ভারতে ছড়িয়ে পড়ছে নিপাহ ভাইরাস: এশিয়ার বিমানবন্দরগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এশিয়ার বিভিন্ন অংশে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বেশ কিছু দেশ বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং ব্যবস্থা জোরদার করেছে। খবর বিবিসির।
থাইল্যান্ড তাদের তিনটি বিমানবন্দরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা ফ্লাইটের যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করেছে। নেপালও কাঠমান্ডু বিমানবন্দর এবং ভারতের সাথে অন্যান্য স্থল সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে আগতদের স্ক্রিনিং শুরু করেছে।
ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ডিসেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে দুইজনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে, যারা পেশায় স্বাস্থ্যকর্মী বলে জানা গেছে। তাদের সংস্পর্শে আসা প্রায় ১৯৬ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ এসেছে।
এই ভাইরাস প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। এর কোনো টিকা বা চিকিৎসার ওষুধ না থাকায় এতে মৃত্যুর হার অনেক বেশি—যা ৪০ শতাংশ থেকে থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
নিপাহ ভাইরাস কী এবং এর লক্ষণগুলো কী কী?
নিপাহ ভাইরাস শূকর এবং ফলখেকো বাদুড়ের মতো প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। এটি দূষিত খাবারের মাধ্যমে এবং সরাসরি একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরেও ছড়াতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপাহ-কে তাদের শীর্ষ ১০টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে (কোভিড-১৯ এবং জিকার মতো প্যাথোজেনের সাথে), কারণ এর মহামারি সৃষ্টি করার সম্ভাবনা রয়েছে।
শরীরে ভাইরাস প্রবেশের পর উপসর্গ দেখা দেওয়ার সময়কাল ৪ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে।
যারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা যায়, আবার কখনও কখনও কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না।
প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি ভাব এবং গলা ব্যথা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এগুলোর পর তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব, চেতনার পরিবর্তন (বিভ্রান্তি) এবং নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে।
গুরুতর ক্ষেত্রে 'এনসেফালাইটিস' দেখা দিতে পারে, যা মস্তিষ্কের প্রদাহ সৃষ্টিকারী একটি সম্ভাব্য প্রাণঘাতী অবস্থা।
এখন পর্যন্ত এই রোগের চিকিৎসার জন্য কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন অনুমোদিত হয়নি।
অতীতে এর প্রাদুর্ভাব কোথায় কোথায় হয়েছিল?
নিপাহ ভাইরাসের প্রথম প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার শূকর খামারিদের মধ্যে এবং পরে এটি প্রতিবেশী দেশ সিঙ্গাপুরে ছড়িয়ে পড়ে। যে গ্রামে ভাইরাসটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল, তার নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছে।
ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টায় ১০০-এরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখ শূকর মেরে ফেলা হয়েছিল। এর ফলে খামারি এবং গবাদি পশু ব্যবসার সাথে জড়িতদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এর সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে; ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে ১০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
ভারতেও এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ২০০১ এবং ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে এর প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া গিয়েছিল।
আরও সাম্প্রতিক সময়ে, দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্য নিপাহর জন্য একটি 'হটস্পট' (ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা) হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০১৮ সালে সেখানে ১৯ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন যার মধ্যে ১৭ জনই মারা যান এবং ২০২৩ সালে নিশ্চিত হওয়া ৬ জন আক্রান্তের মধ্যে ২ জন পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন।
বর্তমানে কী ঘটছে?
ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের 'শনাক্ত, অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা' করা হয়েছে—এবং তাদের শরীরে কোনো উপসর্গ পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রণালয় বলেছে, 'পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সকল জনস্বাস্থ্যমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।'
ভারতের বাইরে এখন পর্যন্ত কোনো আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়নি, তবে বেশ কয়েকটি দেশ সতর্কতা বৃদ্ধি করছে।
গত রোববার থেকে থাইল্যান্ড তাদের ব্যাংকক ও ফুকেটের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং শুরু করেছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরাসরি ফ্লাইট আসে। এসব ফ্লাইটের যাত্রীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পার্ক এবং বন্যপ্রাণী বিভাগ প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও কঠোর স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করেছে।
থাইল্যান্ডের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের মুখপাত্র জুরাই ওংসওয়াসদি বিবিসিকে বলেন, থাইল্যান্ডে এই প্রাদুর্ভাব রুখে দেওয়ার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ 'যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী'।
নেপালও কাঠমান্ডু বিমানবন্দর এবং ভারতের সাথে অন্যান্য স্থল সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আসা ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করেছে।
এদিকে, তাইওয়ানের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ নিপাহ ভাইরাসকে 'ক্যাটাগরি-৫ রোগ' হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। তাইওয়ানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনুযায়ী, ক্যাটাগরি-৫ হলো সেইসব উদীয়মান বা বিরল সংক্রমণ যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে এবং যেগুলোর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক তথ্য প্রদান ও বিশেষ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয়।
