সময়ক্ষেপণ করতে আবারও ইরানের সঙ্গে চুক্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র
গত রোববার (১২ এপ্রিল) ইসলামাবাদ ত্যাগের ঠিক আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার গভীর মতপার্থক্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার ভাষ্যমতে, মূল বিরোধের জায়গাটি হলো ইরান যে কখনোই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না—সেই নিশ্চয়তা অর্জন। ভ্যান্সের ভাষায়, এটি কেবল এখনই নয়, বা দুই বছর পরের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সময়ের জন্য।
তবে এখন দেখা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে 'দীর্ঘমেয়াদী' বলতে মূলত ২০ বছর সময়কালকে বোঝানো হচ্ছে।
পাকিস্তানে ভ্যান্সের ২১ ঘণ্টার সফরের বিস্তারিত তথ্য সামনে আসতে শুরু করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণের ওপর কোনো 'স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা' নয়। বরং, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমস্ত পরমাণু কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য 'স্থগিত' রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মাধ্যমে ইরান অন্তত এটি দাবি করার সুযোগ পাবে যে, তারা পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তির (এনপিটি) আওতায় নিজস্ব পরমাণু জ্বালানি উৎপাদনের অধিকার স্থায়ীভাবে ত্যাগ করেনি।
এর জবাবে দুইজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এবং একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ইরান সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য পরমাণু কার্যক্রম স্থগিত রাখার একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় এক ব্যর্থ আলোচনার সময়ও ইরান একই ধরণের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই আলোচনার ব্যর্থতাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরান আক্রমণ করার সিদ্ধান্তে উৎসাহিত করেছিল এবং এর কয়েক দিন পরেই তিনি হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আলোচনায় আরও কয়েকটি বড় বিষয় রয়েছে—হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌচলাচল পুনর্বহাল এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা। তবে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগে অনীহা, বিশাল পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে না ফেলা এবং জ্বালানির মজুত দেশ থেকে বাইরে না পাঠানো—এগুলোই সব সময় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
পরমাণু কার্যক্রম স্থগিতের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের এই দরকষাকষি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ এখনও রয়ে গেছে। সোমবারের বিভিন্ন তথ্যমতে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আলোচনাকারীরা আবারও বৈঠকে বসতে পারেন। হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখনও কোনো বৈঠকের সময়সূচী চূড়ান্ত হয়নি, তবে সরাসরি আলোচনার পরবর্তী ধাপ নিয়ে কথাবার্তা চলছে।
তবে ট্রাম্প এবং তার উপদেষ্টাদের জন্য বড় ঝুঁকি হলো, নতুন কোনো চুক্তি যদি ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির (জেসিপিওএ) মতো হয়ে যায়। কারণ তিন বছর পরেই ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং একে একটি 'ভয়াবহ ও একপেশে চুক্তি যা কখনোই করা উচিত হয়নি' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
ওবামা আমলের ওই চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের মূল অভিযোগ ছিল এর সময়সীমা নিয়ে। ওই চুক্তিতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণের ওপর ধাপে ধাপে বিধিনিষেধ কমানোর সুযোগ ছিল, যার পর সব বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার কথা ছিল। (যদিও এনপিটি চুক্তির আওতায় ইরানের পরমাণু বোমা বানানো তখনও নিষিদ্ধ থাকত)।
তবে ওবামার চুক্তিতে পরমাণু কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত করার শর্ত ছিল না। এখনকার প্রস্তাবিত স্থগিতাদেশ কার্যকর হলে অন্তত কয়েক বছরের জন্য সব ধরণের পরমাণু তৎপরতা বন্ধ থাকবে, যা ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের হয়ে এবং পরবর্তীতে বাইডেন প্রশাসনের হয়ে চুক্তিতে ফেরার চেষ্টা করা আলোচক রব ম্যালি বলেন, 'তারা যদি ইরানকে কয়েক বছরের জন্যও পরমাণু কার্যক্রম স্থগিত রাখতে রাজি করাতে পারে, তবে সেটি জেসিপিওএ-র চেয়েও উন্নত কিছু হবে।'
আসলে ইরানের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন বারবার কেবল 'সময় কেনার বা সময় ক্ষেপণের চেষ্টা করেছে। কখনো এটি করা হয়েছে পরমাণু কর্মসূচিতে নাশকতার মাধ্যমে—যেমনটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাইবার হামলা চালিয়ে পরমাণু সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস করার মাধ্যমে করেছিল। কখনো নিষেধাজ্ঞা আর কখনোবা কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে।
এর ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে, উত্তর কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান বা ইসরায়েল—যারা পরমাণু বোমা বানাতে চেয়েছিল, তাদের তুলনায় ইরানের পরমাণু অস্ত্র অর্জনে অনেক বেশি সময় লেগেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বর্তমান আলোচনার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। ওবামা প্রশাসনের মতো ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসও আলোচনার গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যাতে চুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুযোগ পাওয়া যায়। তবে ওবামা আমলের মতোই তারা এখন লক্ষ্য করছে যে, কৌশলগতভাবে উভয় পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে ফাঁস (লিক) করছে।
সোমবার সন্ধ্যায় জেডি ভ্যান্স জানান যে, পাকিস্তানে ইরানের সাথে কিছু ভালো আলোচনা হয়েছে এবং এখন বল তেহরানের কোর্টে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইরানিরা যথেষ্ট নমনীয়তা দেখাবে কি না।'
ভ্যান্স আরও বলেন, 'ইরান কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও তা যথেষ্ট নয়।' আরও আলোচনা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এটি ইরানিদের জিজ্ঞেস করাই ভালো।'
হোয়াইট হাউসে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এবং আলোচনার দলটি যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সীমানা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে।'
এক বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কার্যকর নৌ-অবরোধের ফলে ইরানের একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর তাড়না আরও বাড়বে। এই অবরোধ তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে আমেরিকার বিশাল ও সুন্দর উপসাগরের দিকে পাঠাচ্ছে।'
আরেকটি বড় বিরোধের জায়গা হলো যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—ইরানকে তাদের দেশ থেকে প্রায় ৯৭০ পাউন্ডের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলতে হবে, যাতে তা কখনোই বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত না হয়। ট্রাম্প এমন ভাবনাও পোষণ করেছেন যে, ইসফাহানের মাটির গভীরে রাখা এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সুরক্ষিত করতে সেখানে স্থলসেনা পাঠানো হতে পারে।
ইরানিরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, এই জ্বালানি দেশের ভেতরেই থাকবে। তবে জেনেভার মতো তারা প্রস্তাব দিয়েছে যে, তারা ইউরেনিয়ামকে উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমাত্রায় নামিয়ে আনবে যাতে তা দিয়ে অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব না হয়।
এতে পরমাণু বোমা তৈরির সময়সীমা পিছিয়ে যাবে। তবে ঝুঁকি থেকেই যায় যে, জ্বালানিগুলো ইরানের হাতে থাকলে তারা ভবিষ্যতে আবারও সেগুলোকে ৬০ শতাংশ বা তার বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করে ফেলতে পারে (পরমাণু অস্ত্রের জন্য ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধি প্রয়োজন)।
আলোচনা পরবর্তী ধাপে গড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—ইরান তাদের দাবি করা পাওনা অর্থ ফেরত পায় কি না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘ বছর ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, ওবামা প্রশাসন ইরানকে বিমানে করে নগদ টাকা পাঠিয়েছিল। তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা ইরানের ১.৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ এবং তার সাথে জমা হওয়া ৩০০ মিলিয়ন ডলার সুদ ফেরত দেওয়ার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেন। (এর কিছু অংশ সত্যিই বিমানে করে নগদ অর্থ হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, কারণ পশ্চিমা ব্যাংকগুলো ইরানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করতে পারত না।)
পুরো বিষয়টি কোন দিকে মোড় নেবে তা বলা এখনো সময়ের ব্যাপার। তবে চলমান আলোচনার একটি অংশে রয়েছে, ইরানের দাবি—তেল বিক্রির প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করতে হবে, যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নিষেধাজ্ঞার কারণে কাতারে আটকে রয়েছে।
