সাভারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়লেও কমেনি গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানো হলেও, এখনও ঢাকার সাভারের ফিলিং স্টেশনগুলোতে কমেনি গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন।
আজ বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে সাভারের বিভিন্ন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা যায়, যেসব পাম্পে জ্বালানি রয়েছে, তার সবকটিতেই রয়েছে গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় ও যানবাহনের দীর্ঘ লাইন।
এছাড়াও, সরবরাহ বাড়ানোর পরেও পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে যানবাহনে জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে ফিলিং স্টেশনগুলো।
পাম্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ বাড়ানো হলেও এখন পর্যন্ত রেশনিং পদ্ধতির মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ করার কারণে সব পাম্পে একসঙ্গে তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে যেসব পাম্পে জ্বালানি রয়েছে, সেসব পাম্পে গ্রাহকদের অতিরিক্ত চাপ অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া সব পাম্পে তেল না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে তেল নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটিও কাটেনি। ফলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতাও অব্যাহত রয়েছে।
সাভার উপজেলা প্রশাসন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ৫২টি পাম্পের মধ্যে ৮টি পাম্পে সিএনজি ও এলপিজি সরবরাহ করা হয়। আজ সকালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাভারের মোট ১৫টি পাম্পে অকটেন মজুদ রয়েছে। অর্থাৎ, মোট পাম্পের ৬৫ শতাংশ পাম্পে কোনো পেট্রোল বা অকটেন নেই।
আবার সকালের হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে বেশ কয়েকটি পাম্পে অকটেনের পরিমাণ এক হাজার লিটারের নিচে ছিল। এর মধ্যে অকটেনের সর্বনিম্ন মজুদ ছিল বিরুলিয়া ফিলিং অ্যান্ড এলপিজি স্টেশনে। সেখানে সকালে মজুদ থাকা অকটেনের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৬৮ লিটার। অন্যদিকে, প্রায় ৭০ শতাংশ ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের মজুদ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও ফিলিং স্টেশনগুলো বলছে, ডিজেলের মজুদ থাকলেও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সরবরাহ বৃদ্ধি সত্ত্বেও ডিজেল নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
লালন সিএনজি অ্যান্ড রিফুয়েলিং স্টেশনে অকটেনের জন্য লাইনে অপেক্ষমাণ মো. সোয়াইব হোসেন নামে এক ব্যক্তি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'সকাল থেকে বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে এখানে এসেছি। ৩ ঘণ্টা যাবত অপেক্ষা করছি, কিন্তু এখনও তেল নিতে পারিনি।'
তিনি আরও বলেন, 'সরকার বলছে তেলের সংকট নাই, সংকট না থাকলে বেশিরভাগ পাম্প বন্ধ কেন?'
এসময় সাভারের পাকিজা মোড় এলাকায় অবস্থিত আফজাল ফিলিং স্টেশনে সকালের দিকে তেল সরবরাহ করা হলেও দুপুরের আগেই সেখানকার অকটেন ফুরিয়ে যায় বলে জানান তিনি।
সাকিব নামে আরেকজন মোটরসাইকেল চালক টিবিএসকে বলেন, 'সরকারের উচিত মাঠপর্যায়ে এসে দেখা পরিস্থিতি আসলে কী। আমার মনে হয় সরকার বাস্তবতা এখনও বুঝছে না। তেলের দাম বাড়ল, সরবরাহ বাড়ল, কিন্তু কোথায়—কোনো পরিবর্তনই তো দেখতে পাচ্ছি না।'
তিনি আরও বলেন, 'সেই দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তি এবং সীমিত তেল। ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৩০০ টাকার তেল পেলে এই তেল দিয়ে কতক্ষণ চলতে পারব?'
লালন সিএনজি অ্যান্ড রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক আহম্মদ বলেন, 'আমরা সর্বশেষ ডিজেল পেয়েছি ১৮ হাজার লিটার এবং অকটেন পেয়েছি সাড়ে ৪ হাজার লিটার। এখন সংকট তৈরি হওয়ার পর থেকে একদিন ৩ হাজার লিটার অকটেন পেলে আরেকদিন সাড়ে ৪ হাজার লিটার দেয়।'
তিনি বলেন, 'আর কোটা অনুযায়ী আমরা ১৮ হাজার লিটার ডিজেল পাই। তাহলে বর্ধিত যে পরিমাণ, সেটাতো এখনও পাচ্ছি না।'
এসআই চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমেদ বলেন, 'সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু গ্রাহকদের চাপ এখনও অপরিবর্তিত। আগে যেখানে ৫/৬ দিনেও অকটেন পাওয়া যেত না, গেলেও ২/৩ হাজার লিটার দিত; এখন সেখানে ৩/৪ দিন অন্তর সাগে ৪ হাজার লিটার পাচ্ছি।'
তিনি বলেন, 'ডিজেল সাড়ে ৪ হাজার লিটার থেকে ৯ হাজার লিটার পেতাম, সেখানে সর্বশেষ সাড়ে ১৩ হাজার লিটার পেয়েছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এটা নিয়মিত না। যার কারণে সব পাম্পে একযোগে তেল না থাকায় চাপ অব্যাহত রয়েছে।'
যদিও তাহসিন এন্টারপ্রাইজের (ফিলিং স্টেশন) ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম জানান, সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হলেও তারা এখনও একই পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ পাচ্ছেন। সর্বশেষ অকটেন পেয়েছিলেন তারা সাড়ে ৪ হাজার লিটার এবং ৫ থেকে ৬ দিন পরপর এই তেল পাচ্ছেন তারা।
দুপুরে মোটরসাইকেলে জ্বালানি সরবরাহ চলাকালীন পাম্পটিতেও ছিল গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড়।
জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর পর পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হয়েছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটারস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'কোনো উন্নতি নেই। লাইন হয়তো কমেছে, কিন্তু কন্টিনিউয়াস ফ্লো তো রয়েই গেছে। লাইন কমলে তো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। নজেল তো বিরামহীন চলছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আবার তেল কোম্পানিগুলোও সামঞ্জস্য রেখে তেল দিচ্ছে না। তাদের খেয়াল খুশিমতো এটা ২ হাজার, ওটা ৩ হাজার, ৪ হাজার। আমরা বারবার বলেছি এখন তো আপনাদের পর্যাপ্ত তেল মজুদ আছে কাজেই চাহিদা অনুযায়ী তেল দেন, কিন্তু তারা কোনো কথাই শুনছেন না।'
এছাড়াও বিদ্যমান লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেলের সংকট বাড়ছে জানিয়ে সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, 'উপজেলা থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত ৭/৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাট। আবার আগামী ১০/১২ দিন ধানের জন্য পানি দরকার। সব মিলিয়ে ডিজেলেরও হিউজ স্কারসিটি।'
তিনি আরও বলেন, 'আবার একযোগে সব পাম্পও তেল পাচ্ছে না। এটা পেলে একটা ভালো ফলাফল পাওয়া যেত।'
