূল্য প্রতিযোগিতামূলক নয়— এমন পর্যায়ে রাখার উদ্দেশ্যে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে কোন চক্রান্ত বা যোগসাজশকে বুঝাবে।
'ব্যবস্থাটি অনুমানযোগ্য হয়ে পড়েছে'
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাটি এখন এতটাই অনুমানযোগ্য (প্রেডিক্টেবল) হয়ে উঠেছে যে, ছোট একটি ঠিকাদার গোষ্ঠী সহজেই নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে নিতে পারছে। এর ফলে কাজে বিলম্ব, বারবার ব্যয় সংশোধন এবং প্রতিযোগিতার অভাব দেখা দিচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সংস্কারের এই পদক্ষেপটি যৌক্তিক, কারণ এটি আগের সেই অনুমানযোগ্যতা কমিয়ে দেয় যা যোগসাজশ করতে সাহায্য করত এবং পুরো ব্যবস্থাকে স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার মানদণ্ডের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
"তবে শুধু প্রক্রিয়াগত সংস্কারই যথেষ্ট নয়," উল্লেখ করে তিনি বলেন, "প্রাক্কলিত ব্যয় বা কস্ট এস্টিমেট অনেক সময়ই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়। একটি অবাস্তব বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ডের বিপরীতে কম দরপ্রস্তাবগুলোকে হয়তো কেবল কাগজের কলমেই কম মনে হতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, মূল্যায়ন কমিটিগুলোকেও প্রায়শই রাজনৈতিক ও স্থানীয় চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়, যার কারণে অবাস্তব দরপ্রস্তাবগুলো বাতিল করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেক এলাকায় এখনও একই ঠিকাদার গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান না করা হলে, এই সংস্কারগুলো কেবল কারসাজির ধরনটাই বদলাবে, কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সরকারি ক্রয় বিধিমালার অপব্যবহার ও কারসাজি রোধে আরও ব্যাপক সংস্কার না করা পর্যন্ত, যেকোনো ভালো উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হবে।
"নাহলে অন্যায্য একচেটিয়াকরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি ঠিকাদারি কাজ কবজা করার যে পুরোনো সংস্কৃতি, তা আগের মতোই চলতে থাকবে; কেবল পালাবদল করে ব্যক্তি পরিবর্তন হবে মাত্র" – যোগ করেন তিনি।
বছরে সরকারি কেনাকাটা ৩০ বিলিয়ন ডলার
দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের কেনাকাটা ও উন্নয়ন ব্যয়ও বাড়ছে, যার বড় অংশই উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ক্রয় করে থাকে সরকার।
অন্তবর্তী সরকারের সময় বিপিপিএ প্রকাশিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা অপরিহার্য, কারণ এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে ও এর সঙ্গে বাড়ছে সরকারি ক্রয়ের পরিমাণও। সরকার প্রতিবছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ কেনাকাটায় ব্যয় করে।
একই প্রতিবেদনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব লিখেছেন, ''বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের ৪৫ শতাংশ ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপির ৮৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।''
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কেনাকাটার পরিমাণ বাড়ার প্রেক্ষিতে, স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারের সকল মন্ত্রণালয়ের সব ধরণের কেনাকাটা একটি সরকারি দপ্তরের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে—পৃথক একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে চিঠি লিখেছিলেন তখনকার জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তবে সেই প্রস্তাব আর বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় সরকারি কেনাকাটা বা প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগে। অন্তবর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির রিপোর্টেও সরকারি কেনাকাটায় বড় বড় দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে।
