এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে সাভারের ট্যানারি খাত
চলতি অর্থবছরে সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর ২০টি ট্যানারির ওপর আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) প্রটোকল অনুযায়ী অডিট পরিচালনা করা হয়েছে। অডিটে দেখা গেছে, অধিকাংশ ট্যানারি এখনও আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে। ২০টি ট্যানারির মধ্যে মাত্র তিনটি ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর ৫১ শতাংশ।
এছাড়া ছয়টি ট্যানারি ৪০ শতাংশের ওপরে নম্বর পেলেও বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান সন্তোষজনক নয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না থাকায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বুধবার (১৩ মে) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত 'এলডব্লিউজি সনদ অর্জনে ট্যানারি প্রস্তুতিকরণে গ্যাপ অ্যাসেসমেন্ট ও ফলো-আপ কর্মসূচির ফাইন্ডিংস শেয়ারিং ওয়ার্কশপে' এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) ও বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (বিপিসি) যৌথভাবে কর্মশালাটির আয়োজন করে।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান এনডিসি। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ।
সাসটেইনেবল লেদার এক্সপার্ট মো. আফজাল হোসেন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলেন, 'এলডব্লিউজি সনদ অর্জনে ট্যানারিগুলোকে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস, প্রি-ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আনতে হবে। এলডব্লিউজি সনদের মোট এক হাজার ৭১০ নম্বরের মধ্যে সিইটিপি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট অংশে রয়েছে ৩০০ নম্বর, যেখানে সাভারের ট্যানারিগুলো সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে।'
মো. আফজাল হোসেন বলেন, 'ট্যানারিগুলোতে পানি ব্যবহারের জবাবদিহিমূলক হিসাব রাখতে হবে এবং পরিশোধিত পানির চূড়ান্ত গন্তব্য নিশ্চিত করতে হবে। এলডব্লিউজি গাইডলাইন অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক ব্যবহার, প্রসেস কন্ট্রোলের জন্য দক্ষ টেকনিক্যাল টিম গঠন এবং অন্তত ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত লবণ পুনরুদ্ধারে মেকানিক্যাল ডিসল্টিং ও সোক লিকার পৃথকীকরণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়।'
ওয়ার্কশপে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। সাভার শিল্পনগরীতে বরাদ্দ পাওয়া ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে প্রায় ১৪০টি চালু থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সনদ না থাকায় তারা সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করতে পারছে না। ফলে তুলনামূলক কম দামে চীনের কাছে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। পরে চীন সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে ইতালি, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে উচ্চমূল্যে রপ্তানি করছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান বলেন, 'বর্তমান কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ নতুন স্থাপনা করতে অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। তাই বিদ্যমান সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি নতুন আরেকটি সিইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে পিছিয়ে থাকা ট্যানারিগুলোকে ইটিপি স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়েও সরকার ইতিবাচকভাবে কাজ করছে।'
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের পরিচালক মো. রাযযাকুল ইসলাম বলেন, 'বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) এর সনদ না থাকার কারণে আমাদের চামড়া আন্তর্জাতিক মার্কেটে তিন ভাগের এক ভাগ দাম পাচ্ছে।'
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ বলেন, 'সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে উদ্যোক্তারা প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সিইটিপি ছাড়া শিল্পনগরী চালু করায় উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক বাজার সুবিধা পাচ্ছেন না। আমরা এর দ্রুত সমাধান চাই।'
তিনি আরও বলেন, 'সময়সময়ে লবণ ব্যবহার ও সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত না হওয়ায় কোরবানির চামড়ার মান নষ্ট হয় এবং দাম কমে যায়। পাশাপাশি পানি ব্যবহারে মিটারিং ব্যবস্থা, সোলার এনার্জি ব্যবহার এবং সলিড ওয়েস্টকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে শিল্পটি আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।'
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া খাতের রপ্তানি এক হাজার ১৪৫ দশমিক ০৭ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বৈশ্বিক চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছিল ৪৪০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৩৮ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
আলোচনায় আশা প্রকাশ করা হয়, চলমান গ্যাপ অ্যাসেসমেন্ট, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সাভারের ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক মান পূরণে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যতে এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের পথ সুগম হবে। এর ফলে বাড়বে দেশের রপ্তানি আয়।
