দেশের চামড়া খাত অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত পথে এগোয়নি: শিল্পমন্ত্রী
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরের পর থেকে বিগত দিনে দেশের সম্ভাবনাময় এই শিল্পখাতের প্রতি যেভাবে অবহেলা করা হয়েছে বা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে যে অব্যবস্থাপনা ছিল, সেই কারণে চামড়া শিল্প তার কাঙ্ক্ষিত পথে এগোয়নি।
আজ শনিবার (১৬ মে) দুপুরে ঢাকার সাভারের হরিণধরা এলাকায় অবস্থিত বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর কনফারেন্স রুমে বিভিন্ন ট্যানারি মালিক, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস, ফুটওয়্যার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী নেতা ও খাত-সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে তিনি এ কথা বলেন।
মতবিনিময় সভা শেষে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে চামড়া শিল্পনগরীর সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) পরিদর্শন করেন পাটমন্ত্রী।
মন্ত্রী জানান, কোরবানির ঈদের পর পিক সিজনে সিইটিপিতে ৪৫ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য পরিশোধনের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বাস্তবে এই সিইটিপির পরিশোধন সক্ষমতা ১৪ থেকে ১৮ হাজার কিউবিক মিটার এবং সেটি নির্ভর করে সিইটিপিতে বর্জ্য পৌঁছানোর আগে কারখানা পর্যায়ে এর প্রি-ট্রিটমেন্টের মানের ওপর।
এ সমস্যা সমাধানে আগামী দিনে সক্ষম ট্যানারিগুলোতে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়াও এই শিল্পকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত উল্লেখ করে এটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় নিয়ে যেতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সভায় ব্যবসায়ী নেতারা সিইটিপিসহ এই শিল্পের বিভিন্ন সমস্যার কথা মন্ত্রীকে জানান।
বিটিএ'র সহ-সভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ ঈদ-পরবর্তী ৩ মাস শিল্পনগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান। পাশাপাশি সরকার-নির্ধারিত মূল্যে চামড়া সংগ্রহের জন্য মাঠপর্যায়ে যথাযথ উপায়ে চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
চামড়া শিল্পনগরীতে বিভিন্ন সময় চুরির ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের রয়েছে জানিয়ে বিটিএ'র সহ-সভাপতি আশিকুর রহমান সভায় সড়কবাতিসহ রাস্তাঘাট মেরামতের আহ্বান জানান।
সভায় চামড়া শিল্পনগরীর প্রবেশমুখেই কাঁচা চামড়ার আড়তের কারণে ক্রেতারা চামড়ার উপযুক্ত মূল্য দিতে চান না বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী সদস্য মো. ইমাম হোসাইন।
এছাড়াও তিনি স্থানীয় বাজারমুখী বা ছোট সাইজের ট্যানারিগুলোর জন্য বিদ্যমান সিইটিপির কারেকশনের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর জন্য নতুন করে একটি পূর্ণ সক্ষমতার সিইটিপি নির্মাণের দাবি জানান।
একইসঙ্গে ঈদকে সামনে রেখে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সমাধানে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
সভায় ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ সিইটিপির ডিজাইনে ত্রুটি, যার মধ্যে সেন্ট্রাল সেডিমেন্টেশন ব্যবস্থা, টারশিয়ারি ট্রিটমেন্ট, ক্রোম রিকভারি ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।
সেইসঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠান সিইটিপির সক্ষমতা ২৫ হাজার কিউবিক মিটার ঘোষণা করলেও যাচাই-বাছাইয়ে এর সক্ষমতা ১৪ থেকে ১৮ হাজার কিউবিক মিটার বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, সিইটিপির বায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের ফলাফল ভালো হওয়ার কথা জানালেও অন্য পদ্ধতি ঠিকভাবে ফাংশন করে না। সিইটিপির বিদ্যমান এই সমস্যা সমাধানে শিল্পনগরীতে বিদ্যমান ৫০ হাজার স্কয়ার ফুটের ৩১টি ট্যানারিতে সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে নিজস্ব ইটিপি ইনস্টলের প্রস্তাব দেন তিনি।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী বলেন, 'আমাদের যেসব রপ্তানি খাত রয়েছে, সেখানে একটি মাত্র খাত (তৈরি পোশাক) প্রায় ৮৫ শতাংশ মার্কেট দখল করে আছে। এর বাইরে সেভাবে আমাদের অন্য পণ্যগুলো রপ্তানি খাতে নিজেদের শেয়ার নিতে পারেনি।'
এ সময় চামড়া খাতকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। বলেন, 'হাজারীবাগ থেকে যে উপায়ে এখানে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং তারপরে এই সেক্টরটির প্রতি যেভাবে অবহেলা করা হয়েছে বা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির মধ্যে যে অব্যবস্থাপনা ছিল, সেজন্য চামড়া তার কাঙ্ক্ষিত পথে তো আগায়নি। আমরা বিগত অনেক বছরে এটির সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছি। আপনারা সবাই জানেন, যে পরিমাণ চামড়া বাংলাদেশে আহরিত হয়, সারা বছরে যদি তার পুরোটা আমরা রপ্তানি খাতে নিতে পারতাম, তাহলে এই খাত অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলারের একটি রপ্তানি খাতে পরিণত হতো।'
এছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় এই সিইটিপিকে কীভাবে আরও কর্মক্ষম এবং এর সক্ষমতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, কীভাবে আরও বেশি ফাংশনাল করা যায়, সে বিষয়ে একটি স্টাডি চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আগামী দুয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেটি পাওয়া যাবে।
এ সময় সামগ্রিকভাবে এই খাতের উন্নয়ন, স্কিল বিল্ডিং ও ডিজাইন ইমপ্রুভমেন্টের জন্য সাভারেই একটি বিশ্বমানের সেন্টার তৈরি করার কথা জানান মন্ত্রী।
