সাভারে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং: চরম ভোগান্তিতে গ্রাহক ও শিল্প খাত
তীব্র গরমের মধ্যে ঢাকার সাভারে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প মালিকরা। এলাকাভেদে প্রতিদিন ৩-৪ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ৫-৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকছে জনপদ। লোডশেডিংয়ের এই মাত্রা কোনো কোনো দিন ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পাশাপাশি শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (ওএন্ডএম) শাহেদুজ্জামান চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় গত দুদিন লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কিছুটা কম হলেও বৃহস্পতিবার এর পরিমাণ ছিল ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত।'
বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি তুলে ধরে এই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'ওইদিন আমাদের সর্বোচ্চ চাহিদা ৩১৯ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ পেয়েছি মাত্র ১৭৫ মেগাওয়াট। এতে দিনে বেশ কয়েকটা লোডশেডিং করতে হয়েছে। তবে গত দুই দিন পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। এছাড়া আজ দুপুর ৩টায় চাহিদার বিপরীতে ২৫ শতাংশ ঘাটতি ছিল। সে সময় চাহিদা ছিল ২৯৮ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২২৩ মেগাওয়াট।'
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই লোডশেডিংয়ের এই সমস্যা শুরু হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুরূপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতাধীন এলাকাগুলোতেও। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (ওএন্ডএম) মো. শাহেদ শাহজাদা টিবিএসকে জানান, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টায় আমাদের চাহিদা ছিল ৪৩৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ২৪১ মেগাওয়াট, অর্থাৎ সে সময় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, আজ দুপুর ৩টায় ৪৪৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৩৫৬ মেগাওয়াট।
দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। আশুলিয়ার গাজিরচট এলাকার বাসিন্দা মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, দিনের একটি বড় সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না এলাকায়। অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়, রাতেও একই অবস্থা। গরম শুরু হতে না হতেই এই অবস্থা, সামনে কী হবে কে জানে। এই গরমে এভাবে লোডশেডিংয়ের কারণে রীতিমতো অসুস্থ হওয়ার অবস্থা। বাচ্চারা ঠিকঠাক লেখাপড়াও করতে পারে না।
মিঠু শামসুজ্জোহা নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, লোডশেডিং মাঝেমধ্যে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং মধ্যরাতেও অন্তত এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
ব্যাংক টাউন এলাকার বাসিন্দা আমিরুন নেসা বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি অন্তত ৪ থেকে ৫ বার লোডশেডিং হয়, এবং প্রতিবারই এটি ন্যূনতম এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। গতকাল রাত ১২টার পরও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। এই গরমে এভাবে বারবার লোডশেডিং হলে সন্তানদের লেখাপড়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও তো ব্যাহত হয়। রাতে যদি ঘুমের সময়ও বিদ্যুৎ না থাকে, তবে মানুষ ঘুমাবে কীভাবে।
লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাভারের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি শিল্প-কারখানায়। বিশেষ করে চামড়া শিল্পে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ও সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, 'রোজার ঈদের পর আমাদের যেসব চামড়া ট্যানারিতে এসেছে, সেসবও আমরা সংরক্ষণ করতে পারছি না। দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। এক ঘণ্টা থাকলে আবার এক ঘণ্টা নেই।'
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'আমাদের সব মেশিনারিজ জেনারেটরে চালানো যায় না, যেগুলোও চালানো যায়, ডিজেল সংকটের কারণে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সেই সাথে উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ।'
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বিদ্যুতের এই ঘাটতিকে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, 'জ্বালানি নিয়ে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের লোডশেডিং ডিজেলের ওপর একটি বাড়তি চাপ তৈরি করছে। উপজেলায় প্রচুর মিল-কারখানা রয়েছে। যার কারণে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে প্রায় লক্ষাধিক লিটার ডিজেলের চাহিদা তৈরি হয়। এটিও একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
সার্বিক পরিস্থিতিতে সাভারের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
