মৌসুম ছাড়াই ছড়াচ্ছে নিপাহ ভাইরাস, ভোলায় প্রথমবার সংক্রমণ শনাক্ত: আইইডিসিআর
বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ সাধারণত শীতকালে হলেও এবার নির্ধারিত মৌসুমের বাইরেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো উপকূলীয় জেলা ভোলায় নিপাহ ভাইরাসের শনাক্ত করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) আইইডিসিআর মিলনায়তনে নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি নিয়ে আয়োজিত এক সভায় এই তথ্য জানানো হয়। আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা জানান, গত বছর এই ভাইরাসে আক্রান্ত চারজন রোগীর সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন।
আইইডিসিআর-এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন জানান, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ৩৫৭ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪১ জনই মৃত্যুবরণ করেছেন, অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে এই রোগে মৃত্যুহার ৭৩ শতাংশ। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে আক্রান্ত চারজন রোগীর সবাই মারা গেছেন, ফলে গত দুই বছরে এই রোগে মৃত্যুহার ছিল ১০০ শতাংশ।
সাধারণত নিপাহ ভাইরাসকে মৌসুমী রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার সংক্রমণ মূলত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে হয়ে থাকে। তবে অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন জানান, ২০২৫ সালের আগস্টেও নিপাহ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, কাঁচা খেজুরের রস ছাড়াও সংক্রমণের অন্য কোনো উৎস থাকতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এর আগে ভোলা জেলায় কখনো নিপাহ শনাক্ত না হলেও গত বছর সেখানে প্রথমবারের মতো রোগী পাওয়া গেছে।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন জনসাধারণকে অনলাইন বা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে কাঁচা খেজুরের রস কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। এছাড়া পাখি বা প্রাণীর আংশিক খাওয়া ফল বর্জনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, 'আমরা পিঠা উৎসব প্রচার করব, রস উৎসব নয়।' কাঁচা খেজুরের রস পানের পর কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও তাগিদ দেন তিনি।
সভায় আইইডিসিআর-এর সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানান, নিপাহ ভাইরাসের বর্তমানে কোনো অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা নেই। তাই সংক্রমণ রোধে কাঁচা খেজুরের রস পরিহার করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
তিনি জানান, খেজুরের রস পানের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর এর সুপ্তাবস্থা ২ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত হতে পারে। তবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা সাধারণত ৯ থেকে ১১ দিন। সংক্রমণ প্রতিরোধে উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিকে অন্তত ২৮ দিন আইসোলেশনে বা পৃথক রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
আইইডিসিআর-এর তথ্যমতে, এ পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টিতে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ এবং লালমনিরহাটে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।
নিপাহ সংক্রমণের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে— জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমি, কাশি, অস্বাভাবিক আচরণ, প্রলাপ বকা, ঘাড় ও পেশি ব্যথা, খিঁচুনি এবং অচেতন হয়ে পড়া।
নিপাহ সংক্রমণ এড়াতে কাঁচা খেজুরের রস পুরোপুরি বর্জন করা অপরিহার্য বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি ফলমূল ভালো করে ধুয়ে খাওয়া এবং পশুপাখির আংশিক খাওয়া ফল না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে সাবান ও পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
